ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া থেকে সাগরপথে অবৈধভাবে গ্রিসে যাওয়ার সময় পথ হারিয়ে ভূমধ্যসাগরে ভাসতে ভাসতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে সুনামগঞ্জের পাঁচ যুবকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (২৮ মার্চ) সন্ধ্যার পর এই হৃদয়বিদারক খবরটি জানাজানি হয় এবং এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় প্রাণ হারানো অন্তত ২২ জনের মধ্যে ৫ জনই সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বাসিন্দা, যাদের মরদেহ শেষ পর্যন্ত সাগরেই ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বেঁচে ফেরা এক সঙ্গীর বর্ণনায় জানা গেছে।
নিহতদের পরিচয় ও শোকের মাতম দিরাই উপজেলা থেকে যাওয়া ওই পাঁচ হতভাগ্য যুবক হলেন—কুলঞ্জ ইউনিয়নের তারপাশা গ্রামের আবু সর্দারের ছেলে মো. নুরুজ্জামান সর্দার ময়না (৩২), মৃত ক্বারী ইসলাম উদ্দীনের ছেলে মো. সাহান এহিয়া (২২), আব্দুল গণির ছেলে মো. সাজিদুর রহমান (২৬), রাজানগর ইউনিয়নের রনারচর গ্রামের মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মুজিবুর রহমান (৪০) এবং করিমপুর ইউনিয়নের মাটিয়াপুর গ্রামের মো. আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. তারেক মিয়া (২৩)। শনিবার বিকেলে গ্রিস থেকে এই মৃত্যুর দুঃসংবাদ আসার পরপরই তারপাশা, রনারচরসহ পুরো উপজেলায় স্বজনদের মাঝে শোকের মাতম শুরু হয়। গ্রিসে পৌঁছাতে সক্ষম হওয়া দিরাইয়ের রুহান মিয়া নামের এক যুবক বেঁচে ফেরা অন্য এক বাংলাদেশির বরাতে এই মর্মান্তিক পরিণতির কথা প্রথম স্বজনদের জানান।
মৃত্যুর ভয়াবহ বর্ণনা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কিশোরগঞ্জের এক যুবককে বলতে শোনা যায়, লিবিয়া উপকূল থেকে সাগরপথে মোট ৪৩ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী যাত্রা শুরু করেছিলেন। মানবপাচারকারী চক্র তাঁদের বড় নৌকার কথা বলে একটি ছোট ও অনিরাপদ নৌকায় (হাওয়াই বোট) তুলে দেয়। ওই নৌকায় পাঁচজন সুদানি এবং ৩৮ জন বাংলাদেশি ছিলেন। পথ হারিয়ে মাঝসাগরে দিনের পর দিন ভাসতে থাকায় খাবার ও পানির তীব্র সংকটে একে একে ১৮ জন বাংলাদেশি মারা যান, যাদের বেশির ভাগেরই বাড়ি সিলেট ও সুনামগঞ্জ অঞ্চলে। ওই যুবক জানান, মারা যাওয়ার পর তাঁদের মরদেহ অন্তত দুই দিন নৌকায় ফেলে রাখা হয়েছিল; কিন্তু পরে পচে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে বাধ্য হয়ে সঙ্গীরাই তাঁদের মরদেহ ভূমধ্যসাগরে ভাসিয়ে দেন।
উদ্ধারকারী দলের তথ্য ও মানবপাচারের চুক্তি এদিকে, শুক্রবার ভোরের দিকে গ্রিসের কোস্টগার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ক্রিট দ্বীপের কাছে ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থার একটি জাহাজ এক নারী ও এক শিশুসহ মোট ২৬ জন অভিবাসনপ্রত্যাশীকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করেছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে গ্রিসের কোস্টগার্ড আরও নিশ্চিত করেছে যে, উদ্ধার পাওয়া এই ২৬ জনের মধ্যে ২১ জন বাংলাদেশি, ৪ জন দক্ষিণ সুদানি এবং ১ জন চাদের নাগরিক।
নিহত মো. সাহান এহিয়ার বড় ভাই জাকারিয়া এই মানবপাচারের নেপথ্যের চুক্তির কথা তুলে ধরে জানান, মাথাপিছু ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে গত মাসে দালালের মাধ্যমে তাঁরা বাড়ি থেকে রওনা হয়েছিলেন। পাচারকারীরা প্রথমে তাঁদের ঢাকা থেকে বিমানে সৌদি আরব, পরে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। লিবিয়া পৌঁছানোর পর চুক্তির অর্ধেক টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে তাঁদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। অবশেষে শনিবার বিকেলে চাচাতো ভাই রুহানের মাধ্যমে তাঁরা সাহানসহ দিরাইয়ের ৫ জনের মৃত্যুর খবর পান।
প্রশাসনের পদক্ষেপ ও অনুসন্ধান এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, শনিবার সন্ধ্যার পর বিষয়টি পুলিশের নজরে এসেছে এবং তাঁরা বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। পুলিশ স্বজনদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সনজীব জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে তাঁরা চারজন যুবকের মৃত্যুর প্রাথমিক খবর পেয়েছেন, যা অত্যন্ত কষ্টকর ও মর্মান্তিক। প্রশাসন এই মুহূর্তে যুবকদের মৃত্যুর সত্যতা এবং পাচারকারী চক্রের বিস্তারিত তথ্য যাচাই-বাছাই করছে।