আসন্ন ঈদুল আজহা ২০২৬-কে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার পশুর হাটে বইছে এক ভিন্নধর্মী হাওয়া। দীর্ঘ প্রায় বিশ বছর পর ঢাকার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারা নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ। তবে এই প্রতিযোগিতার মূল কেন্দ্রে রয়েছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি—ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ সময় সিন্ডিকেটের দখলে থাকা পশুর হাটের ইজারা নিয়ন্ত্রণ নিতে এবার দুই দলের মাঠপর্যায়ের নেতারা রীতিমতো টক্করে নেমেছেন, যা কোথাও কোথাও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
বিগত প্রায় দুই দশক ধরে রাজধানীর পশুর হাটগুলো ইজারার ক্ষেত্রে একটি অলিখিত ‘সিন্ডিকেট প্রথা’ কাজ করত। বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের দরপত্র কেনা তো দূরের কথা, হাটের ধারেকাছে ঘেঁষার সুযোগও ছিল না। ফলে নামমাত্র মূল্যে হাটের ইজারা দিয়ে দুই সিটি করপোরেশন প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাত।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ২০২৫-এর নির্বাচনের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে। ২০২৬ সালের এই কোরবানির ঈদে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) হাটগুলোতে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। কোথাও কোথাও তাদের সাথে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাদেরও সক্রিয় দেখা গেছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) হাটগুলোতে বরাবরের মতোই বিএনপির একক আধিপত্য বজায় রয়েছে।
পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ডিএসসিসি নগর ভবনে নজিরবিহীন উত্তেজনা দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৭ এপ্রিল যাত্রাবাড়ী, পোস্তগোলা এবং শ্যামপুর এলাকার হাটের দরপত্র সংগ্রহ করতে এলে শ্যামপুর থানা জামায়াতের আমির মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও তার কর্মীদের সাথে স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে নগর ভবনের সম্পত্তি বিভাগে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হয়।
পরবর্তীতে বিশৃঙ্খলা এড়াতে সিটি করপোরেশনের সব আঞ্চলিক কার্যালয় এবং জেলা প্রশাসকের অফিস থেকে দরপত্র বিক্রির ব্যবস্থা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার দরপত্র খোলার দিনেও নগর ভবনে দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১২টি অস্থায়ী হাটের দরপত্র যাচাই-বাছাইয়ে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা বিএনপি নেতাদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দর দিয়েছেন।
দনিয়া কলেজ মাঠ: এই হাটটি গত বছর বিএনপি নেতা তারিকুল ইসলাম তারেক ইজারা নিয়েছিলেন। এবারও তিনি ১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার পে-অর্ডার জমা দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট দর উল্লেখ করেননি। বিপরীতে স্থানীয় জামায়াত নেতা শামীম খানের প্রতিষ্ঠান ‘কে বি ট্রেড’ ৪ কোটি ৩৫ লাখ টাকা দর দিয়ে সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পরে জানাবে বলে জানিয়েছে।
পোস্তগোলা শ্মশানঘাট: এই হাটের সরকারি মূল্য ছিল ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। বিএনপি নেতা কাজী মাহবুব মওলা হিমেল ৪ কোটি ১ লাখ টাকায় এটি ইজারা নিয়েছেন। এখানে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা পর্যন্ত দর দিয়েছিলেন।
আমুলিয়া মডেল টাউন: গত বছর ৫৫ লাখ টাকায় ইজারা যাওয়া এই হাটটি এবার বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদিন রতন ২ কোটি ১৫ লাখ টাকায় নিয়েছেন। জামায়াত নেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণে এখানে দর কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
গোলাপবাগ মাঠ: সরকারি মূল্য ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টাকা হলেও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে স্থানীয় বিএনপি নেতা আহসানউল্লাহ ২ কোটি ৫ লাখ টাকায় এটি ইজারা পেয়েছেন।
উত্তর সিটি করপোরেশনে জামায়াতের উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকায় সেখানে বিএনপির নেতাদের আধিপত্য স্পষ্ট।
উত্তরা দিয়াবাড়ি: ডিএনসিসির ১২টি হাটের মধ্যে এই হাটে সর্বোচ্চ ১৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা দর দিয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক শেখ ফরিদ হোসেন।
মস্তুল চেকপোস্ট: ৯৩ লাখ টাকা সরকারি মূল্যের এই হাটে ৩ কোটি ৬০ হাজার টাকা দর দিয়ে ইজারা নিয়েছেন বিল্লাল হোসেন নামের এক ব্যবসায়ী।
তবে ডিএনসিসির ৪টি এবং ডিএসসিসির ২টি হাটে কোনো দরপত্রই জমা পড়েনি, যা নতুন করে ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের আশঙ্কায় ফেলেছে করপোরেশন কর্তৃপক্ষকে।
প্রতিযোগিতার কারণে অনেক হাটে রাজস্ব বাড়লেও অভিযোগ উঠেছে এক অভিনব কারসাজির। সিন্ডিকেটভুক্ত ইজারাদারদের সুবিধা দিতে খাতা-কলমে হাটের নাম পরিবর্তন করে সরকারি মূল্য কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
যেমন, যাত্রাবাড়ীর একটি হাটের নাম পরিবর্তন করে গত বছরের ৪ কোটি ৭২ লাখ টাকার সরকারি মূল্য এবার ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে হাজারীবাগ ইনস্টিটিউট অফ লেদার টেকনোলজি হাটের নাম ও স্থান সামান্য পরিবর্তন করে সরকারি মূল্য ৪ কোটি ৯৪ লাখ থেকে কমিয়ে ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা করা হয়েছে। কমলাপুর এবং ধোলাইখাল এলাকার হাটগুলোতেও আয়তন কম দেখিয়ে সরকারি মূল্য প্রায় কোটি টাকা কমানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ‘উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে’ জায়গার নাম বদলে সরকারি মূল্য কমানো হয়েছে।
পশুর হাটে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের এক নেতা জানান, “বিগত ১৫ বছর আমাদের কোনো দরপত্রে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফেরায় আমাদের কর্মীরা ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছেন। বৈধ ব্যবসার ক্ষেত্রে দলের কোনো বাধা নেই।”
অন্যদিকে বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের সুবিধার্থে এবং একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হাট পরিচালনা করতে চান। তবে দুই দলের এই লড়াই মূলত মাঠপর্যায়ে নিজেদের সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শনেরও একটি বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সব মিলিয়ে ঢাকার ২৪টিরও বেশি অস্থায়ী পশুর হাট এবার রাজনীতির লড়াইয়ের ময়দানে পরিণত হয়েছে। প্রতিযোগিতার ফলে সিটি করপোরেশনগুলোর রাজস্ব গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে সিন্ডিকেট করে ৯টি হাটে দরপত্র জমা না দেওয়া এবং সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে মূল্য কমানোর যে অভিযোগ উঠেছে, তা নিরসন করা না গেলে সাধারণ জনগণ ও ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে তিন ধাপে ইজারা প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে, তখন বোঝা যাবে শেষ পর্যন্ত হাটের লাগাম কার হাতে থাকে—বিএনপি না জামায়াত?