রাজধানীর ফুটওভার ব্রিজগুলো পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য নির্মিত হলেও বর্তমানে সেগুলো পরিণত হয়েছে হকার ও ভিক্ষুকদের স্থায়ী বাজারে। নিত্যদিনের এই ভোগান্তি এতটাই চরমে পৌঁছেছে যে, ক্ষুব্ধ পথচারীরা আক্ষেপ করে বলছেন, “ব্রিজগুলোর আসল মালিক তো হকাররা, আমরাই বরং জোর করে এগুলো ব্যবহার করি!”
রাজধানীর ফার্মগেট, নিউমার্কেট, শ্যামলী ও কল্যাণপুরসহ বেশ কয়েকটি ব্যস্ততম ফুটওভার ব্রিজ সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ব্রিজের ওপর টেবিল সাজিয়ে বা কাপড় বিছিয়ে চলছে জমজমাট ব্যবসা। এতে পথচারীদের চলাচলের পথ এতটাই সংকুচিত হয়ে পড়ছে যে, তাড়াহুড়োর সময় স্বাভাবিকভাবে হাঁটাই অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে ভিক্ষুকদের উপদ্রব। সিঁড়ির মুখে বা ব্রিজের মাঝে বসে থাকা ভিক্ষুকরা পথচারীদের পা জড়িয়ে ধরছে, যা অনেক ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। শামীম হোসেন নামে এক পথচারী বলেন, “ব্রিজের দুই পাশে হকারদের দোকান আর সিঁড়িতে ভিক্ষুক—সব মিলিয়ে হাঁটার জায়গা থাকে না। বাধ্য হয়েই অনেকে ঝুঁকি নিয়ে নিচ দিয়ে রাস্তা পার হন।”
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এই অবৈধ দখলের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। নিয়মিত চাঁদা দেওয়ার বিনিময়েই হকাররা সেখানে বসার সুযোগ পাচ্ছে। রবিউল ইসলাম নামে একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এদের যদি পেছন থেকে কেউ আশ্রয় না দিত, তবে কি উচ্ছেদের পরও তারা বারবার বসতে পারত? এসব চাঁদার ভাগ অনেক দূর পর্যন্ত যায়।”
অন্যদিকে, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারাও যেন অনেকটা অসহায়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী বলেন, “আমি এক জায়গায় তিন-চারবারও উচ্ছেদ অভিযান চালিয়েছি, কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবার তারা আগের অবস্থানে ফিরে আসে। আমি নিজেও এখন বিরক্ত। আমাদের সীমাবদ্ধতা হলো, উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে আমরা তো ২৪ ঘণ্টা সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।”
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় চাঁদা আদায়ের বিষয়টি স্বীকার করলেও ম্যাজিস্ট্রেট জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা নাম পাওয়া কঠিন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবাশ্বের হাসান জানান, ফুটওভার ব্রিজগুলোকে হকারমুক্ত করতে তারা জোনভিত্তিক সমন্বিত অভিযান চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, “এটি একক কোনো কাজ নয়, বিভিন্ন বিভাগকে যুক্ত করে আমরা কাজ করছি। কয়েকটি জায়গায় সফলতাও এসেছে, পর্যায়ক্রমে সবগুলো ব্রিজই দখলমুক্ত করা হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং হকারদের জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক সদিচ্ছা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নগরবাসী এখন কেবল আশ্বাস নয়, বরং ফুটওভার ব্রিজগুলোতে নির্বিঘ্ন চলাচলের নিশ্চয়তা চায়।
সারা ঢাকা শহরেই হকার উচ্ছেদ এবং পুনর্বাসন নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সিটি কর্পোরেশনগুলোর পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলো শোনা যাচ্ছে, তা হলো:
১. নির্দিষ্ট জোন বা এলাকা নির্ধারণ: ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) পর্যায়ক্রমে কিছু এলাকাকে ‘হকারমুক্ত জোন’ হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনা করছে। এর পাশাপাশি কিছু নির্দিষ্ট রাস্তায় বিকেল বা সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত হকারদের বসার অনুমতি দেওয়ার একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে, যাতে দিনের ব্যস্ত সময়ে চলাচলে বিঘ্ন না ঘটে।
২. বিকল্প স্থান বা ‘হকার্স মার্কেট’: সিটি কর্পোরেশনগুলো বিভিন্ন সময় ফাঁকা জায়গা বা পরিত্যক্ত স্থানে অস্থায়ী ‘হকার্স মার্কেট’ তৈরির কথা বলে আসছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ধরনের জায়গা আনুষ্ঠানিকভাবে হকারদের জন্য বরাদ্দ করা হয়নি। মূল সমস্যা হলো, যে জায়গাগুলো চিহ্নিত করা হয়, তা শহরের ব্যস্ত এলাকা থেকে দূরে হওয়ায় হকাররা সেখানে যেতে আগ্রহী হন না—কারণ সেখানে ক্রেতা সমাগম কম।
৩. বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশন: হকারদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং প্রকৃত হকারদের আলাদা করতে সিটি কর্পোরেশন একটি ডাটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছে। এতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে নিবন্ধন করা হবে। পরিকল্পনা আছে, এই নিবন্ধিত হকারদেরই কেবল নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে বসার কার্ড দেওয়া হবে। কার্ডধারী ছাড়া অন্য কেউ বসলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
৪. উচ্ছেদ পরবর্তী কঠোর মনিটরিং: মেয়রদের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, উচ্ছেদ অভিযান এখন আর কেবল দায়সারা কাজ নয়। যেসব জায়গা ইতিমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে, সেখানে যেন পুনরায় হকার বসতে না পারে, সেজন্য এলাকাভিত্তিক কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
৫. নীতিমালার অবস্থা: সম্পূর্ণ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ‘হকার ম্যানেজমেন্ট পলিসি’ বা নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। এই নীতিমালায় হকারদের জন্য নির্দিষ্ট পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড), বসার সময়সূচি এবং এলাকাভিত্তিক কোটা নির্ধারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
মূল সংকটটি হলো সমন্বয়ের অভাব। একদিকে হকারদের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন, অন্যদিকে সাধারণ নাগরিকদের হাঁটার অধিকার—এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য আনাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক ছত্রছায়া এবং স্থানীয় সিন্ডিকেটের চাঁদা তোলার বিষয়টি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কেবল আইন বা পলিসি দিয়ে এর সমাধান করা কঠিন।