ইতিহাসের চাকা ঘোরে, তবে সেই ঘোরার শব্দ সবসময় শোনা যায় না। ২০০৭ সালের ১/১১-এর রূপকথার নেপথ্য কাহিনিগুলো এখন ধীরে ধীরে প্রকাশিত হতে শুরু করেছে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! যে মানুষটি একদিন প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাকে জেলে পুরেছিলেন, আজ তার বিরুদ্ধেই মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ এবং তিনি নিজেই আজ বন্দি। প্রশ্ন উঠতেই পারে, কে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং কেন তাকে নিয়ে এত শোরগোল? এর উত্তর এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়, কারণ এর নেপথ্য কাহিনি মোটেও সরল নয়।
পর্দার আড়ালের ‘কিংমেকার’
আলাপের শুরুতে আপনাদের একটু ১৮ বছর পেছনে, ২০০৭ সালে নিয়ে যেতে চাই। ১১ জানুয়ারির বিকেল; বঙ্গভবনের ঘড়িতে তখন চারটা বাজে। সাভার থেকে স্ট্রাইকার সাঁজোয়া যান ঢাকার দিকে রওনা হয়েছে। লক্ষ্য—তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে জরুরি অবস্থার দলিলে সই করানো। পর্দার আড়ালে বসে দাবার এই ঘুঁটি চালছিলেন সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী।
গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘এক এগারো’ বইয়ে লিখেছেন, সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ যখন বঙ্গভবনের ভেতরে অন্যান্য পদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন, তখন বাইরে এক থমথমে পরিস্থিতি। সাভার থেকে আসা নবম পদাতিক ডিভিশনের সৈন্যরা তখন বঙ্গভবনের চারপাশে এবং কৌশলগত পয়েন্টগুলোতে অবস্থান নিয়েছিল। এই অবস্থান নেওয়া হয়েছিল জেনারেল মাসুদের নির্দেশে, যা ছিল রাষ্ট্রপতির ওপর এক বিশাল মনস্তাত্ত্বিক চাপ। জেনারেল মাসুদ জানতেন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে বন্দি করার চেয়ে তাকে ব্যবহার করা বেশি লাভজনক। রাষ্ট্রপতিকে স্রেফ দুটি বিকল্প দেওয়া হয়েছিল—হয় জরুরি অবস্থা, নয়তো সামরিক আইন। শেষ পর্যন্ত ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ জরুরি অবস্থা জারির নথিতে স্বাক্ষর করেন এবং প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে ইস্তফা দেন। তিনি হয়ে পড়েন একটি সাংবিধানিক ঢাল এবং রিমোট কন্ট্রোল রাষ্ট্রপতি, যার আসল বোতাম ছিল মাসুদের হাতে।
তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন, তখন এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীই ছিলেন ১/১১-এর পুরো ‘পলিটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ মূল নকশাকার। মঈন ইউ আহমেদ ছিলেন নাটকের দৃশ্যমান নায়ক, কিন্তু চিত্রনাট্য লিখেছিলেন মাসুদ। এ কারণেই তাকে অনেকেই সে সময়ের ‘কিংমেকার’ বলে থাকেন।
মাইনাস টু ফর্মুলা ও দুর্নীতির অভিযোগ
ক্ষমতা দখলের পর জেনারেল মাসুদকে ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটি’-এর প্রধান করা হয়, যা ছিল মূলত আতঙ্কের আরেক নাম। তার নির্দেশেই দেশের প্রথম সারির রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং ডিবির সেফ হাউজে নিয়ে তাদের ওপর চালানো হয়েছিল অমানবিক নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও সে সময় শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছিল।
মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী কেবল ক্ষমতা দখল করেই ক্ষান্ত হননি; তার মূল লক্ষ্য ছিল ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে চিরতরে মুছে ফেলা। সবাই ধারণা করেছিল, গণতান্ত্রিক সরকার ফিরলে তার বিচার হবে। কিন্তু রাজনীতির হিসাব বড়ই বিচিত্র! মাসুদ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের সাথে গোপন আঁতাত করেন এবং রাতারাতি তাদের প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন।
যে মানুষটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধেই ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ১০টি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট এজেন্সির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, তার প্রতিষ্ঠিত ‘5M International’-এর মাধ্যমে সাধারণ শ্রমিকদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিরাজনীতিকরণের বিপদ ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
জেনারেল মাসুদের এই উত্থান-পতন আমাদের রাজনীতিতে বিরাজনীতিকরণের একটি পুরনো চেষ্টাকেই সামনে নিয়ে আসে। ১/১১-এর সময় শহরের মধ্যবিত্ত ও সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ এই বিরাজনীতিকরণ প্রকল্পকে করতালি দিয়ে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু বিশ্লেষকরা এর ভিন্ন দিক দেখছেন।
ডক্টরাল ফেলো আসিফ বিন আলী যথার্থই বলেছেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে সুশীল সমাজ বা অন্যান্য যারা আছেন, তারা যতই নিজেদের নিরপেক্ষ, দেশপ্রেমিক বা সংস্কারক হিসেবে হাজির করুন না কেন, ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অনেকেরই করুণ পরিণতি হয়।” এর কারণ স্পষ্ট—রাজনীতিবিদরা ভুল করলেও তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকেন। কিন্তু এর বিপরীতে, আমলা বা জেনারেলরা যখন ক্ষমতার স্বাদ পান, তখন তারা দম্ভ আর লুণ্ঠন ছাড়া জাতিকে আর কিছুই উপহার দিতে পারেন না। রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে বাইপাস করার এই চেষ্টা এবং ক্ষমতার দম্ভ মানুষকে সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত সরকারের ভেতরেও কেউ কেউ এই পুরনো পথেই হাঁটতে চাইছেন বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন। আসিফ বিন আলীর মতে, যে যুক্তিতে ১/১১ সরকারের কর্মকাণ্ড, নির্যাতন এবং রাজনৈতিক কৌশল বিচারের আওতায় আসতে পারে, ঠিক একই যুক্তিতে ভবিষ্যতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হয়ে উঠতে পারে।
১৯৯০ বা ২০২৪—গণঅভ্যুত্থানগুলো বারবার পুরনো বন্দোবস্ত বদলানোর কথা বলে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা ক্ষমতায় আসেন বা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন, তারা এই ইতিহাস থেকে কতটা শিক্ষা নিচ্ছেন? প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রকৃত পরিবর্তন কি আদৌ হচ্ছে, নাকি আমরা কেবল নতুন মোড়কে পুরনো রাজনীতির বন্দোবস্তেই ফিরে যাচ্ছি?