ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর তেহরান এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে ইরান যে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার গড়ে তুলেছে, তা এখন তারা পূর্ণ শক্তিতে ব্যবহারের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মূলত অত্যাধুনিক বিমান বাহিনীর অভাব পূরণ করতে তেহরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী (Missile Force) এবং প্রক্সি নেটওয়ার্কের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী শুধু সংখ্যার দিক থেকেই বড় নয়, এটি অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়।
স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১৫০–৮০০ কিমি): ‘ফাত্তাহ’, ‘জুলফিকার’ এবং ‘কিয়াম-১’। এগুলো মূলত নিকটবর্তী মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনায় দ্রুত আঘাত হানার জন্য তৈরি।
মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র (১,৫০০–২,০০০ কিমি): ‘শাহাব-৩’, ‘ইমাদ’, ‘খোররামশাহর’ এবং ‘সেজ্জিল’। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো পুরো ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত করতে সক্ষম। বিশেষ করে ‘সেজ্জিল’ কঠিন জ্বালানিচালিত হওয়ায় এটি খুব দ্রুত উৎক্ষেপণ করা যায়।
হাইপারসনিক মিসাইল: ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের ‘ফাত্তাহ’ সিরিজের হাইপারসনিক মিসাইল অত্যন্ত দ্রুতগতিসম্পন্ন, যা বর্তমান বিশ্বের যেকোনো আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে ইরানের প্রধান অস্ত্র হলো ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন।
ক্রুজ মিসাইল: ‘সুমার’ (পাল্লা ২,৫০০ কিমি) এবং ‘পাভেহ’। এগুলো মাটির খুব কাছ দিয়ে উড়ে যায় বলে শনাক্ত করা কঠিন।
ড্রোন প্রযুক্তি: ইরান সস্তা কিন্তু কার্যকর ড্রোনের (যেমন শাহেদ সিরিজ) বিশাল মজুদ গড়ে তুলেছে। একসাথে শত শত ড্রোন (Drone Swarm) উৎক্ষেপণ করে শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখে মূল ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করাই তেহরানের প্রধান কৌশল।
ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের একটি বড় অংশ মাটির নিচে সুরক্ষিত সুড়ঙ্গ এবং দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে লুকিয়ে রেখেছে, যাকে তারা ‘মিসাইল সিটি’ বলে। এর ফলে প্রথম দফার বড় কোনো বিমান হামলায় ইরানের সব সক্ষমতা ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। এই টিকে থাকার ক্ষমতার কারণেই পশ্চিমা সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন।
ইরানের সামরিক কৌশলের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের আঞ্চলিক মিত্র বাহিনী বা প্রক্সি নেটওয়ার্ক।
হিজবুল্লাহ (লেবানন): দেড় থেকে দুই লক্ষ রকেট ও মিসাইল নিয়ে তারা উত্তর ইসরায়েলকে ব্যতিব্যস্ত রাখছে।
হুথি (ইয়েমেন): লোহিত সাগরে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরাক ও সিরিয়ার মিলিশিয়া: এরা নিয়মিতভাবে ওমান, জর্ডান ও কুয়েতের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ড্রোন ও রকেট হামলা চালাচ্ছে।

ইরানের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অস্ত্র হলো হরমুজ প্রণালী। তারা তাদের অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, নৌ-মাইন এবং দ্রুতগতির অ্যাটাক ক্রাফটের মাধ্যমে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। ইতিমধ্যেই ‘মায়েরস্ক’-এর মতো বড় শিপিং গ্রুপ এই রুট এড়িয়ে চলায় তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।