মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের দামামা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর বিশ্ব এক অন্য ইরানকে দেখছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের সমস্ত হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে ইরান এখন আবির্ভূত হয়েছে এক ক্ষুব্ধ, অপ্রতিরোধ্য এবং চরম বিধ্বংসী শক্তিতে। যে সংঘাতকে ইরান ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, তা এখন খোদ ইসরায়েল ও আমেরিকার জন্য এক জীবন্ত জাহান্নামে পরিণত হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর পর ধারণা করা হয়েছিল ইরান নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়বে এবং তাদের শাসনব্যবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো চিত্র। খামেনির রক্ত যেন এক ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরিকে জাগিয়ে তুলেছে। ইরানের রিভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) এবং বাসিজ বাহিনীর লাখ লাখ সদস্য এখন প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের এই আদর্শিক দৃঢ়তাকে বুঝতে ব্যর্থ হওয়ার মাশুল এখন দিচ্ছে রণাঙ্গনে সারি সারি মার্কিন সেনার কফিন গুনে।
ইসরায়েল এতদিন তাদের ‘আয়রন ডোম’ ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার যে অহংকার করত, ইরানের বিরামহীন ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল হামলার সামনে তা আজ ধুলোয় লুটিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইরানের রহস্যময় এবং অতি দ্রুতগতির ‘সেজ্জিল’ মিসাইলের আঘাতে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে। ইসরায়েলি শহরগুলোতে এখন কেবল সাইরেনের আর্তনাদ। কোনো দেশ এর আগে ইসরায়েলের ঘরের ভেতরে ঢুকে এতটা নিখুঁত ও প্রাণঘাতী হামলা চালাতে পারেনি। প্রতিটি মিসাইল যেন খামেনির রক্তের বদলা নিতেই ধেয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রও এই যুদ্ধের চরম মূল্য দিতে শুরু করেছে। মার্কিন সেন্টকমের (CENTCOM) বিবৃতি অনুযায়ী, ইরানের ভয়াবহ অভিযানে ইতোমধ্যে অন্তত তিনজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত। মধ্যপ্রাচ্যের সুরক্ষিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন আর নিরাপদ নয়। সমরবিদরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি এক বিশাল অপমান ও ধাক্কা। ইরান এখন আর শুধু ফাঁকা হুমকি দেয় না, তারা সরাসরি মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করে প্রমাণ করছে যে, এই অঞ্চলে তাদের টেক্কা দেওয়া পশ্চিমাদের জন্য আত্মঘাতী।
রণাঙ্গনের পাশাপাশি ইরান এক কৌশলী অর্থনৈতিক যুদ্ধ শুরু করেছে। বিশ্বের জ্বালানি তেলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালী এখন সম্পূর্ণ ইরানের কবজায়। তারা লোহিত সাগর ও এই প্রণালীতে একের পর এক জাহাজ ঠেকিয়ে দিচ্ছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা এবং জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা বড় গলায় বলেছিলেন খামেনির পর ইরান টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু তারা এখন বোকা বনে গেছেন। ইরান আজ সব অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে এক সুতোয় গেঁথেছে। তাদের চোখে মৃত্যুর ভয় নেই, আছে শুধু প্রতিশোধের দাউদাউ আগুন। খামেনিহীন ইরান এখন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা এক মুক্ত সিংহের মতো, যাকে থামানোর কোনো মন্ত্র পশ্চিমাদের জানা নেই।