ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের রাজনীতিতে এক নতুন বাস্তবতার জন্ম হয়েছে। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলেও, দলের টিকিট না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে জয়ী হওয়া সাতজন বিদ্রোহী এমপি এখন সংসদের ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠেছেন। শোনা যাচ্ছে, সংসদে পা রেখেই তারা আলাদা জোট গঠনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক চমক দেখাতে যাচ্ছেন, যা সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়কেই স্নায়ুচাপে ফেলতে পারে।
দলীয় প্রতীক ধানের শীষ না পেয়েও নিজেদের জনপ্রিয়তায় ভর করে তৃণমূলের এই সাত নেতা শেষ পর্যন্ত বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এই বিদ্রোহী এমপিরা হলেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল, টাঙ্গাইল-৩ আসনে লুতফর রহমান খান, চাঁদপুর-৪ আসনে আবদুল হান্নান, কুমিল্লা-৭ আসনে আতিকুল আলম শাওন, ময়মনসিংহ-১ আসনে সালমান ওমর রুবেল এবং দিনাজপুর-৫ আসনে রেজওয়ানুল হক। এই বিজয় কেবল তাদের ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বেরও একটি প্রতিফলন। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের বিজয়ী এমপি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের উদ্যোগেই এই সাতজন মিলে আলাদা জোট গঠনের পরিকল্পনা করছেন। সংসদে স্বতন্ত্র অবস্থান নিয়ে সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের নীতিগত ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য বলে জানা গেছে।
সংখ্যার বিচার করলে মাত্র সাতজন এমপির এই জোট বিএনপি সরকারের জন্য সরাসরি কোনো বড় হুমকি নয়, কারণ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় নিরঙ্কুশ আসন বিএনপির রয়েছে। তবে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি মোটেও হেলাফেলা করার মতো নয়। এই সাতজনই মূলত বিএনপির পরীক্ষিত নেতা। দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ার ক্ষোভ থেকে তারা বিদ্রোহ করে নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে দাঁড়িয়ে তারা যখন দলের ভুল সিদ্ধান্ত বা সরকারের কোনো সেচ্ছাচারী নীতির সমালোচনা করবেন, তখন তা সরকারকে নৈতিকভাবে বেশ অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। বিশেষ করে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার মতো স্পষ্টভাষী ও দলের অন্দরমহলের খবর জানা নেতা এই ব্লকে থাকায়, এটি সরকারের জন্য বিতর্কের এক নতুন ও শক্তিশালী মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে এবং দলের ভেতরের অসন্তোষের একটি দৃশ্যমান প্রতীক হিসেবে থেকে যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্ভবত সুনির্দিষ্ট কৌশলগত কারণেই এই বিদ্রোহীদের সঙ্গে তড়িঘড়ি করে কোনো সমঝোতায় যাননি। প্রথমত, দলীয় শৃঙ্খলার একটি কঠোর বার্তা দেওয়া শীর্ষ নেতৃত্বের জন্য জরুরি ছিল; বিদ্রোহ করে জেতার পরপরই দলে ফিরিয়ে নিলে ভবিষ্যতে অন্য নেতারাও এমন বিদ্রোহে উৎসাহিত হতে পারেন। দ্বিতীয়ত, বিদ্রোহীদের আলাদা থাকতে দিলে সংসদে একটি নরম সমালোচনামূলক ব্লক তৈরি হবে, যা সরাসরি কট্টর সরকারবিরোধী না হয়েও একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখবে। এছাড়া, রাজনীতিতে দূরত্ব বজায় রেখে দরকষাকষির পথ খোলা রাখাও একটি পরিণত কৌশল, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে তাদের আবারও মূল দলে টেনে নেওয়ার সুযোগ থাকে।
নতুন এই সংসদে আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল হিসেবে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বিদ্রোহী এমপিদের এই ছোট জোটটি সাংবিধানিক মর্যাদাপ্রাপ্ত ও সুসংগঠিত জামায়াতের বিকল্প হতে পারবে না ঠিকই, তবে মিডিয়া ও জনমনে তারা প্রভাবশালী সমালোচকের ভূমিকা পালন করতে পারে। এর ফলে সংসদে এবার সরকারি দল বিএনপি, আনুষ্ঠানিক বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং স্বতন্ত্র সমালোচক ব্লকের ত্রিমুখী রাজনৈতিক কণ্ঠ শোনা যাবে। জামায়াত সরকারকে যেভাবে আক্রমণ করবে, বিদ্রোহীরা হয়তো সেভাবে করবে না; বরং তারা নীতি, প্রশাসন বা দলীয় সিদ্ধান্তের গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারে। তবে বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাস বলে, ব্যক্তিগত স্বার্থ, রাজনৈতিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নির্বাচনের হিসাবনিকাশের কারণে ছোট স্বতন্ত্র জোটগুলো খুব বেশি দিন টিকে থাকে না। তাই বিশ্লেষকদের ধারণা, এই জোট হয়তো স্থায়ী কোনো রাজনৈতিক শক্তি হতে পারবে না, তবে যতদিন তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে, ততদিন সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর ও স্বাধীন কণ্ঠ হিসেবে কাজ করে পুরো রাজনৈতিক অঙ্গনকেই সতর্ক রাখবে।