ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের রিমান্ডে থাকা বিতর্কিত সাবেক তিন সেনা কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন। এক-এগারোর (১/১১) সেনাসমর্থিত সরকারের আমল এবং সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার নানা গুম, নির্যাতন ও চাঁদাবাজির অজানা অধ্যায় এখন বেরিয়ে আসছে। বিশেষ করে, ২০১২ সালে বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে গুম করার নেপথ্যের নির্দেশদাতা, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অমানবিক নির্যাতন এবং এক-এগারোর সময় শীর্ষ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ আদায়ের বিষয়ে তারা গোয়েন্দাদের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ করেছেন।
ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ রিমান্ডে স্বীকার করেছেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশেই এম ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়েছিল। এই গুমের পুরো প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করে র্যাব-১। ঘটনার আগে ও পরে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালকের সঙ্গে শেখ হাসিনার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মামুন খালেদ দাবি করেন, টিপাইমুখ বাঁধ এবং ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কারণেই ইলিয়াস আলীকে গুমের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও তিনি স্বীকার করেছেন যে, তার দিকনির্দেশনায় ডিজিএফআইয়ের দুজন মেজর এই গুমের মিশনে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করেছিলেন। এর পাশাপাশি, ঢাকা সেনানিবাসের বাসা থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদের ষড়যন্ত্রে কারা জড়িত ছিলেন, সে বিষয়েও তিনি গোয়েন্দাদের তথ্য দিয়েছেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় মিরপুর মডেল থানার একটি হত্যা মামলায় শেখ মামুন খালেদকে প্রথম দফায় পাঁচ দিনের রিমান্ড শেষে ফের আদালতে হাজির করা হয়। শুনানিতে তিনি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা তুলে ধরে জানান, তার তিনটি পিএইচডি ও পাঁচটি মাস্টার্স রয়েছে এবং তিনি ২২ বছর অ্যাকাডেমিক কাজে যুক্ত ছিলেন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আদালতকে জানান, মামুন খালেদ ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারকে টিকিয়ে রাখতে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং এক-এগারোর কুশীলবদের পুরস্কৃত করে সৎ সেনা কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বঞ্চিত করেছিলেন। এমনকি বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের হত্যার ঘটনাতেও তাদের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। শুনানি শেষে আদালত তার আরও ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এদিকে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আরেকটি হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে ছয় দিনের রিমান্ডে আছেন এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক লে. কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছের। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, ১/১১-এর সময় তৎকালীন ব্রি. জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিন এবং নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর নির্দেশে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের ধরে এনে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আদায় করা হয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা হয়। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নির্যাতনের বিষয়ে তিনি নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সময় তিনি ঢাকার বাইরে ছিলেন এবং তারেক রহমানকে নির্যাতনের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন এ টি এম আমিন, আর সরাসরি শারীরিক নির্যাতন চালিয়েছিলেন লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার। তবে আফজালের এই দাবি বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
রিমান্ডে থাকা আরেক প্রভাবশালী সাবেক সেনা কর্মকর্তা লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী বর্তমানে মানব পাচার আইনের একটি মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হচ্ছেন। গোয়েন্দারা তথ্য পেয়েছেন, এক-এগারোর সময় ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠনের নামে তিন শতাধিক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়মুক্তি দেওয়ার আড়ালে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। এছাড়া মালয়েশিয়ায় মানব পাচার সংক্রান্ত দুদকের একটি মামলাতেও তাকে গ্রেফতার দেখানোর আবেদন করা হয়েছে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের পৃথক দুটি মামলায় মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও শেখ মামুন খালেদকে হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, আসামিদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত চাঞ্চল্যকর এই তথ্যগুলো বর্তমানে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।