যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের কারাজ শহরে অবস্থিত কৌশলগত ‘বি১’ (B1) সেতুটি ধ্বংস হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এই হামলার সরাসরি প্রতিশোধ হিসেবে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোর আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর একটি ‘হিট লিস্ট’ প্রকাশ করেছে। ইরানের এই কড়া হুঁশিয়ারি পুরো অঞ্চলের পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে এক ভয়াবহ সামরিক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গত ২ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) ভোরে তেহরানের পার্শ্ববর্তী আলবোর্জ প্রদেশের কারাজ শহরে নির্মাণাধীন বি১ সেতুতে দুই দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী। ১৩৬ মিটার উঁচু এই সেতুটি ছিল ইরানের আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যার অন্যতম বড় নিদর্শন, যা তেহরানের সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর সংযোগ সহজ করার জন্য তৈরি করা হচ্ছিল।
ক্ষয়ক্ষতি: হামলায় অন্তত ৮ জন নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই হামলার ভিডিও শেয়ার করে একে ‘বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং ইরানকে দ্রুত চুক্তিতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, এই সেতুটি পশ্চিম ইরানে ক্ষেপণাস্ত্র স্থানান্তরের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল।
হামলার পর ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) প্রতিশোধের অংশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশ ও জর্ডানের আটটি প্রধান সেতুর তালিকা প্রকাশ করেছে। এগুলো হলো:
১. শেখ জাবের আল-আহমাদ আল-সাবাহ সেতু (কুয়েত): ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সমুদ্র সেতুটি কুয়েতের একটি প্রধান লাইফলাইন।
২. কিং ফাহাদ কজওয়ে (সৌদি আরব-বাহরাইন): সৌদি আরব ও বাহরাইনকে সংযুক্তকারী একমাত্র স্থলপথ, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের লজিস্টিকসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. শেখ জায়েদ সেতু (সংযুক্ত আরব আমিরাত): আবুধাবির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে দ্বীপের সংযোগকারী প্রধান স্থাপত্য।
৪. শেখ খলিফা সেতু (সংযুক্ত আরব আমিরাত): আবুধাবির সায়াদিয়াত দ্বীপের সঙ্গে সংযোগকারী ১০ লেনের হাইওয়ে।
৫. আল মাকতা সেতু (সংযুক্ত আরব আমিরাত): আবুধাবি দ্বীপের অন্যতম প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ।
৬. কিং হোসেন ব্রিজ (জর্ডান): জর্ডান ও পশ্চিম তীরের মধ্যে যাতায়াতের প্রধান সীমান্ত সেতু।
৭. দামিয়া ব্রিজ (জর্ডান): জর্ডান ও পশ্চিম তীরের সংযোগকারী কৌশলগত সীমান্ত পারাপার।
৮. আবদুন ব্রিজ (জর্ডান): আম্মানে অবস্থিত একটি প্রধান ক্যাবল-স্টেড ব্রিজ।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এই হামলাকে ‘বেসামরিক অবকাঠামোয় শত্রুর চরম পরাজয়ের বার্তা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, সেতু ধ্বংস করে ইরানকে আত্মসমর্পণ করানো সম্ভব নয়। অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই তালিকার মাধ্যমে ইরান মূলত সেইসব দেশকে সতর্কবার্তা দিচ্ছে যারা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে বা পশ্চিমাদের সমর্থন দিচ্ছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমায় চরম সতর্কতা জারি করা হয়েছে। হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত বাণিজ্যিক জাহাজ ও সাধারণ পরিবহন এই হুমকির ফলে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। দুই পক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে এই ‘সেতু যুদ্ধ’ শেষ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতের দিকে মোড় নেয় কি না, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।