চারপাশে কেবল অথৈ নীল জলরাশি, অথচ তেষ্টা মেটানোর জন্য এক ফোঁটা পানীয় জল নেই। মাথার ওপর প্রখর সূর্য আর পায়ের নিচে উত্তাল মৃত্যুভয়। একটুখানি অসাবধানতা মানেই চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। এটি কোনো সিনেমার রোমহর্ষক গল্প নয়; সোনালি ভবিষ্যতের খোঁজে ইউরোপ পাড়ি দিতে গিয়ে দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হওয়া আমাদেরই বাংলাদেশি ভাইদের এক নির্মম বাস্তব ট্র্যাজেডি। ভূমধ্যসাগরের বুকে সম্প্রতি রচিত হয়েছে মানব পাচারের এমনই আরও একটি নৃশংস উপাখ্যান। কিন্তু এই একটি ঘটনাই শেষ নয়; বছরের পর বছর ধরে গ্রামবাংলার সহজ-সরল তরুণেরা কেন এই মরণফাঁদে পা দিচ্ছেন, তা আজ এক গভীর জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২১শে মার্চ। লিবিয়ার তব্রুক বন্দর থেকে রাতের অন্ধকারে গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল একটি জরাজীর্ণ রাবারের নৌকা। মানব পাচারকারীরা যাত্রীদের একটি বড় ও নিরাপদ নৌকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে কোনো জিপিএস বা যোগাযোগের ডিভাইস ছাড়াই ৪৩ জন যাত্রীকে একটি ছোট রাবারের নৌকায় তুলে মাঝসাগরে ঠেলে দেওয়া হয়। এই ৪৩ জনের মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি।
সাগরের দিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় একপর্যায়ে দিক হারিয়ে ফেলেন নৌকার চালক। ফুরিয়ে যায় সাথে থাকা যৎসামান্য শুকনো খাবার আর পানীয় জলের শেষ ফোঁটাটুকু। টানা ছয় দিন ও ছয় রাত তারা সাগরে ভাসতে থাকেন। ক্ষুধা, তৃষ্ণা আর তীব্র ক্লান্তিতে একে একে নিস্তেজ হতে শুরু করে তরুণ শরীরগুলো। নৌকার ভেতরেই বিনা চিকিৎসায় ও অনাহারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন অন্তত ২২ জন। এরপর নেমে আসে এই ট্র্যাজেডির সবচেয়ে নিষ্ঠুর অধ্যায়। মৃতদেহের ভারে নৌকা ডুবে যাওয়ার আশঙ্কায় হিংস্র মানব পাচারকারীরা নির্দেশ দেয় লাশগুলোকে সাগরে ফেলে দেওয়ার জন্য। বেঁচে থাকার তাগিদে এবং পাচারকারীদের হুমকিতে নিজেদের চোখের সামনে আপন ভাই বা বন্ধুর নিথর দেহ অথৈ সাগরের নোনাজলে ছুড়ে ফেলতে বাধ্য হন হতভাগ্য যাত্রীরা। পরবর্তীতে গ্রিসের কোস্টগার্ড সাগর থেকে ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে, যাদের মধ্যে ২১ জনই বাংলাদেশি।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল হক নিশ্চিত করেছেন, লিবিয়ার তথাকথিত গেম ঘর থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে অন্তত ১৮ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ১০ জনই সুনামগঞ্জ জেলার বাসিন্দা।
দিরাই ও জগন্নাথপুর উপজেলার গ্রামে গ্রামে এখন চলছে শোকের মাতম। দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের নুরুজ্জামান সরদার ময়না ছিলেন তিন ভাই ও চার বোনের মধ্যে সবার আদরের। জমি এবং হালের গরু বিক্রি করে মা-বাবা ১২ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলেন দালালের হাতে। আজ ময়নার মামা উমেদ আলী বুক চাপড়ে কাঁদছেন আর বলছেন, “টাকাও গেল, ছেলেও চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেল।” শুধু ময়না নন, মৃত্যুর এই মিছিলে আরও রয়েছেন দিরাইয়ের সাজিদ শাহান, রনার চরের মুজিবুর রহমান, জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁওয়ের আমিনুর রহমান, টিয়ারগাঁওয়ের সায়ক মিয়া, ঈসাগাঁওয়ের মোহাম্মদ আলী এবং কবিরপুর গ্রামের নাইম আহমদ ও মনির হোসেন। নাইমের ভাই ঝিনুক মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, দালালরা মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে এই সোনার টুকরো ছেলেদের নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, কেন গ্রামবাংলার দুনিয়া না চেনা সহজ-সরল মানুষগুলো বারবার এই একই ফাঁদে পা দিচ্ছেন? এর পেছনের কারণগুলো কেবল জ্ঞানের অভাব নয়, বরং এর শিকড় লুকিয়ে আছে আমাদের আর্থসামাজিক কাঠামোর গভীর সংকটে।
প্রথমত, চরম অর্থনৈতিক হতাশা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের অভাব। গ্রামের একজন তরুণ যখন দেখেন দিনরাত হাড়ভাঙা খাটুনি খেটেও পরিবারের মুখে ঠিকমতো দুবেলা খাবার তুলে দেওয়া যাচ্ছে না, তখন তার ভেতরে এক ধরনের বেপরোয়া মানসিকতা তৈরি হয়।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপ নামক ‘সোনার হরিণ’-এর ভ্রান্ত মোহ। গ্রামের চায়ের দোকানে বা সামাজিক আড্ডায় দালালরা অত্যন্ত সুকৌশলে এমন সব গল্প ছড়িয়ে দেয়, যেখানে দেখানো হয় ইউরোপে পৌঁছাতে পারলেই রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। দালাল চক্র গ্রামের সহজ-সরল পরিবারগুলোকে বোঝায় যে, সমুদ্রপথের যাত্রাটি একেবারেই নিরাপদ এবং কয়েক ঘণ্টার ব্যাপার মাত্র। অজ্ঞতার কারণে এই তরুণেরা বুঝতে পারেন না যে, ভূমধ্যসাগর আসলে কতটা ভয়ংকর এবং ইউরোপের সীমান্ত নীতি কতটা কঠোর।
তৃতীয়ত, সামাজিক চাপ বা ‘পিয়ার প্রেশার’। যখন গ্রামের কোনো এক তরুণ বিদেশে গিয়ে দেশে টাকা পাঠায় এবং তার পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়, তখন প্রতিবেশী অন্য পরিবারগুলোও এক ধরনের অলিখিত সামাজিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। যেভাবেই হোক, ছেলেকে ‘লন্ডন’ বা ‘ইতালি’ পাঠাতেই হবে—এই অন্ধ আবেগ তাদের বাস্তব জ্ঞানকে ঢেকে দেয়।
ইউরোপে যাওয়ার এই অবৈধ যাত্রা কোনোভাবেই সস্তা নয়। দালালরা একেকজন তরুণের কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেয়। গ্রামের এই দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে এত নগদ অর্থ থাকে না। তারা দালালদের এই বিশাল অর্থের জোগান দিতে গিয়ে নিজেদের সর্বস্ব হারান।
শেষ সম্বল বিক্রি: বাবার চাষের জমি, হালের বলদ, এমনকি মায়ের শেষ সম্বল বিয়ের গয়নাটুকুও বিক্রি করে দেওয়া হয় দালালদের হাতে টাকা তুলে দেওয়ার জন্য।
উচ্চ সুদে ঋণ: অনেকেই স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে মাসিক ৫ থেকে ১০ শতাংশ চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করেন। এই আশায় ঋণ নেওয়া হয় যে, ছেলে ইউরোপে পৌঁছে দু-তিন মাসের মধ্যেই সব টাকা শোধ করে দেবে।
মাফিয়াদের মুক্তিপণ আদায়: লিবিয়া পৌঁছানোর পর দালালদের আসল রূপ বেরিয়ে আসে। সেখানে মাফিয়াদের তৈরি ‘ডিটেনশন ক্যাম্প’ বা বন্দিশালায় তরুণদের আটকে রেখে অমানুষিক শারীরিক নির্যাতন করা হয় এবং সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ হিসেবে আরও লক্ষ লক্ষ টাকা আদায় করা হয়।
অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রার এই মৃত্যুর মিছিলের পরিসংখ্যান শিউরে ওঠার মতো। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও দেশীয় গবেষকদের তথ্যমতে, ভূমধ্যসাগর আজ বাংলাদেশিদের জন্য এক বিশাল বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (IOM) তথ্য: সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবৈধভাবে ইউরোপে যেতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে মারা যাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মধ্যে ১২ শতাংশই বাংলাদেশি। ২০১৪ সালের পর থেকে ভূমধ্যসাগরে যত অভিবাসী ডুবে মারা গেছেন বা নিখোঁজ হয়েছেন, তার মধ্যে একটি বড় অংশ এই ভূখণ্ডের সন্তান।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সতর্কতা: বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের তথ্যমতে, প্রতিবছর লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার এই বিপজ্জনক রুটে অন্তত ৫০০ বাংলাদেশি মারা যান বা নিখোঁজ হন। এর বাইরে মাফিয়াদের ক্যাম্পগুলোতে শারীরিক নির্যাতনের কারণেও অনেকে প্রাণ হারান।
বিপজ্জনক জেলাগুলো: ব্র্যাক এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই অবৈধ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি মানুষ অংশ নিচ্ছেন দেশের নির্দিষ্ট কয়েকটি জেলা থেকে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নরসিংদী ও নোয়াখালী। এসব জেলার প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে দালালদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে সক্রিয় রয়েছে।
মামলার পাহাড়: সারা দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার ৪৮০টির বেশি মামলা বিচারাধীন ও তদন্তাধীন রয়েছে। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং দালালদের প্রভাবের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া জানিয়েছেন, যেহেতু তরুণেরা সম্পূর্ণ অবৈধ পথে যাত্রা করেছিলেন, তাই সরকারের কাছে আগে থেকে তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না। প্রশাসন এখন ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে মানব পাচারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যখন দালালরা দিনের পর দিন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে তরুণদের মগজ ধোলাই করছে এবং প্রকাশ্যে লাখ লাখ টাকা লেনদেন করছে, তখন স্থানীয় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কেন তা আগে থেকে টের পায় না?
সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিভিন্ন এনজিও নিরাপদ অভিবাসন নিয়ে কাজ করলেও তার প্রচারণা মূলত শহর বা উপজেলা সদর কেন্দ্রিক। প্রত্যন্ত গ্রামের যে তরুণটি আসলে দালালদের টার্গেট, তার কাছে এই সচেতনতার বার্তা পৌঁছাচ্ছে না।
মায়ের শেষ সম্বল গয়না আর বাবার হালের গরু বিক্রি করে ইউরোপ নামক এক সোনার হরিণের পেছনে ছুটে অকালে ঝরে যাচ্ছে আমাদের তরতাজা প্রাণগুলো। ভূমধ্যসাগরের নীল জল আজ এই তরুণদের পরিবারগুলোর চোখের জলে একাকার। যে খুনি দালাল চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তাদের সমূলে উৎপাটন এবং কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
এর পাশাপাশি, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গ্রাম পর্যায়ে নিরাপদ অভিবাসনের ব্যাপক প্রচার এবং দেশে কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে যুবকদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তা না হলে, ইউরোপের এই তথাকথিত ‘সোনার হরিণ’ এভাবেই আমাদের ভাইদের জীবন কেড়ে নিতে থাকবে এবং একের পর এক পরিবারকে পথে বসিয়ে ছাড়বে। আমাদের এখন গভীরভাবে ভেবে দেখার সময় এসেছে—একটি অনিশ্চিত বিলাসী জীবনের স্বপ্নের দাম কি আমাদের অমূল্য জীবনের চেয়েও বেশি?