শিরোনামঃ
দুর্নীতি ঠেকাতে হয়রানি?: সংশোধনের ক্ষমতা ঢাকায় আনায় বিপাকে সেবাপ্রার্থীরা দক্ষিণ এশিয়ার ‘ল্যান্ড ব্রিজ’ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ মান্দায় চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে জমি দখলের অভিযোগ: চরম ভোগান্তিতে কৃষক ও এলাকাবাসী থানকুনি পাতা: ১০টি জাদুকরী ভেষজ গুণ ও স্বাস্থ্য উপকারিতা ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয়কালে ভয়াবহ বিস্ফোরণ: আইআরজিসির ১৪ সদস্য নিহত ঢাকা বার নির্বাচন: নিরঙ্কুশ আধিপত্যে সব পদে জয়ী বিএনপিপন্থি ‘নীল প্যানেল’ রিয়ালে ফেরার গুঞ্জনে মুখ খুললেন মরিনহো ‘আহারে ব্রো, লাইফটাই স্পয়েল হয়ে গেল!’: আসিফ মাহমুদকে নীলার কটাক্ষ জেল থেকে ফিরে সিদ্দিকুর রহমানের নতুন জীবনের বার্তা তেহরানকে দমাতে পেন্টাগনের নতুন ছক: মাঠে নামছে ভয়ংকর ‘ডার্ক ঈগল’
শনিবার, ০২ মে ২০২৬, ০৬:০৬ অপরাহ্ন

৮ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি ২ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২০ বার
প্রকাশ: শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৬

রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের অব্যাহত ঊর্ধ্বগতিতে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম আট মাসেই (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯১ কোটি ডলারে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ২ লাখ ৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি (প্রতি ডলার ১২২.৫০ টাকা হিসেবে)। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৭১ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট-বিওপি) সংক্রান্ত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্র ফুটে উঠেছে।

আমদানির চাপ ও রপ্তানির মন্দা

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে ব্যবসায়ীরা মোট ৪ হাজার ৬১৭ কোটি (৪৬.১৪ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের (৪৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার) তুলনায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, এই সময়ে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৩ কোটি (৩০.০৩ বিলিয়ন) ডলার। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়ে রপ্তানি ছিল ২৯.২৬ বিলিয়ন ডলার। শতাংশের হিসেবে আমদানির ব্যয় বাড়লেও রপ্তানি আয় কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাণিজ্য ঘাটতির ওপর।

অর্থনীতিবিদদের মতে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে পবিত্র রমজানকে কেন্দ্র করে চিনি, ভোজ্যতেল, ছোলা, ডাল ও খেজুরের মতো নিত্যপণ্যের আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। বিশ্ববাজারে এসব পণ্যের দাম চড়া থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ আমদানিতে ব্যয় হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে প্রধান রপ্তানি খাতগুলো থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসার গতি ছিল মন্থর।

চলতি হিসাব ও সামগ্রিক ভারসাম্যের চিত্র

সাধারণত উন্নয়নশীল দেশের জন্য চলতি হিসাবের ভারসাম্য (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স) উদ্বৃত্ত থাকা ভালো। এটি নির্দেশ করে যে দেশটিকে নিয়মিত লেনদেনের জন্য ঋণ করতে হচ্ছে না। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বর্তমানে এটি ঋণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।

  • চলতি হিসাব: ফেব্রুয়ারি শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১০০ কোটি ডলার। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতি ছিল ১৪৭ কোটি ডলার, অর্থাৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও দেশটি এখনও ঋণের ওপর নির্ভরশীল।

  • সামগ্রিক ভারসাম্য (Overall Balance): স্বস্তির বিষয় হলো সামগ্রিক ভারসাম্য বর্তমানে ৩৪৩ কোটি ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। গত বছরের এই সময়ে এটি ১১৫ কোটি ডলার ঋণাত্মক ছিল। মূলত রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবৃদ্ধি এই সূচকটিকে রক্ষা করেছে।

রেমিট্যান্সের জোয়ার ও বিনিয়োগের ভাটা

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে প্রবাসীরা ২ হাজার ২৪৫ কোটি ডলারের রেকর্ড রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আগের বছরের ১ হাজার ৮৮৭ কোটি ডলারের তুলনায় এটি ২১.৪ শতাংশ বেশি। এই রেমিট্যান্সই মূলত ভঙ্গুর অর্থনীতিকে বড় পতনের হাত থেকে আগলে রেখেছে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠে দেখা যাচ্ছে বিদেশি বিনিয়োগের করুণ দশা। ১. এফডিআই: প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৭ কোটি ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১০৬ কোটি ডলার। ২. শেয়ারবাজার: দেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বা পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট এখন নেতিবাচক। প্রথম ৮ মাসে শেয়ারবাজার থেকে নিট ৮ কোটি ডলার বিদেশে চলে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের বড় প্রমাণ।

বৈদেশিক লেনদেনের বিস্তারিত প্রতিবেদন (২০২৫-২৬)

জুলাই-ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের বিওপি পরিসংখ্যান

খাত/সূচক ২০২৪-২৫ (৮ মাস) ২০২৫-২৬ (৮ মাস) পরিবর্তন (%)
মোট আমদানি ব্যয় ৪৩.৭৪ বিলিয়ন $ ৪৬.১৪ বিলিয়ন $ + ৫.৬%
মোট রপ্তানি আয় ২৯.২৬ বিলিয়ন $ ৩০.০৩ বিলিয়ন $ – ২.৬%
বাণিজ্য ঘাটতি ১,৩৭১ কোটি $ ১,৬৯১ কোটি $ + ২৩.৩%
রেমিট্যান্স প্রবাহ ১,৮৮৭ কোটি $ ২,২৪৫ কোটি $ + ২১.৪%
কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স (-) ১৪৭ কোটি $ (-) ১০০ কোটি $ উন্নতি
সামগ্রিক ভারসাম্য (-) ১১৫ কোটি $ (+) ৩৪৩ কোটি $ ইতিবাচক
* বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে দেশীয় মুদ্রার মান ধরে রাখা এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। শেয়ারবাজার থেকে ৮ কোটি ডলার বিদেশি বিনিয়োগ বের হয়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্ক সংকেত।

খাত সংশ্লিষ্টদের শঙ্কা

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে স্বাভাবিক গতিতে ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। রপ্তানি আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বিলাসজাত ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হবে। একইসাথে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং শেয়ারবাজারের পরিবেশ উন্নয়ন করে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে স্থিতিশীলতা আনা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, ক্রমবর্ধমান এই ঘাটতি বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর...