একসময় নাফ নদ আর বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিতে জাল ফেলে রূপালি ইলিশ আর কোরাল শিকারই ছিল শাকের মাঝিদের নেশা ও পেশা। নোনা জলের ঝাপটায় জীবন চলত সচ্ছলতায়। কিন্তু সময় বদলালো, জালে মাছের আকাল পড়ল। ঠিক সেই সময়, ২০০৭ সালের দিকে বঙ্গোপসাগরের লোনা বাতাসে এক নতুন ‘শিকারের’ ঘ্রাণ পেলেন শাকের। মাছ নয়, এবার তাঁর টার্গেট ‘মানুষ’। মাছ যেমন কেজি দরে বিক্রি হয়, সাগরপাড়ে মানুষ বিক্রি শুরু হলো ‘মাথা’ দরে। এক যুগেরও বেশি সময় পর, ২০২৬ সালে এসে সেই মরণখেলা এখন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে, যার নাটের গুরুরা বসে আছে সুদূর মালয়েশিয়া আর থাইল্যান্ডে।
শাকের মাঝির জীবনের মোড় ঘুরেছিল এক প্রলোভনে। পাচারচক্রের হোতারা প্রস্তাব দিয়েছিল—ট্রলারে মাত্র একজন ‘যাত্রী’ তুলে দিতে পারলেই নগদ ২০ হাজার টাকা। গভীর সমুদ্রে ঝড়-তুফানের সঙ্গে লড়াই করে মাসের পর মাস জাল ফেলেও যে টাকা আসত না, তা মিলছে মাত্র একজন মানুষ জোগাড় করলেই। শাকের আহমদ হয়ে উঠলেন ‘শাকের মাঝি’—যিনি এখন টেকনাফ-উখিয়া অঞ্চলে এক নামে পরিচিত ‘মানুষ শিকারি’ হিসেবে।
শুরুটা হয়েছিল প্রলোভন দিয়ে। মালয়েশিয়ার সোনালী জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সাধারণ তরুণ আর অসহায় রোহিঙ্গাদের ট্রলারে তোলা হতো। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যখন মানুষের সচেতনতা বাড়ল, তখন এই ব্যবসায় যুক্ত হলো ‘অপহরণ’। এখন আর শুধু স্বপ্ন দেখানো নয়, বরং জবরদস্তি তুলে নিয়ে যাওয়া কিংবা জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ই এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি।
এই পুরো সিন্ডিকেটের চূড়ায় বসে আছেন মৌলভি আব্দুর রহিম। একসময় টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে সাধারণ ‘আদম ব্যবসায়ী’ হিসেবে পরিচিত রহিম ২০০৫ সালে নিজেই ট্রলার চালিয়ে মালয়েশিয়া যাওয়ার সহজ রুট আবিষ্কার করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। বর্তমানে তিনি থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন, যাঁর চারপাশে ঘোরে সশস্ত্র বডিগার্ড।
রহিমের এই বিশাল সাম্রাজ্য বাংলাদেশে পরিচালনা করে তাঁর দুই বিশ্বস্ত শিষ্য—নানা মাঝি এবং সৈয়দ হোসেন।
নানা মাঝি (মো. ফয়েজ): কক্সবাজারের এই বাসিন্দা টেকনাফে বসে পুরো পাচার কার্যক্রম সমন্বয় করেন। ট্রলার প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে যোগাযোগ—সবই তাঁর নখদর্পণে। তাঁর ভাই সৈয়দ মাঝি বর্তমানে কারাগারে থাকলেও নানা মাঝির সিন্ডিকেট এখনো সক্রিয়।
সৈয়দ হোসেন: রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ‘অঘোষিত সম্রাট’। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাঁর রয়েছে অন্তত ১০০ জন সক্রিয় এজেন্ট। এই এজেন্টদের মূল টার্গেট অবিবাহিত তরুণী এবং যুবক। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের ভয়েস মেসেজের মাধ্যমে চলে তাদের যাবতীয় অপরাধের পরিকল্পনা।
এই চক্রটি এখন আর নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ নেই। তারা মিশে আছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—কক্সবাজারের কলাতলী মোড় থেকে মেরিন ড্রাইভ হয়ে টেকনাফগামী সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলো এখন অপহরণের প্রধান হাতিয়ার। অনেক সময় চালকের বেশে থাকা সিন্ডিকেট সদস্যরা একা যাত্রী পেলেই তুলে দিচ্ছে পাহাড়ের আস্তানায়।
চক্রের সদস্যরা ছদ্মবেশ ধারণে পটু। সিএনজি চালক, মুদি দোকানি, এমনকি নারী ও শিশুদেরও এই কাজে নিয়োগ করা হয়েছে। এদের কাজ হলো টার্গেট ব্যক্তির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা এবং সুযোগ বুঝে মূল অপহরকদের খবর দেওয়া। স্থানীয়দের ভাষায়, “এক মাথার দাম ৫০ হাজার টাকা।” ট্রলার ছাড়ার দিন ঘনিয়ে এলে এরা মরিয়া হয়ে ওঠে, যাকে পায় তাকেই ধরে নিয়ে ট্রলারে তুলে দেয়।
টেকনাফ ও উখিয়ার ১১টি পয়েন্ট এখন মানবপাচারের প্রধান রুট হিসেবে চিহ্নিত। কচ্ছপিয়া, সাবরাং, মুণ্ডা ডেইল, রাজারছড়া থেকে শুরু করে উখিয়ার ইনানী পর্যন্ত বিস্তৃত এই মরণপথ। এর মধ্যে বাহারছড়ার নোয়াখালীপাড়া এবং সাবরাং ঘাট সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। রোহিঙ্গা নাগরিক আবু তৈয়বের বয়ানে জানা যায়, গত দুই বছরে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল আন্দামান সাগরে ২৬০ জন যাত্রী নিয়ে একটি ট্রলারডুবি এই ক্ষতের ওপর লবণের ছিটা দেয়। আড়াই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হলেও উদ্ধার হওয়া মাত্র ৯ জনের মধ্যে ৬ জনই ছিল পাচারকারী চক্রের সদস্য।
এই সিন্ডিকেটের থাবায় ধ্বংস হয়ে গেছে শত শত পরিবার। টেকনাফের মাছ ব্যবসায়ী শামসুল আলম কাজলের গল্পটি তেমনই এক ট্র্যাজেডি। তাঁর দুই ছেলে সাদ কামাল ও সাইফুলকে অপহরণ করে পাচার করে দেয় শাকের মাঝির চক্র। থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে বন্দিশালায় সাদের মুক্তির জন্য ৪ লাখ টাকা দিলেও সাইফুল প্রাণ হারান নির্মম নির্যাতনে। গত ১৭ এপ্রিল ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর এই পরিবারের চোখের জল আর থামছে না।
এমন অসংখ্য ‘সাইফুল’ হারিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে কিংবা বঙ্গোপসাগরের লোনা জলে। অনেকের মুক্তিপণ দেওয়ার সামর্থ্য নেই, তাদের ঠাঁই হচ্ছে গণকবরে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই চক্রের অনেক হোতা একসময় মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত ছিল। ২০১৯ সালে সরকারি আহ্বানে সাড়া দিয়ে যে ১০২ জন ইয়াবা কারবারি আত্মসমর্পণ করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে শাকের মাঝি ও শামসুল আলম শামীমের মতো অনেকেই ছিলেন। জেল থেকে বেরিয়ে তাঁরা অপরাধের ধরন বদলে ফেলেছেন। ইয়াবার চেয়ে এখন তাঁদের কাছে ‘মানুষ পাচার’ অনেক বেশি লাভজনক।
শাকের মাঝি বর্তমানে পলাতক থাকলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে নিজেকে ‘অসহায় জেলে’ দাবি করে সাফাই গেয়েছেন। অথচ তাঁর মুণ্ডা ডেইল এলাকায় গড়ে তোলা বিলাসবহুল বাড়ি আর অঢেল সম্পত্তি তাঁর ‘অসহায়ত্বের’ মুখোশ খুলে দেয়।
টেকনাফ মডেল থানার পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত চালিয়ে কিছু আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আসামিরা একে অপরের ওপর দায় চাপিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা করছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক চক্রটি দেশের বাইরে থাকায় তাদের আইনের আওতায় আনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কক্সবাজারের সাগরপার একসময় ছিল পর্যটকদের স্বর্গরাজ্য। কিন্তু আজ সেখানে বাতাসে লাশের গন্ধ আর স্বজন হারানোদের হাহাকার। মাছ শিকারিরা যখন মানুষ শিকারে মত্ত হয়, তখন নৈতিকতার পতন ঘটে চূড়ান্ত পর্যায়ে। নাটের গুরু মৌলভি আব্দুর রহিম কিংবা তাঁর শিষ্য নানা মাঝিরা যে রক্তের বিনিময়ে অট্টালিকা গড়ছেন, তার প্রতিটি ইট মানুষের কান্না দিয়ে ভেজানো।
এই মরণখেলা বন্ধ করতে হলে কেবল স্থানীয় দালালদের ধরলে চলবে না, বরং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে মূল হোতাদের ফিরিয়ে আনা জরুরি। অন্যথায়, ‘কেজি দরে মাছ বিক্রির মতো মাথা দরে মানুষ বিক্রি’র এই সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলবে।
এই ভয়ংকর সিন্ডিকেটের জাল আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে শুরু করে স্থানীয় সিএনজি স্ট্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত।
সিন্ডিকেটের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস:
পুরো চক্রের নাটের গুরু বা প্রধান নিয়ন্ত্রক হিসেবে সুদূর মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে কলকাঠি নাড়েন আন্তর্জাতিক মাফিয়া মৌলভি আব্দুর রহিম। বাংলাদেশে তাঁর এই ‘মানুষ শিকারের’ সাম্রাজ্য দেখাশোনা করার জন্য প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেন মো. ফয়েজ ওরফে নানা মাঝি, যাঁর প্রধান কাজ হলো ট্রলার প্রস্তুত করা এবং সরাসরি পাচার কার্যক্রম তদারকি করা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এই জালের বিস্তার ঘটিয়েছেন ক্যাম্প লিডার সৈয়দ হোসেন, যাঁর অধীনে ৩৩টি ক্যাম্পে শতাধিক এজেন্ট সক্রিয় রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সরাসরি অপহরণ ও প্রলোভন দেখিয়ে মানুষ শিকারের দায়িত্বে থাকেন শাকের মাঝির মতো কুখ্যাত অপরাধীরা। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় নিখুঁতভাবে নজরদারি ও টার্গেট ব্যক্তি শনাক্ত করার কাজ করে একটি ভ্রাম্যমাণ নেটওয়ার্ক, যার ছদ্মবেশে রয়েছে সিএনজি অটোরিকশাচালক, নারী ও এমনকি শিশু-কিশোররাও।
মানুষের এই মরণযাত্রা থামানোর দায়িত্ব কেবল প্রশাসনের নয়, সচেতন হতে হবে প্রতিটি পরিবারকেও। সোনালী স্বপ্নের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি—এই সত্যটি পৌঁছাতে হবে নাফ নদের পাড়ের প্রতিটি কুঁড়েঘরে।
সূত্র: দৈনিক কালের কন্ঠ