শিরোনামঃ
১২২ সরকারি সংস্থার দেনার বোঝা: ৮ লাখ কোটির ঝুঁকিতে রাষ্ট্রায়ত্ত খাত নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দেশ: জেল পালানো ১৮২ কয়েদির তথ্য নেই কারাগারে ঘন ঘন লোডশেডিং ও ওভারলোডিং: কোল্ডস্টোরেজে পচছে আলু, বাড়ছে জেনারেটর খরচ জাতীয় দলের ফুটবলার আল আমিনকে ১৫ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফিফা বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি নাগরিকদের ব্যাংক হিসাব খোলার নির্দেশনা জারি জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্যের শ্রদ্ধা রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি কেউ, ভোট বৃহস্পতিবার: ইসি সচিব ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইমরান খানকে হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ মিয়ানমারের বক্তব্যে বাংলাদেশের উদ্বেগ কারাগারের নাম বদলে ‘কাস্টডিয়াল অ্যান্ড কারেকশন সার্ভিস’ করার উদ্যোগ
বুধবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:২০ পূর্বাহ্ন

বন্ড সুবিধার আড়ালে স্পাইডার গ্রুপের মেগা জালিয়াতি: শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪৯ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬

জাল এফওসি, নকল ইউডি এবং ভুয়া এইচএস কোড ব্যবহার করে বন্ড সুবিধার চরম অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরের স্পাইডার গ্রুপের বিরুদ্ধে। তৈরি পোশাক বিদেশে রপ্তানির শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিপুল পরিমাণ উন্নত মানের কাপড় আমদানি করে তা সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ মিলেছে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। ছোট আয়তনের কারখানা, সীমিত সংখ্যক শ্রমিক এবং সীমাবদ্ধ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও গত ছয় মাসে প্রায় ৭৮ কোটি গজ কাপড় আমদানি করেছে তারা। নজিরবিহীন এই জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের শত শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে।

প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র অনুযায়ী, স্পাইডার গ্রুপের আওতাধীন তিনটি গার্মেন্টস—নিট বাজার লিমিটেড, বটম গ্যালারি এবং ট্রাউজার ওয়ার্ল্ডের নামে এই বিপুল পরিমাণ কাপড় আমদানি করা হয়েছে। শুল্ক গোয়েন্দাদের ফাঁকি দিতে প্রতিষ্ঠানটি বিদেশ থেকে কাপড় এনে পোশাক তৈরি করে তা রপ্তানি করা হয়েছে মর্মে ভুয়া ওয়ার্ক অর্ডারও তৈরি করে। পরবর্তীতে এই ভুয়া কাগজপত্র বন্ড কমিশনারেটের ওয়েবসাইটে আপলোড করে এবং তা জমা দিয়ে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাপড় আমদানি অব্যাহত রাখে। এই জালিয়াতির সাথে বন্ডের উপ-কমিশনার, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে শুরু করে প্রধান সহকারী পর্যন্ত অনেকের স্বাক্ষরিত জাল এফওসি ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে।

প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত গোপনে এই শুল্ক ফাঁকির মহাযজ্ঞ চালিয়ে গেলেও সম্প্রতি তৈরি পোশাক শিল্পের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিজিএমইএর নজরে বিষয়টি ধরা পড়ে। বিজিএমইএ থেকে ইস্যু হওয়া ইউডি (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি দেখতে পায়, আমদানিকৃত কাপড়ের পরিমাণের সাথে কারখানাগুলোর আয়তন ও শ্রমিকের সংখ্যার ব্যাপক গড়মিল রয়েছে। কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, গত ছয় মাসে এই তিনটি গার্মেন্টসের নামে বন্ড সুবিধায় মোট ৭৮ কোটি ২০ লাখ ৯৫ হাজার ১৮১ গজ কাপড় আমদানি করা হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ কাপড় দিয়ে উৎপাদন কাজ চালাতে কমপক্ষে ৩০টি বড় মাপের গার্মেন্টস কারখানার সমন্বিত কার্যক্রম প্রয়োজন। অথচ স্পাইডার গ্রুপের ৯৪ হাজার ৮৫ বর্গফুট আয়তনের কারখানায় শ্রমিক রয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৫২৮ জন।

এই চরম অসামঞ্জস্যতার কারণে বিজিএমইএ সন্দেহজনক আমদানির যথাযথ ব্যাখ্যা চেয়ে ওই তিনটি গার্মেন্টসকে পৃথক চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, কারখানার প্রতিস্থাপিত মেশিনারিজ এবং উৎপাদন ক্ষমতার সাথে আমদানিকৃত কাপড়ের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিজিএমইএতে জমা দেওয়া শতাধিক ঘোষণাপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আমদানি করা কাপড়ের মধ্যে রয়েছে উচ্চ কোয়ালিটির পলিয়েস্টার ডাইন ফেব্রিক, সিনথেটিক ফাইবার এবং পাইল ফেব্রিক (যাদের এইচএস কোড ৫৪০৭.৫২, ৬২০৪.৪৩, ৬০০১.৯২)। সাধারণত এই ধরনের কাপড় দিয়ে মহিলাদের বোরখা, হিজাব, গাউন, পার্টি ড্রেস, ব্যাগ, ছাতা বা সোফা ও কুশন তৈরি করা হয়, যা সাধারণ নিটিং বা ওভেন গার্মেন্টসে ব্যবহৃত হয় না।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, আমদানি করা এই বিপুল পরিমাণ কাপড় দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি কী ধরনের পোশাক তৈরি করেছে এবং তা কোন দেশে রপ্তানি করেছে, তার কোনো বৈধ প্রমাণ তারা দেখাতে পারেনি। কাটিং রেজিস্ট্রার, ডেলিভারি চালান, প্যাকিং লিস্ট, ইনস্পেকশন সার্টিফিকেট বা শিপমেন্টের মতো কোনো বৈধ কাগজপত্রও তারা প্রদর্শন করতে ব্যর্থ হয়েছে।

চিঠির বিষয়ে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সচিব মেজর (অব.) মো. সাইফুল ইসলামের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তিনটি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল এবং তারা যথাসময়ে জবাব দিয়েছে। তাদের জবাবে বিজিএমইএ সন্তুষ্ট এবং বিষয়টি ওখানেই মিটমাট হয়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে তারা কী ব্যাখ্যা দিয়েছে বা সেই জবাবের কোনো নথিপত্র তিনি সরবরাহ করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, স্পাইডার গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) মো. রোকনউদ্দিনের বক্তব্য বিজিএমইএর বক্তব্যের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি দাবি করেন, বিজিএমইএর চিঠিতে কিছু ভুল তথ্য ছিল। তারা বিজিএমইএ ভবনে গিয়ে একাধিক মিটিং করে বিষয়টি মৌখিকভাবে সমাধান করে এসেছেন। এর জন্য কোনো লিখিত চিঠির জবাব বা নথিপত্র তাদের দিতে হয়নি। এত বড় একটি জালিয়াতির অভিযোগ কোনো লিখিত প্রমাণ ছাড়াই কেবল মৌখিক আলোচনার ভিত্তিতে কীভাবে নিষ্পত্তি হলো, তা নিয়ে গভীর রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের গোয়েন্দা সেলের প্রধান মোহাম্মদ আব্দুর রকিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের এ ধরনের অনেক ঘটনাই ঘটে থাকে। তবে সুনির্দিষ্ট কাগজপত্রসহ কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলে তারা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তদন্ত করে দেখবেন এবং শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


এ জাতীয় আরো খবর...