রাজধানীর চিরচেনা যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে ধরা হয় ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেট কারকে। তবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই চেনা দৃশ্যে ভিন্নতা দেখা দিচ্ছে। তীব্র জ্বালানি সংকট ও পাম্পগুলোতে দীর্ঘ অপেক্ষার বিড়ম্বনা এড়াতে সামর্থ্যবান অনেক মালিকই এখন নিজের গাড়ি গ্যারেজে রেখে মেট্রোরেল বা বাসের মতো গণপরিবহন বেছে নিচ্ছেন। এতে ঢাকার রাজপথে ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কমেছে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসের ব্যবধানে এই পথ ব্যবহারকারী যানবাহনের সংখ্যা প্রতিদিন গড়ে চার হাজার কমেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫৮ হাজার যানবাহন চলাচল করত, মার্চে তা ৫৪ হাজারে নেমে এসেছে। এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহারকারী যানবাহনের ৯০ শতাংশই প্রাইভেট কার হওয়ায় এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, তেলের সংকটে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ি বের করা কমিয়ে দিয়েছেন।
বিআরটিএ-এর হিসাবমতে, রাজধানীতে প্রায় আড়াই লাখ সচল প্রাইভেট কার থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেগুলোর একটি বড় অংশই এখন অলস পড়ে আছে।
রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোতে এখন ব্যক্তিগত গাড়ির সারি কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একেকটি গাড়িকে তেল নিতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। গাড়ির মালিক ও চালকরা বলছেন, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে মূল্যবান কর্মঘণ্টা নষ্ট করার চেয়ে গণপরিবহনে যাতায়াত অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও সময়োপযোগী মনে হচ্ছে। আবার পাম্পে গেলেই যে তেল পাওয়া যাবে, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। মাঝপথে তেল ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে অনেকেই দূরে যাতায়াতে ব্যক্তিগত গাড়ি এড়িয়ে চলছেন।
জ্বালানি পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের পক্ষ থেকেও ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। সম্প্রতি মন্ত্রীদের জ্বালানি বরাদ্দ ৩০ শতাংশ কমানোর পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গত সপ্তাহের মন্ত্রিপরিষদ সভায় শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমাতে এবং যানজট নিরসনে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইলেকট্রিক বাস আমদানির মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের সুযোগ করে দিতে পারে। বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হকের মতে, ঢাকার যানজট ও দূষণ কমাতে হলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আধুনিক ও উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমান জ্বালানি সংকট পরোক্ষভাবে মানুষকে সেই গণপরিবহন ব্যবস্থার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি করেছে, তার প্রভাব কেবল পকেটেই নয়, বরং জীবনযাত্রার ধরনেও পড়ছে। সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে ঢাকার রাজপথে ব্যক্তিগত গাড়ির দাপট আরও কমবে এবং মেট্রোরেল ও বাসের মতো গণপরিবহনের ওপর চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।