শিরোনামঃ
‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর যাত্রা অব্যাহত থাকবে: নতুন গভর্নর দুদকের শীর্ষ তিন কর্মকর্তার পদত্যাগ: সচিবালয়ে ১০ মিনিটের আনুষ্ঠানিকতায় বিদায় প্রশাসনে বড় পরিবর্তন: পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব নিয়োগ ১২ মার্চ সংসদে উঠছে অন্তর্বর্তী সরকারের সব অধ্যাদেশ: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ‘একটি দল নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে’: শিশির মনির ইউক্রেন যুদ্ধ: রাশিয়ার হয়ে লড়তে যাওয়া শতাধিক বাংলাদেশির মধ্যে ৩৪ জনের মৃত্যুর খবর ইরানে হামলা ও মার্কিন অর্থনীতির ‘অগ্নিপরীক্ষা’ এ কোন ইরান দেখছে বিশ্ব চীন-মার্কিন ‘প্রক্সি ওয়ার’ ও বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কোস্টগার্ড মহাপরিচালকের সাক্ষাৎ: সমুদ্রসীমায় সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান
বুধবার, ০৪ মার্চ ২০২৬, ০৫:৩০ পূর্বাহ্ন

চীন-মার্কিন ‘প্রক্সি ওয়ার’ ও বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক সমীকরণ

গ্লোবাল ডেস্ক / ২৪ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

বর্তমান বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ এশিয়া এখন এক চরম উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে গত কয়েক মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যকার আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা বাংলাদেশে একটি ‘প্রক্সি ওয়ার’ বা ছায়াযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করছে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং মার্কিন প্রশাসনের ধারাবাহিক পদক্ষেপগুলো বিশ্লেষণ করলে এই ভূ-রাজনৈতিক সংকটের একটি স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।

মার্কিন প্রভাব ও সামরিক চুক্তির চাপ

২০২৬ সালের শুরু থেকেই বাংলাদেশে মার্কিন প্রভাব বৃদ্ধির সরাসরি উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিসেনসেন দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন। এর পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পাঠানো চিঠিটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ওই চিঠিতে ট্রাম্প সরাসরি কয়েকটি প্রতিরক্ষা চুক্তি (ACSA ও GSOMIA) স্বাক্ষরের আহ্বান জানিয়েছেন, যা মূলত আমেরিকার কাছ থেকে উন্নত সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্র কেনার পূর্বশর্ত। বর্তমান বাংলাদেশের সামরিক চাহিদার ৭২ শতাংশই মেটায় চীন। ফলে আমেরিকার এই প্রস্তাব সরাসরি চীনের সাথে বাংলাদেশের কয়েক দশকের সামরিক সহযোগিতাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর একটি সুকৌশলী প্রচেষ্টা।

অর্থনৈতিক মারপ্যাঁচে বাণিজ্য চুক্তি

বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও আমেরিকার অবস্থান বেশ আক্রমণাত্মক। বছরের শুরুতে বাংলাদেশের পণ্য আমদানিতে বিপুল সম্পূরক শুল্ক বসানোর মাধ্যমে ওয়াশিংটন ঢাকাকে একটি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি করতে কার্যত বাধ্য করেছে। এই চুক্তির আওতায় আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি পণ্য এবং সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের কৃষি পণ্য আমেরিকা থেকে আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। এমনকি ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি বোয়িং বিমান কেনাও এই চুক্তির অংশ। যদিও এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্ক কমেছে, কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে এটি চীন থেকে আমদানি কমিয়ে আনার একটি সূক্ষ্ম কৌশল। চুক্তির ৪.৩ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার মতো ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করে, তবে আমেরিকা এই পুরো চুক্তি বাতিল করে পুনরায় ৭৩ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে পারবে। অর্থাৎ, চীনের সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী বাণিজ্যিক সম্ভাবনা এখন সরাসরি মার্কিন ‘ভেটো’ বা হুঁশিয়ারির মুখে পড়েছে।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ও ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ পলিসি

চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তৃতীয় কোনো পক্ষের চাপে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হবে না। এটি মূলত মার্কিন চাপের বিপরীতে বেইজিংয়ের একটি পরোক্ষ পাল্টা বার্তা। চীন বর্তমানে বিএনপির ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ বা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সমর্থন দিয়ে বোঝাতে চাইছে যে, তারা জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার আমলের মতো ঐতিহাসিক ও ঘনিষ্ঠ কৌশলগত অংশীদারিত্ব পুনরুদ্ধার করতে চায়। চীনের এই বহুমুখী কূটনীতি বিএনপির লক্ষ্য অর্জনে সহযাত্রী হওয়ার ইঙ্গিত দেয়, তবে তা অবশ্যই চীনের নিজস্ব স্বার্থের পরিপন্থী হওয়া চলবে না।

আঞ্চলিক জোট ও ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জ

বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যেমন চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে, বাংলাদেশের সামনেও তেমন একটি ‘ভারসাম্য রক্ষার’ চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়েছে। চীন, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতার কথা আলোচনায় আসলেও, এমন কোনো জোট যদি ভারত-বিরোধী হিসেবে পরিগণিত হয়, তবে তা বাংলাদেশকে নতুন আঞ্চলিক জটিলতায় ফেলতে পারে। এছাড়া ভারতের ভিসা বন্ধের প্রেক্ষিতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া বা সেখানে চীনা হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাগুলো বেইজিংয়ের সাথে ঢাকার ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর নতুন পথ তৈরি করছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির শর্ত এবং অর্থনৈতিক অস্ত্রের (শুল্ক পুনর্বহাল) হুমকি, অন্যদিকে চীনের সাথে দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও বাণিজ্যিক নির্ভরতা—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়ন করা এক বিশাল কূটনৈতিক পরীক্ষা। মার্কিন-চীন প্রক্সি ওয়ারের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া থেকে বাঁচতে হলে বাংলাদেশকে এমন একটি অবস্থানে থাকতে হবে, যাতে কোনো একটি নির্দিষ্ট বলয়ে ঢুকে অপর পক্ষকে শত্রুতে পরিণত করতে না হয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নতুন সরকারের কূটনৈতিক পারদর্শিতাই নির্ধারণ করবে দেশ এই জটিল আন্তর্জাতিক সমীকরণ থেকে কতটা সফলভাবে বেরিয়ে আসতে পারবে।

⚖️ বাংলাদেশ: চীন বনাম মার্কিন প্রভাব বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের ভূ-রাজনৈতিক উপাত্ত

খাত বর্তমান বাস্তবতা ও প্রভাব
সামরিক সরবরাহ ৭২% সরঞ্জাম আসে চীন থেকে। আমেরিকা এখন ‘ACSA’ ও ‘GSOMIA’ চুক্তির মাধ্যমে বিকল্প হতে চায়।
পণ্য আমদানি চীন থেকে বার্ষিক ১৫-২০ বিলিয়ন ডলার (মোট আমদানির ৩০%)। আমেরিকা থেকে মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার।
বাণিজ্য চুক্তি (ধারা ৪.৩) চীনের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করলে আমেরিকা পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়ে রেখেছে।
কূটনৈতিক অবস্থান ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ (সবার আগে বাংলাদেশ)—যা চীন সমর্থন করলেও আমেরিকা ভারসাম্য বজায় রাখতে চাপে রাখছে।
নিজেদের প্রভাব বলয়ে টানতে ওয়াশিংটন ব্যবহার করছে ‘অর্থনৈতিক অস্ত্র’, আর বেইজিং জোর দিচ্ছে ‘ঐতিহাসিক বন্ধনে’


এ জাতীয় আরো খবর...