রাজনীতি যদি একটি নাটক হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্য এখন তার সবচেয়ে জটিল অংকের মঞ্চ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে এখন বারুদের কড়া গন্ধ। ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকার ‘যুদ্ধ থেকে মুক্তি’র ঘোষণা আর ইসরায়েলের ‘অর্ধেক পথ পেরোনোর’ বার্তার মাঝখানে হঠাৎ এক নতুন শক্তিশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’র দ্বিতীয় অংকে এই নতুন সমীকরণ পুরো অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিচ্ছে।
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছেন যে তারা যুদ্ধের অর্ধেক পথ পাড়ি দিয়েছেন। সামরিক পরিভাষায় এই ‘অর্ধেক পথ’ মানে হলো—ইরানের প্রক্সি বাহিনীগুলোকে (হিজবুল্লাহ, হামাস) দুর্বল করার পর এখন সরাসরি ইরানের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানা। ইসরায়েলের লক্ষ্য এখন সুনির্দিষ্ট:
ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পুরোপুরি ধ্বংস করা।
ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া।
ইরানের অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী অস্থিরতা উসকে দিয়ে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন (Regime Change) ঘটানো।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে জনমত আর নির্বাচনের চাপে বলছেন তিনি যুদ্ধ দ্রুত শেষ করতে চান। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্যে আরও শক্তিশালী বিমানবাহিনী এবং অতিরিক্ত সৈন্য পাঠিয়েছে। ট্রাম্প চাইছেন এমন এক ‘বিজয়’ যেখানে তিনি বলতে পারবেন—আমেরিকার হস্তক্ষেপে ইরান নতজানু হয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল এত দ্রুত যুদ্ধ থামাতে নারাজ; তারা এই সুযোগে ইরানকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে চায়। ফলে আমেরিকা বের হতে চাইলেও ইসরায়েল তাকে দাবার বোর্ডে আটকে রাখছে।
দীর্ঘদিন মধ্যস্থতাকারী বা পর্দার আড়ালে থাকা সংযুক্ত আরব আমিরাত এখন সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেন এই পরিবর্তন?
হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা: বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনী হরমুজ প্রণালী সচল রাখা আমিরাতের অর্থনীতির জন্য জীবন-মরণ প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক জোট: আমিরাত শুধু একা নয়, তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট গঠনের প্রস্তাব আনার চেষ্টা করছে।
আমিরাতের এই সরাসরি অংশগ্রহণকে সামরিক ভাষায় ‘মানসিক রূপান্তর’ বলা হচ্ছে। তারা এখন শুধু আত্মরক্ষা নয়, বরং আক্রমণাত্মক অবস্থানে গিয়ে ইরানের প্রভাব খর্ব করতে চায়।
ইরানও হাত গুটিয়ে বসে নেই। ১ এপ্রিলের মিসাইল হামলার পর তারা সতর্ক করে দিয়েছে যে, কোনো উপসাগরীয় দেশ (যেমন আমিরাত বা সৌদি আরব) যদি সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয়, তবে তাদের তেল শোধনাগার এবং আকাশপথ গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।
অর্থনৈতিক অক্সিজেন: যদি হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি অক্সিজেন হারাবে। তেলের দামের ভয়াবহ উল্লম্ফন ঢাকা থেকে নিউইয়র্ক—প্রতিটি শহরের সাধারণ মানুষের পকেটে আঘাত হানবে।
সৌদি আরব এই মুহূর্তে এক কঠিন দোটানায়। একদিকে চিরশত্রু ইরানকে দুর্বল হতে দেখা তাদের জন্য আনন্দের, অন্যদিকে নিজের ভূখণ্ডে ইরানি মিসাইলের আঘাত তাদের জন্য আতঙ্কের।
ঐতিহাসিক সুযোগ: সৌদি গোয়েন্দা সূত্রের খবর অনুযায়ী, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এবং ইরানকে আরও কোণঠাসা করার পরামর্শ দিয়েছেন। রিয়াদ মনে করছে, এটিই ইরানকে চিরতরে আঞ্চলিক আধিপত্য থেকে সরিয়ে দেওয়ার সেরা সময়।
নিরাপত্তা বনাম অর্থনীতি: সৌদি আরব এখন পর্যন্ত সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। তারা মূলত পাকিস্তানের মাধ্যমে একটি শান্তি আলোচনার নাটক চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তাদের ওপর দায় না আসে। তবে ভেতরে ভেতরে তারা আমেরিকার সাথে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বড় ধরনের দর কষাকষি করছে।
বিকল্প পথ: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে সৌদির অর্থনীতি থমকে যাবে। তাই তারা লোহিত সাগরের মাধ্যমে বিকল্প পাইপলাইন সচল করার চেষ্টা করছে, যাতে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ বজায় রেখে মুনাফা লুটতে পারে।
রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যের এই বিশৃঙ্খলাকে তাদের ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে দেখছে।
তেলের বাজারে দাপট: হরমুজ প্রণালী বন্ধ হওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে রাশিয়ার তেল বিক্রির মুনাফা বহুগুণ বেড়েছে, যা তাদের ইউক্রেন যুদ্ধের খরচ মেটাতে সাহায্য করছে।
পরোক্ষ সমর্থন: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সম্প্রতি মোহাম্মদ বিন সালমানের সাথে ফোনে কথা বলে সৌদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। এটি মূলত আমেরিকাকে বার্তা দেওয়া যে—মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়াও একটি বড় শক্তি।
ইরানের সাথে সম্পর্ক: প্রকাশ্যে রাশিয়া ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের নিন্দা জানালেও তারা ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় গোয়েন্দা তথ্য এবং প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করছে বলে গুঞ্জন আছে। রাশিয়ার লক্ষ্য হলো আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত রাখা, যাতে ইউক্রেন ফ্রন্টে পশ্চিমা চাপ কমে যায়।
পুরো দৃশ্যপটকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—আমেরিকা যদি ‘রাজা’ হয় এবং ইসরায়েল ‘রানি’, তবে আমিরাত হলো সেই ‘ঘোড়া’ যে হঠাৎ করে চাল বদলে লাফ দিয়ে মাঝখানে চলে এসেছে। কিন্তু দাবার খেলায় প্রতিটি চালের মূল্য দিতে হয়। আমিরাত যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও ইরানের সাথে তাদের চিরস্থায়ী শত্রুতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতার মতো দীর্ঘমেয়াদী সংকটে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই নাটক এখন শেষ দৃশ্যের অপেক্ষায়। এখানে যে আগে থামবে সে হয়তো হারবে, কিন্তু যে বেশি দূর যাবে সে হয়তো সবকিছুই হারাবে। বন্দুক আর মিসাইলের এই লড়াই আসলে কৌশল, স্বার্থ আর সময়ের খেলা। বিশ্ব এখন রুদ্ধশ্বাসে তাকিয়ে আছে—হরমুজ প্রণালীর নীল জল কি শান্ত হবে, নাকি আগুনের শিখায় লাল হয়ে উঠবে?