চলমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন ঘিরে সাধারণ মানুষের মনে এখন বড় প্রশ্ন—সংসদে কি সত্যিই গণমানুষের কথা হচ্ছে? গবেষণা বলছে, সংসদ সচল রাখতে প্রতি মিনিটে খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। সেই হিসেবে দিনে ৮ ঘণ্টা অধিবেশনে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর মাস শেষে এই খরচের অংক দাঁড়ায় ২৫০ কোটি টাকারও বেশি। কিন্তু জনস্বার্থ রক্ষায় এই বিপুল খরচের প্রতিফলন কতটুকু?
সংসদের ভেতরে এবং বাইরে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সনদ বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন অধ্যাদেশ সংশোধন। রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুতেই মাঠ গরম রাখছে। নিঃসন্দেহে একটি নতুন রাষ্ট্রের খোল নলচে বদলে ফেলতে এই সংস্কার জরুরি। কিন্তু এই সংস্কার আলাপের আড়ালে কি চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক প্রশ্নগুলো?
বর্তমানে দেশে স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রতিদিন গড়ে ৫ জন শিশু ‘হাম’ ও ‘রুবেলা’র মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা যাচ্ছে। গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় টিকাদান কর্মসূচিতে অবহেলার কারণে আজ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অথচ সংসদে এ নিয়ে কোনো উত্তপ্ত বিতর্ক বা দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার জোরালো দাবি দেখা যাচ্ছে না। বরং স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায় চাপানোর এক অদ্ভুত খেলা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইরান-আমেরিকা উত্তেজনার প্রভাবে বৈশ্বিক যে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের কৃষিতে। চুয়াডাঙ্গা ও উত্তরবঙ্গসহ দেশের বড় একটি অংশে ডিজেল ও বিদ্যুৎ সংকটে সেচ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সময়মতো সেচ না পেলে আউশ ধানের ফলন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। কৃষকের এই চরম বিপদে সংসদের উচ্চকণ্ঠ থাকার কথা থাকলেও, সেখানে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো কেবল রাজনৈতিক সংস্কার।
জ্বালানি সংকটের কারণে পণ্য সরবরাহ ৩০ শতাংশ কমে গেছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সময়সীমা কমিয়ে দেওয়ায় আয় কমছে ব্যবসায়ীদের। এর ফলে কর্মী ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিএনপি সংসদ সদস্যরা ইতিমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে, পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে আগামী দুই মাসের মধ্যে বহু মানুষকে ঢাকা ছাড়তে হতে পারে। অথচ এই মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলায় কার্যকর কোনো রোডম্যাপ সংসদে পেশ করা হয়নি।
জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাঁচাতে প্রধান শহরগুলোর স্কুল-কলেজ সপ্তাহে তিন দিন অনলাইন করার কথা ভাবছে সরকার। বিকল্প কোনো পথ না খুঁজে সরাসরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের এই প্রবণতা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির মুখে ফেলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার অনেক ক্ষেত্রে কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ‘হাইলাইট’ করে অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবন-মরণ সমস্যাগুলোকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মানুষ যখন সংবিধান বা সংস্কারের তত্ত্বে বিভ্রান্ত থাকে, তখন পেটের ক্ষুধার কথা মাথায় কম আসে—এই কৌশলী পথেই কি হাঁটছে সংসদ?
হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই সংসদ জনগণের আমানত। প্রতি মিনিটে পৌনে দুই লাখ টাকা ব্যয়ের এই অধিবেশনে যদি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সারের নিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা না হয়, তবে এই সংস্কার আলাপ কেবল তাত্ত্বিক বিলাসিতায় রূপ নিতে পারে। রাষ্ট্রযন্ত্রের আমূল পরিবর্তনের পাশাপাশি জনগণের ভাতের অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়াই এখন সংসদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।