মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট ঝুঁকি মোকাবিলায় বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। জ্বালানি উৎস বহুমুখীকরণের লক্ষ্যে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল (ক্রুড অয়েল) ভারতে শোধন করে আমদানির জন্য ভারতের সাথে একটি বড় চুক্তির পথে এগোচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) রিফাইনারি সক্ষমতা ব্যবহারের বিষয়েও উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু হয়েছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, এই দ্বিমুখী কৌশল মূলত মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা কমানো এবং দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার একটি বৃহত্তর প্রয়াস।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ গত বুধবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী:
জি-টু-জি চুক্তি: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘সরকার-টু-সরকার’ (জি-টু-জি) ভিত্তিতে এই চুক্তি হবে।
শোধন প্রক্রিয়া: ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করবে, নিজেদের রিফাইনারিতে তা শোধন করবে এবং পরিশোধিত ডিজেল, অকটেন বা জেট ফুয়েল বাংলাদেশে রপ্তানি করবে।
খরচ: তেলের মূল্য, পরিশোধনের চার্জ এবং পরিবহন খরচ—সবই বাংলাদেশ বহন করবে।
ভারত বর্তমানে রাশিয়ার তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা ও শোধনকারী। রাশিয়ার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িক ছাড়কে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ এই সুযোগ নিতে চায়।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড মূলত মধ্যপ্রাচ্যের তেলের উপযোগী। এটি বছরে মাত্র ১৫ লাখ টন তেল শোধন করতে পারে এবং রাশিয়ার ‘ভারী’ ক্রুড শোধনের জন্য প্রযুক্তিগতভাবে এটি সক্ষম নয়। ফলে পরিশোধিত তেলের জন্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়, যা রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে বিপিসিকে ৬৬ হাজার ৩৪৪ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।
রাশিয়া-ভারত কৌশলের পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘শেখ আহমেদ বিন ফয়সাল আল কাসিমি গ্রুপ’ একটি বড় প্রস্তাব দিয়েছে। এই প্রস্তাব যাচাইয়ে ৪ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রস্তাবের মূল দিকগুলো হলো:
আমিরাতের রিফাইনারিতে ক্রুড অয়েল শোধন করে বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ।
বাংলাদেশে এলপিজি টার্মিনাল স্থাপন এবং এলপিজি ও গ্যাসঅয়েল সরবরাহ নিশ্চিত করা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম এই উদ্যোগকে ইতিবাচক মনে করলেও কিছুটা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তেলের বাজার অত্যন্ত অস্থির। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল থাকায় রাশিয়ান ক্রুড থেকে সুবিধা পাওয়া সম্ভব। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, তাই দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত।”
এছাড়াও অতি-নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি চীন ও মালয়েশিয়ার সরবরাহকারীরা ‘ফোর্স মাজ্যুর’ ঘোষণা করায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছিল, যা থেকে শিক্ষা নিয়ে একাধিক উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে শিলিগুড়ি-পার্বতীপুর পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারতের নুমালিগড় থেকে ডিজেল আসছে। রাশিয়ার তেল শোধনের এই নতুন উদ্যোগ সফল হলে সেটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল মাইলফলক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।