২০২৬ সাল। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার যখন টালমাটাল, ঠিক তখন বাংলাদেশের অর্থনীতি এক বিশাল ভর্তুকির চাপের মুখে দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি মার্কিন ভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ‘ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস’ (IEEFA) এর একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা দেশের নীতিনির্ধারক ও সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। প্রতিবেদনটি বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আকাশচুম্বী দাম যদি অব্যাহত থাকে, তবে চলতি এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ১.০৭ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ১৩,১৩৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতে পারে।
এই বিশাল ব্যয়ের বোঝা কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়; এটি দেশের সাধারণ গ্রাহকদের ওপর বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির খড়গ হয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইইইএফএ-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম যদি প্রতি এমএমবিটিইউ ২০ ডলার ধরে রাখা হয়, তবে এই তিন মাসে যে বিশাল ভর্তুকির প্রয়োজন হবে তা সরকারের বার্ষিক বরাদ্দকেও ছাড়িয়ে যাবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পুরো বছরের জন্য সরকার এলএনজি খাতে ভর্তুকি বরাদ্দ রেখেছিল মাত্র ৯,০০০ কোটি টাকা। অথচ এপ্রিল-জুন এই এক প্রান্তিক মেটাতেই প্রয়োজন হতে পারে ১৩,১৩৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিন মাসেই পুরো বছরের বাজেটের চেয়ে বেশি টাকা ফুরিয়ে যাবে।
পেট্রোবাংলা অবশ্য আইইইএফএ-এর চেয়ে কিছুটা কম হিসাব দিয়েছে। তাদের মতে, এই প্রান্তিকে ১১,৯৯৬ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। তবে ১১ হাজার হোক বা ১৩ হাজার—উভয় সংখ্যাই সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সরকার এই প্রান্তিকে মোট ৩০টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করছে, যার মধ্যে অন্তত ২৪টি আসবে স্পট মার্কেট থেকে।
জ্বালানি আমদানির এই ব্যয়বৃদ্ধির পেছনে কাজ করছে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি। বিশেষ করে ইরান ও ইসরায়েল-আমেরিকার মধ্যকার চলমান উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ চেইনকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে এলএনজি, কয়লা ও তেলের দামে।
মার্চ মাসের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, স্পট মার্কেট থেকে কেনা প্রতি ঘনমিটার এলএনজির আমদানিমূল্য দাঁড়িয়েছে ৯১.৩ টাকা। অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে গড় গ্যাসের দাম মাত্র ২৩.৮২ টাকা। এই বিশাল ব্যবধান মেটাতেই সরকারকে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৬৭.৫০ টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে (টার্মিনাল খরচ বাদে)। অর্থাৎ, বাংলাদেশ যত বেশি এলএনজি কিনছে, রাষ্ট্রের কোষাগার তত দ্রুত খালি হচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই অতিরিক্ত ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা এত দামি এলএনজি আমদানি করছি, কিন্তু বিদ্যুৎ সরবরাহে কি কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে? যদি বিদ্যুৎ না-ই পাওয়া যায়, তবে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের সার্থকতা কোথায়?”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বছরের পর বছর ধরে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করা হয়েছে। চাটক পূর্বের মতো অনেক পরিচিত গ্যাস ক্ষেত্র অবিকল অবস্থায় পড়ে আছে, অথচ সরকার আমদানিনির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকার বলেছিল দেশীয় অনুসন্ধান বাড়াবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বলেছিল, বর্তমান সরকারও বলছে—কিন্তু ফলাফল শূন্য। আমাদের বাজার এখন পুরোপুরি অস্থির আন্তর্জাতিক বাজারের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।”
অধ্যাপক আলম আরও মনে করিয়ে দেন যে, সাধারণ গ্রাহকরা প্রতি বছর এনার্জি ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকা জোগান দেন। এই ফান্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে গ্রাহকদের সাময়িক সুরক্ষা দেওয়া এবং দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো সুফলই সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না। বরং গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে।
আইইইএফএ-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের আরেকটি অন্ধকার দিক। বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘রিজার্ভ মার্জিন’ ছিল ৬১.৩ শতাংশ। অর্থাৎ, দেশের অধিকাংশ বিদ্যুৎ কেন্দ্র বসিয়ে রাখা হচ্ছে, কিন্তু চুক্তি অনুযায়ী তাদের বিশাল অঙ্কের ‘ক্যাপাসিটি পেমেন্ট’ বা ভাড়া দিতে হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বেসরকারি তেলচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও প্রতি ইউনিট (kWh) গড়ে ৯.৫ টাকা এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো ৫.৯ টাকা হারে ভাড়া পাচ্ছে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে ২০২০-২১ সালে যেখানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ছিল ৬.৬১ টাকা, ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২.১ টাকায়।
বিশ্ব যখন জীবাশ্ম জ্বালানি ছেড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে, বাংলাদেশ সেখানে অনেক পিছিয়ে। বৈশ্বিক গড় যেখানে ৩৩.৮ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান মাত্র ২.৩ শতাংশ। এই নগণ্য অবদানের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লা বা তেলের দাম বাড়লেই বাংলাদেশের পুরো বিদ্যুৎ খাত কেঁপে ওঠে।
আইইইএফএ-এর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের কাছ থেকে সংস্কারের জন্য যে চাপ রয়েছে, এই ভর্তুকির বোঝা সেই প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলবে। তিনি বলেন, “জ্বালানি আমদানির খরচ এভাবে বাড়তে থাকলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত কঠোর নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যার মধ্যে নতুন করে বিদ্যুত ও গ্যাসের দাম বাড়ানো অন্যতম।”
প্রতিবেদনে এই সংকট উত্তরণে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে:
১. দ্রুত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো।
২. ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানো।
৩. আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ আমদানির পরিধি বাড়ানো।
৪. ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ পরিকল্পনা যৌক্তিক করা এবং ভর্তুকির চাপ কমাতে অতিরিক্ত রিজার্ভ মার্জিন কমিয়ে আনা।
ভর্তুকির এই ১৩ হাজার কোটি টাকা আসলে জনগণের ট্যাক্সের টাকা। যদি দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে সময়মতো বিনিয়োগ করা হতো, তবে আজ আন্তর্জাতিক বাজারের ঝড়ে বাংলাদেশকে এভাবে দিশেহারা হতে হতো না। এখন প্রশ্ন হলো, সরকার কি আবারও জনগণের পকেট কেটে এই ঘাটতি পূরণ করবে, নাকি বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি রোধে সাহসী কোনো পদক্ষেপ নেবে?
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star) ও আইইইএফএ (IEEFA) প্রতিবেদন অনুসরণে।