বাংলাদেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বজুড়ে একটি সফল মডেল হিসেবে বিবেচিত হলেও, বর্তমানে তা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কেন্দ্রীয় গুদামে ১০টি রোগ প্রতিরোধের টিকার মজুত সম্পূর্ণ শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। টিকার এই তীব্র সংকটের কারণে চলতি মাসেই দেশজুড়ে হামে আক্রান্ত হয়ে অন্তত ৪১ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা, জনবল সংকট এবং তহবিল ছাড়ের বিলম্বই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দাতা সংস্থার তথ্যমতে, টিকা কেনার ক্ষেত্রে পূর্বে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় ‘অপারেশন প্ল্যান’ বা ওপি ব্যবস্থা চালু ছিল, যার মাধ্যমে দ্রুত টিকা কেনা যেত। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের আগস্টে পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়াই এই ওপি ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। ফলে নতুন প্রকল্প তৈরি ও অর্থছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে।
পাশাপাশি, সরকার পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) পদে রদবদলও একটি কারণ। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কিছুদিন পদটি খালি ছিল, এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত ডিজির পর বর্তমানে নির্বাচিত বিএনপি সরকারের আমলে নতুন ডিজি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। প্রশাসনিক এই পালাবদলের মাঝেই হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকা সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
কেন্দ্রীয় গুদামে টিকার অভাবের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে চরম অব্যবস্থাপনা বিরাজ করছে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
কর্মী সংকট: দেশের ৩৭টি জেলায় মাঠপর্যায়ে প্রায় ৪৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর পদ শূন্য রয়েছে।
বেতন বকেয়া: উপজেলা পর্যায় থেকে টিকাকেন্দ্রে টিকা পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকা ১ হাজার ৩২৬ জন ‘পোর্টার’ দীর্ঘ ৯ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না।
কর্মবিরতি: ২০২৫ সালে স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফায় কর্মবিরতিতে যাওয়ায় টিকাদান কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
ড্রপ আউট: গ্যাভির তথ্যমতে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে অনেক শিশু টিকার প্রথম ডোজ পেলেও নজরদারির অভাবে দ্বিতীয় ডোজ পায়নি, যারাই বর্তমানে বেশি মাত্রায় হামে আক্রান্ত হচ্ছে।
ইপিআইয়ের মাধ্যমে দেশে ১২টি রোগ প্রতিরোধে মোট ৯টি টিকা দেওয়া হয়। এর মধ্যে বর্তমানে কেন্দ্রীয় গুদামে ৬টি টিকার মজুত পুরোপুরি শূন্য:
বিসিজি (যক্ষ্মা প্রতিরোধক)
পেন্টা (ডিপথেরিয়া, পার্টুসিস, ধনুষ্টংকার, হেপাটাইটিস-বি ও হিমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা প্রতিরোধক)
বিওপিভি (পোলিও প্রতিরোধক)
পিসিভি (নিউমোনিয়া প্রতিরোধক)
এমআর (হাম ও রুবেলা প্রতিরোধক)
টিডি (নারী ও কিশোরীদের ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়া প্রতিরোধক)
হামের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, দ্রুত টিকা সংগ্রহের জন্য সরকার ইতিমধ্যে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। শিশুদের চিকিৎসায় মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে চরম অবহেলা হিসেবে দেখছেন। জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল এই প্রাণহানির জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে অবিলম্বে টিকা ফুরিয়ে যাওয়া এবং শিশুদের মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।