জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত শত শত শহীদের রক্তের ঋণ শোধ করতে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, সেই পবিত্র দায়িত্বকেই নিজের পকেট ভারী করার হাতিয়ার বানানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে খোদ একজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে। আসামিপক্ষের এক আইনজীবীর সাথে কোটি টাকা ঘুষ চাওয়ার যে কথোপকথন ফাঁস হয়েছে, তা কোনো সাধারণ দালালের নয়; বরং ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মোহাম্মদ সাইমুম রেজা তালুকদারের। আবু সাঈদ, মুগ্ধ কিংবা ওয়াসিমদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া নতুন বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছিল, এই অডিও ফাঁস যেন সেই চেতনার ওপর এক নির্মম আঘাত হেনেছে।
পর্দার আড়ালের এই ভয়ংকর খেলায় সাইমুম রেজা তালুকদারের মূল লক্ষ্যবস্তু ছিলেন চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী। জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামে ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং প্রায় পাঁচশ মানুষ আহতের ঘটনায় এই নেতার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতে পালানোর সময় গ্রেপ্তার হওয়া এই আসামিকে আইনি সহায়তা দিচ্ছিলেন তারই ভাতিজি আইনজীবী রিজওয়ানা ইউসুফ। পরিবারের অভিযোগ, ফজলে করিমকে আটকের প্রায় দুই মাস পর প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা নিজেই তাদের সাথে যোগাযোগ করে এক কোটি টাকার বিনিময়ে জামিন ও তদন্ত প্রতিবেদন ফাঁসের প্রলোভন দেখান। এমনকি কিস্তিতে টাকা পরিশোধ এবং বিদেশি নম্বরে যোগাযোগের মতো নিখুঁত ক্রাইম থ্রিলারের মতো ছকও কষেন তিনি, যা হাজারো শহীদের রক্তের সাথে স্রেফ গাদ্দারি ছাড়া আর কিছুই নয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাবেক চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম এই ঘুষ দাবির কথা জেনেও সাইমুমকে কেবল নির্দিষ্ট মামলা থেকে সরিয়ে দিয়ে দায় সেরেছিলেন, ট্রাইব্যুনাল থেকে তাকে বহিষ্কারের জোরালো কোনো পদক্ষেপ নেননি। পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তাজুল ইসলামের স্থলাভিষিক্ত হন বিএনপিপন্থী আইনজীবী আমিনুল ইসলাম। কিন্তু সাইমুম রেজা বহাল তবিয়তে তার পদেই থেকে যান এবং নতুন বাস্তবতায় নিজের সুর পুরোপুরি পাল্টে ফেলেন। ফাঁস হওয়া অডিওতে শোনা যায়, তিনি ফজলে করিমের পরিবারকে নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘রিজনেবল’ আখ্যা দিয়ে আশ্বস্ত করছেন এবং বিএনপির শীর্ষ নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরী বা সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলালকে দিয়ে তদবির করানোর পরামর্শ দিচ্ছেন। আসামিদের ভয় দেখিয়ে বা মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে এসবই ছিল তার টাকা আদায়ের সুপরিকল্পিত কৌশল।
যখন এই কোটি টাকার ঘুষের অডিও ফাঁস হয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়, তখন সাইমুম রেজা তালুকদার স্বভাবসুলভভাবেই তা অস্বীকার করে পদত্যাগ করেন এবং অডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেন। তবে সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে অডিওর বাচনভঙ্গি ও শ্বাস নেওয়ার প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে এর পেছনে এআইয়ের কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় না। সাইমুম রেজার বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা এখানেই শেষ নয়। টাকার বিনিময়ে আশুলিয়ায় ছয়জনকে পুড়িয়ে মারার মামলার আসামি এসআই আফজালুল হককে এবং চানখাঁরপুলে গুলিবর্ষণের নির্দেশদাতা এসআই আসাফুল ইসলামকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী বানিয়ে দেওয়ার মতো চাঞ্চল্যকর অভিযোগও উঠেছে। এমনকি রংপুরে আবু সাঈদ হত্যা মামলার এক আসামিকে অব্যাহতি দেওয়া এবং প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ হাতাহাতির ঘটনা প্রমাণ করে যে, বিচারের নামে পর্দার আড়ালে এক লুটপাটের উৎসব চলছিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর থেকে মানুষের ন্যূনতম আস্থাও হারিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কোনো সাধারণ আদালত নয়; এটি একটি জাতির আবেগ ও ত্যাগের সর্বোচ্চ জায়গা। এক কোটি টাকার লোভে যারা ঘাতকদের সাথে আপস করেন, তারা কেবল আইনই ভাঙেন না, বরং শহীদদের পরিবারের চোখের পানির সাথেও চরম বেঈমানি করেন। সাধারণ মানুষের দাবি, কেবল পদত্যাগই যথেষ্ট নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সমুন্নত রাখতে এবং ট্রাইব্যুনালকে কলঙ্কমুক্ত করতে এই প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।