রাজনীতি এক অদ্ভুত চক্রের নাম, যেখানে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে ভিন্ন আবহে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি, যা দেশের ইতিহাসে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ (১/১১) নামে সমধিক পরিচিত, সেই সেনা-সমর্থিত অগণতান্ত্রিক সরকারের প্রবল ক্ষমতাধর কুশীলবরা আজ একে একে আইনের জালে আটকা পড়ছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর এই গ্রেপ্তার অভিযান দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। একদিকে যেমন বেরিয়ে আসছে পর্দার আড়ালের পুরনো সব গভীর ষড়যন্ত্রের গল্প, অন্যদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ২০০৭ সালের সেই ঘটনাপ্রবাহের এক অদ্ভুত ও জটিল সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
প্রভাবশালী দুই জেনারেলের পতন ও অভিযোগের পাহাড়
১/১১-এর কুশীলবদের বিরুদ্ধে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল, সম্প্রতি তাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সে সময়ের অন্যতম আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ও নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে গত ২৩ মার্চ রাজধানীর বারিধারার ডিওএইচএস এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিকভাবে পল্টন থানার একটি মানব পাচার ও প্রতারণার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও, বাস্তবে তার বিরুদ্ধে হত্যা, অর্থ পাচারসহ মোট ১১টি গুরুতর মামলা রয়েছে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে ১১৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আরেকটি বড় মামলা দায়ের করেছে। গত ২৫ মার্চ আদালত আগামী ৯ এপ্রিল এই মামলায় তার গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর গ্রেপ্তারের রেশ কাটতে না কাটতেই গত বুধবার গ্রেপ্তার হন ১/১১-এর সময়ের আরেক ক্ষমতাধর সামরিক কর্মকর্তা ও তৎকালীন ডিজিএফআই পরিচালক লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকে বেআইনিভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা, বিতর্কিত রাজনৈতিক ভূমিকা পালন, জলসিঁড়ি আবাসন প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, শেয়ারবাজারে কারসাজি এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মতো পাহাড়সম অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
ড. ইউনূসের ভূমিকা ও ‘নাগরিক শক্তি’ গঠনের নেপথ্য
১/১১-এর প্রসঙ্গ উঠলেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম। সে সময় সেনাসমর্থিত সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই সবার আগে তাকে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত রয়েছে যে, দুই বছরের সংক্ষিপ্ত মেয়াদের পরিবর্তে তিনি দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসতে চেয়েছিলেন। একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে নির্বাচনের মাধ্যমে ৫ বছরের ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি।
সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই জরুরি অবস্থার মধ্যে যখন দেশের সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তখন ২০০৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকায় একটি খোলা চিঠি লিখে রাজনীতিতে আসার ইচ্ছা পোষণ করেন ড. ইউনূস। এরপর ‘বাংলাদেশ এগিয়ে চলো’ স্লোগান নিয়ে ‘নাগরিক শক্তি’ নামে নতুন রাজনৈতিক দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল বিরাজনীতিকরণ—অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা। কিন্তু উপযুক্ত প্রার্থীর অভাব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অনমনীয় অবস্থানের কারণে ২০০৭ সালের মে মাসে সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। বর্তমানে তিনি ২০২৪ সালের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ায়, অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—১/১১-এর চক্রের বিচার শুরু হলে এই প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কারা কারা তদন্তের আওতায় আসবেন?
‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইন’: ২০০৭ বনাম ২০২৪
সম্প্রতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে ড. ইউনূস একটি ‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইন’ বা সুপরিকল্পিত নকশা বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ড. ফখরুদ্দীন আহমদকে সামনে রেখে যে সরকার গঠিত হয়েছিল, সেটিও ছিল একটি নিখুঁত ‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইন’।
সেই ডিজাইনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ছিল আওয়ামী লীগ। ফখরুদ্দীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয় অর্জন করে এবং পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে দীর্ঘ ১৫ বছরের একনায়কতন্ত্র কায়েম করে। এ কারণেই আওয়ামী লীগ সরকার কখনোই ১/১১-এর কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনেনি, বরং অনেককে পুরস্কৃত করেছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, যিনি ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান এবং পরে আওয়ামী লীগের মিত্র জাতীয় পার্টি থেকে বিনা ভোটে এমপি নির্বাচিত হন।
অন্যদিকে, ২০০৭ সালের সেই ‘ম্যাটিকুলাস ডিজাইনে’ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বিএনপি। তাই ২০২৪ সালে পটপরিবর্তনের পর বিএনপি যখন আবার প্রভাব বলয়ে ফিরে এসেছে, তখন তারা সেই পুরনো কুশীলবদের বিচারের আওতায় আনতে চাইছে। কিন্তু এখানেই তৈরি হয়েছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৭ সালের সুশীল সমাজ ও মিডিয়ার যে অংশটি ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নে কাজ করেছিল, তাদের অনেকেই আবার ২০২৪ সালের পটপরিবর্তনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
মিডিয়া ও সুশীল সমাজের বিরাজনীতিকরণ প্রকল্প
১/১১-এর সময়ে বিরাজনীতিকরণের এজেন্ডা বাস্তবায়নে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম, বিশেষ করে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই পত্রিকাগুলোর সম্পাদকরা এবং চ্যানেল আইয়ের শাইখ সিরাজসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রাজনীতিবিদদের ব্যাপকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরে সুশীল সমাজের শাসনকে একমাত্র সমাধান হিসেবে প্রচার করেছিলেন। সে সময় তারেক রহমান ও বেগম খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের চরিত্রহনন করে পত্রিকার পাতা ভরানো হতো, যা মূলত পর্দার আড়ালের ‘মাইনাস টু’ পরিকল্পনারই অংশ ছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০০৭ সালের সেই একই মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা (যেমন দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. বদিউল আলম মজুমদার) ২০২৪ সালের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার উদ্যোগেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন রয়েছেন।
পলাতক কুশীলব ও শঙ্কার বিচার প্রক্রিয়া
জেনারেল মাসুদ ও মামুনের গ্রেপ্তারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪০-৪৫ জনের একটি তালিকা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে ড. ইউনূস থেকে শুরু করে তৎকালীন সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, মাহফুজ আনাম, মতিউর রহমানসহ অনেকের নাম রয়েছে। যদিও এই তালিকার কোনো আনুষ্ঠানিক ভিত্তি নেই, তবে এটি জনমনে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি তৈরি করছে।
ইতিমধ্যেই ১/১১-এর অনেক প্রধান কুশীলব দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ এবং সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার আলোচিত কর্মকর্তা ব্রি. জে. (অব.) ফজলুল বারী ডালাসে এবং এটিএম আমিন ও সাঈদ জোয়ারদার দুবাই ও কানাডায় অবস্থান করছেন। দেশে রয়েছেন সে সময়ের বিতর্কিত দুদক চেয়ারম্যান লে. জেনারেল (অব.) হাসান মশহুদ চৌধুরী, যার বিরুদ্ধে সে সময় রাজনীতিবিদদের ঢালাওভাবে মামলার ফাঁদে ফেলার অভিযোগ রয়েছে।
শেষ কোথায়?
১/১১ এবং ৫ আগস্ট—দুটি ঘটনার প্রেক্ষাপট, কারণ এবং প্রতিপক্ষ সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, উভয় ক্ষেত্রে সুবিধাভোগী অবস্থানে থাকা কুশীলবদের মধ্যে এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র সংস্কারকে প্রাধান্য দিচ্ছে, আর বিএনপি চাইছে দ্রুত নির্বাচন। এই টানাপোড়েনের মধ্যেই ১/১১-এর কুশীলবদের গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় জনমনে একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এই বিচার প্রক্রিয়া কি শুধু কয়েকজন জেনারেল আর আমলাদের শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি ‘কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে সাপ বেরিয়ে আসার’ মতো ১/১১-এর মূল স্থপতি ও নেপথ্যের সব কারিগরদেরও তদন্তের মুখোমুখি করা হবে? দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বহুলাংশে নির্ভর করছে এই আইনি ও রাজনৈতিক সমীকরণের চূড়ান্ত পরিণতির ওপর।