রাজশাহী অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে হামের প্রকোপ। চলতি মার্চ মাসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অন্তত ১২ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়ার পরও ৯ জন শিশুকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি এবং আইসিইউয়ের অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় মারা গেছে আরও তিন শিশু। সবশেষ শনিবার (২৮ মার্চ) বিকালেও আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিন শিশুকে আইসিইউতে স্থানান্তরের সুপারিশ করেছেন চিকিৎসকেরা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সহায়তায় গত ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ জন সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করে ৪৪ জনের শরীরে হামের উপস্থিতি (পজিটিভ) শনাক্ত হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সংক্রমণের হার প্রায় ২৯ শতাংশ, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম উদ্বেগজনক। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, পুরো বিভাগের মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পাবনা জেলায় হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। রামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১ মার্চ থেকে বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) পর্যন্ত রাজশাহীতে অন্তত ৮৪ জন হাম আক্রান্ত শিশুকে আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করতে বাধ্য হয়েছেন চিকিৎসকেরা।
হামের এই প্রকোপে রামেক হাসপাতালে প্রতিদিনই দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। বৃহস্পতিবার আইসিইউতে নেওয়ার সুপারিশ করা চার শিশুর মধ্যে জহির, হুমায়রা এবং হিয়া নামের তিন শিশু শুক্রবার (২৭ মার্চ) সকালেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। অন্যদিকে, চিকিৎসাধীন শিশু জান্নাতুল মাওয়ার অবস্থা অবনতি হলে শনিবার তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তার বাবা হৃদয়। হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে অনেক অভিভাবক বাধ্য হয়ে মেঝে বা বারান্দায় শিশুদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ ওয়াসিম ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বারান্দায় তাঁর অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, তিন দিন আগে সর্দি-জ্বর ও নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসার পরই তিনি জানতে পারেন তাঁর শিশুটি মূলত হামে আক্রান্ত।
রোগীর এই প্রবল চাপের মধ্যেও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র শঙ্কর কে বিশ্বাস জানিয়েছেন, তাদের একটি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থাকলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় হামের রোগীদের সেখানে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার থেকে হাসপাতালের ২৪ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডে বিশেষ আইসোলেশন কর্নার স্থাপন করে হাম রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সার্বিক বিষয়ে রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, বিভাগের মধ্যে পাবনা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। শনিবার শুধু পাবনা সদর হাসপাতালেই ২৬ জন হামের রোগী ভর্তি ছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভাগের সব জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে বিশেষ সতর্কতা ও আলাদা ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।