দুর্নীতি দমনে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক)। কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার এই প্রধান প্রতিষ্ঠানটি নিজেই এখন চরম আইনি দীর্ঘসূত্রতা, বিচারিক ধীরগতি এবং মামলাজটের এক বিশাল পাহাড়ের নিচে চাপা পড়েছে। নিম্ন আদালত থেকে শুরু করে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন আদালতে বর্তমানে দুদকের আট হাজারেরও বেশি মামলা বিচারাধীন অবস্থায় ঝুলে আছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রতি বছরই এই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, আর এর বিপরীতে মামলা নিষ্পত্তির হার ধারাবাহিকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। বিগত মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানেই আদালতগুলোতে নতুন করে প্রায় দুই হাজার মামলার বিশাল স্তূপ জমেছে। বিচার প্রক্রিয়ার এই মন্থরগতির কারণে দুর্নীতিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছেন, দীর্ঘায়িত হচ্ছে বিচার প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি দুর্নীতিবিরোধী রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানটির ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
পরিসংখ্যানে মামলাজট ও নিম্নমুখী নিষ্পত্তির চিত্র
দুদকের সর্বশেষ দাপ্তরিক তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এক ভয়াবহ আইনি স্থবিরতার চিত্র ফুটে ওঠে। ২০০৪ সালে পূর্বতন ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’ বিলুপ্ত করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রতিষ্ঠার পর থেকে চলতি বছরের (২০২৬ সালের) ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৮ হাজার ৩৩০টি দুর্নীতির মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
বছরের পর বছর ধরে এই মামলাজট কীভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে, তার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় বিগত পাঁচ বছরের ডিসেম্বরের পরিসংখ্যানগুলোর দিকে তাকালে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আদালতে দুদকের বিচারাধীন মামলা ছিল ৬,৩৭৩টি। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬,৬৬৭টিতে। এরপর ২০২৩ সালে ৭,২৭৮টি, ২০২৪ সালে ৭,৬৮৯টি এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আট হাজারের ঘর ছাড়িয়ে ৮,৩০৬টিতে গিয়ে পৌঁছায়।
মামলা বাড়ার পাশাপাশি নিষ্পত্তির হার কমার চিত্রটি আরও বেশি হতাশাজনক। পাঁচ বছর আগে যেখানে মামলা নিষ্পত্তির হার ছিল ১০ শতাংশের ওপরে, বর্তমানে তা নেমে এসেছে মাত্র ৭ শতাংশের ঘরে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালে নিষ্পত্তির হার ছিল ১০.০৮ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১০.১৭ শতাংশ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮.৬৫ শতাংশে এবং সর্বশেষ ২০২৫ সালে এই নিষ্পত্তির হার আরও কমে ৭.৬৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে।
দুই দশকের পুরোনো মামলা ও প্রভাবশালীদের আইনি কৌশল
দুদকের এই বিশাল মামলাজটের ভেতরে এমন অনেক মামলা রয়েছে, যেগুলো যুগের পর যুগ ধরে শুধু আদালতের বারান্দায় ঘুরপাক খাচ্ছে। জানা গেছে, বর্তমান এই জটের মধ্যে ৩৩৫টি মামলা রয়েছে যেগুলো দায়ের করা হয়েছিল আজ থেকে দুই দশক আগে, সেই বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরোর আমলে। এছাড়া, বিচার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সর্বোচ্চ আদালতের (আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট) স্থগিতাদেশ বা ‘স্টে অর্ডার’ থাকার কারণে বর্তমানে ৪৮৪টি মামলার বিচার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ বা স্থগিত হয়ে আছে।
আইনজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, দুদকের মামলাগুলোর বেশিরভাগ আসামিই হলেন সমাজের অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী-এমপি, শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিক, বড় বড় ব্যবসায়ী এবং বর্তমান ও সাবেক উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তারা। তাদের বিরুদ্ধে মূলত ঘুষ গ্রহণ, সরকারি তহবিল আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের (মানি লন্ডারিং) মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। আর্থিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ার কারণে এই আসামিরা দেশের শীর্ষ আইনজীবীদের নিয়োগ করে বিচার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করার সব ধরনের আইনি ফাঁকফোকরের আশ্রয় নেন। বিশেষ করে, বিচার চলাকালীন হাইকোর্টে একের পর এক রিট পিটিশন দায়ের করে বিচারিক কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ নিয়ে আসার মাধ্যমে তারা বছরের পর বছর সময়ক্ষেপণ করেন।
বিশেষ আদালতের অগ্রাধিকার সংকট ও সাক্ষীর অনুপস্থিতি
দুর্নীতির মামলাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য দেশে ‘বিশেষ জজ আদালত’ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো, এই বিচারকরা কেবল দুদকের মামলাই শোনেন না, বরং তাদের একই সঙ্গে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট (এনআই অ্যাক্ট বা চেক ডিজঅনার মামলা) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন মামলারও বিচারকাজ পরিচালনা করতে হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারকদের মধ্যে এনআই অ্যাক্ট এবং মাদকের মামলাগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি সাধারণ প্রবণতা রয়েছে। এর প্রধান কারণ হলো, দুর্নীতির জটিল ও নথিনির্ভর মামলার তুলনায় চেক ডিজঅনার বা মাদকের মামলাগুলো নিষ্পত্তি করা তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ এবং এতে সময়ও কম লাগে। ফলে দ্রুত বেশি মামলা নিষ্পত্তি করে নিজেদের ‘পারফরম্যান্স’ বা কর্মদক্ষতার ভালো রেকর্ড দেখানোর জন্য অনেক বিচারক দুর্নীতির মামলাগুলোকে অবচেতনভাবেই পিছিয়ে রাখেন।
অন্যদিকে, মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে সাক্ষীদের গাফিলতিকেও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখছেন দুদকের আইনজীবীরা। দুদকের পাবলিক প্রসিকিউটর মীর আহমেদ আলী সালাম এ বিষয়ে জানান, তারা প্রতিটি মামলার বিচারকাজ সময়মতো শেষ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই মামলার ধার্য তারিখে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা আদালতে উপস্থিত হন না। সাক্ষীদের এই অনীহা বা অনুপস্থিতির কারণে বাধ্য হয়েই আদালতকে সময় বাড়াতে হয়, যা বিচার প্রক্রিয়াকে প্রলম্বিত করে। তবে তিনি দাবি করেন, দুদকের মামলা নিষ্পত্তির হার খুব একটা কমেনি বা বাড়েনি, বরং একটি নির্দিষ্ট গতির মধ্যেই আছে।
রাজনৈতিক নিয়োগ ও জবাবদিহির চরম অভাব
মামলাজটের পেছনে আইনি ও কাঠামোগত কারণের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবকেও একটি বড় নিয়ামক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের জোরালো অভিযোগ, দুর্নীতি দমন কমিশন কাগজে-কলমে একটি স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও, এখানে বিভিন্ন সময় সরকার মেধা বা যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে আইনজীবী নিয়োগ দিয়ে থাকে।
রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত এই আইনজীবীদের অনেকেই নিজেদের পেশাগত দায়িত্বের চেয়ে দলীয় বা সরকারি স্বার্থের দিকে বেশি মনোযোগী থাকেন। ফলে প্রভাবশালী আসামিদের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যে ধরনের কঠোরতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি প্রদর্শন করা প্রয়োজন, অনেক সময় সেটি তারা করেন না। কমিশনের প্রকৃত স্বার্থ রক্ষার বদলে তারা সরকারের অলিখিত নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকেন, যা দুদকের মামলাগুলোকে আরও দুর্বল করে দেয়।
উত্তরণের উপায়: চাই আলাদা আদালত ও স্থায়ী প্রসিকিউশন
এই ভয়াবহ অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল) মঈদুল ইসলাম কিছু সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, দুর্নীতির মামলাজট বাড়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো দুদকের মামলাগুলোর জন্য সম্পূর্ণ আলাদা এবং নিবেদিত (ডেডিকেটেড) কোনো আদালত না থাকা।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিচারকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে একটি যুগান্তকারী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ওই নির্দেশনায় বিশেষ আদালতের বিচারকদের প্রতি মাসে ঠিক কতগুলো দুর্নীতির মামলা নিষ্পত্তি হলো, তার একটি পূর্ণাঙ্গ মাসিক প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে হাইকোর্টের সেই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনাটি বর্তমানে প্রায় পুরোপুরি উপেক্ষিত হচ্ছে।
মঈদুল ইসলাম জোর দিয়ে বলেন, এই সংকট সমাধানে কালক্ষেপণের আর কোনো সুযোগ নেই। অবিলম্বে শুধু দুদকের মামলার জন্য একচ্ছত্র ক্ষমতাসম্পন্ন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র আদালত প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি, রাজনৈতিক নিয়োগের চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে মেধাভিত্তিক ও দক্ষ আইনজীবীদের সমন্বয়ে দুদকের নিজস্ব একটি স্থায়ী ‘প্রসিকিউশন ইউনিট’ গঠন করতে হবে। সর্বপরি, হাইকোর্টের কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি ছাড়া দুর্নীতি মামলার এই বিচারিক স্থবিরতা কাটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতি রোধ করতে হলে শুধু চুনোপুঁটি নয়, রাঘববোয়ালদেরও দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন শুধু কাগজের পাতাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।