শিরোনামঃ
ঠিক এক বছর পর দেশে আর কখনো আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদৎবার্ষিকী: ৭ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করল বিএনপি ‘নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর গালিতে আমরা অভ্যস্ত, এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য’: সিইসি আমদানি-রফতানি সচল রাখতে ঈদের ছুটিতেও খোলা থাকবে সব কাস্টম হাউস ও শুল্ক স্টেশন গোলাবারুদ নিয়ে ইসরায়েলে মার্কিন কার্গো বিমান, ইরানে ফের বড় হামলার প্রস্তুতি রুনা লায়লা ও বাপ্পা মজুমদারের নতুন গান ‘অনায়াসে’ প্রকাশিত: ভাসছে শ্রোতাদের প্রশংসায় নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতায় প্রধানমন্ত্রীকে সভাপতি করে জাতীয় সমন্বয় কমিটি গঠন ট্রাইব্যুনালে বাজানো হলো সালমান রহমান ও শেখ রেহানার ফোনালাপ: ‘এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না’ ৩ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড এডিপি অনুমোদন
মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ১২:০৮ অপরাহ্ন

এফডিআর ও সঞ্চয়পত্রের গণ্ডি পেরিয়ে ট্রেজারি বিল, বন্ড এবং সুকুকে সাধারণ মানুষের আগ্রহ বেড়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাছে সঞ্চয় মানেই একসময় ছিল ব্যাংকের স্থায়ী আমানত (এফডিআর) কিংবা ডাকঘর ও ব্যাংকে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্র। জীবনের জমানো পুঁজি নিরাপদ রাখতে এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে একটি নিশ্চিত মুনাফা পেতে যুগের পর যুগ ধরে এই দুটি খাতই ছিল বিনিয়োগকারীদের প্রধান ভরসা। কিন্তু সময় ও অর্থনীতির পালাবদলের সাথে সাথে মানুষের বিনিয়োগ চিন্তায়ও এখন বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের কঠোর সীমা ও কর কাঠামোর পরিবর্তন এবং শেয়ারবাজারের ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতার কারণে সাধারণ মানুষ এখন তাদের কষ্টার্জিত অর্থের জন্য নিরাপদ ও লাভজনক নতুন গন্তব্য খুঁজছেন। আর ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই দেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগের এক নতুন দিগন্ত হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে তুমুল জনপ্রিয়তা পাচ্ছে সরকারি সিকিউরিটিজ বা ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড এবং ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগপণ্য ‘সুকুক’। সরকারের প্রত্যক্ষ গ্যারান্টি, তুলনামূলক বেশি ও বাজারভিত্তিক মুনাফা এবং বিনিয়োগের নমনীয়তার কারণে এই খাতগুলো এখন শুধু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান পছন্দ হয়ে উঠেছে।


ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড আসলে কী?

সরকার যখন তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বা বড় বড় মেগা প্রকল্প ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ব্যয় নির্বাহের জন্য বাজার থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তখন তারা সাধারণ জনগণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মেয়াদের সরকারি ঋণপত্র ইস্যু করে। এই ঋণপত্রগুলোই মূলত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ড নামে পরিচিত। মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে এদের দুটি মূল ভাগে ভাগ করা হয়:

  • ট্রেজারি বিল (T-Bill): ট্রেজারি বিল হলো সরকারের স্বল্পমেয়াদি ঋণপত্র। সরকারের দৈনন্দিন বা স্বল্পমেয়াদি নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে এগুলো ইস্যু করা হয়। বাংলাদেশে সাধারণত তিন ধরনের মেয়াদের ট্রেজারি বিল রয়েছে— ৯১ দিন, ১৮২ দিন এবং ৩৬৪ দিন। এই বিলগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, এগুলো ডিসকাউন্ট বা বাট্টা মূল্যে বিক্রি করা হয় এবং মেয়াদ শেষে বিনিয়োগকারীকে ফেস ভ্যালু বা পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করা হয়। অর্থাৎ, একজন বিনিয়োগকারী ১০০ টাকার বিল হয়তো ৯৫ টাকায় কিনবেন এবং মেয়াদ শেষে সরকার তাকে পুরো ১০০ টাকা ফেরত দেবে। এই কেনা ও পাওয়ার মাঝখানের ৫ টাকাই হলো বিনিয়োগকারীর নিট মুনাফা। স্বল্প সময়ের জন্য যারা অলস টাকা নিরাপদে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের জন্য এটি একটি চমৎকার বিকল্প।

  • ট্রেজারি বন্ড (BGTB): অন্যদিকে, ট্রেজারি বন্ড বা বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট ট্রেজারি বন্ড (BGTB) হলো সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ঋণপত্র। এর মেয়াদ সাধারণত ২ বছর থেকে শুরু করে ৫, ১০, ১৫ এবং সর্বোচ্চ ২০ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি এই বিনিয়োগে বিনিয়োগকারীদের একটি নির্দিষ্ট হারে বা কুপন রেটে সুদ প্রদান করা হয়। ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা সাধারণত প্রতি ছয় মাস অন্তর তাদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এই সুদ বা মুনাফার টাকা পেয়ে যান। দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও নিশ্চিত আয়ের উৎস হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কারীদের জন্য ট্রেজারি বন্ড অত্যন্ত আকর্ষণীয় একটি খাত।


সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের অবারিত সুযোগ

দীর্ঘদিন ধরে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা ছিল যে, সরকারের ট্রেজারি বিল বা বন্ড শুধু বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিমা কোম্পানি বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোই কিনতে পারে। সাধারণ মানুষের জন্য এখানে প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি (এনআরবি), করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিমা কোম্পানি, ভবিষ্য তহবিল (প্রভিডেন্ট ফান্ড), এমনকি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারাও অত্যন্ত সহজে সরকারি এই বিল বা বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় বর্তমানে দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও আধুনিক, যুগোপযোগী এবং বাজারভিত্তিক করার লক্ষ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সরকারি এই ঋণপত্রে বিনিয়োগ করার জন্য কোটি টাকার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে ন্যূনতম মাত্র ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেই একজন সাধারণ নাগরিক সরকারি ট্রেজারি বিল বা বন্ড কিনতে পারেন, যা এই খাতকে মধ্যবিত্তের নাগালে নিয়ে এসেছে।


বিনিয়োগ করবেন কীভাবে?

ট্রেজারি বিল বা বন্ডে বিনিয়োগের প্রক্রিয়া এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা হয়েছে। এখানে বিনিয়োগ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকে সরাসরি যাওয়ার প্রয়োজন নেই। যেকোনো বাণিজ্যিক ব্যাংকের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা একটি নির্দিষ্ট হিসাব খুলতে পারেন, যাকে বলা হয় ‘বিজনেস পার্টনার আইডেন্টিফিকেশন’ বা BP ID (বিপি আইডি)।

একটি বিপি আইডি খোলার জন্য অত্যন্ত সাধারণ কিছু কাগজপত্রের প্রয়োজন হয়, যা প্রায় প্রতিটি নাগরিকের কাছেই থাকে:

  • জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) কপি

  • করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) সনদ

  • আবেদনকারীর পাসপোর্ট সাইজের রঙিন ছবি

  • সচল ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য

  • নমিনির জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি

বিপি আইডি খোলা হয়ে গেলে একজন বিনিয়োগকারী চাইলে প্রাইমারি মার্কেটে (বাংলাদেশ ব্যাংকের নিলামে) সরাসরি অংশ নিয়ে বিল-বন্ড কিনতে পারেন অথবা সেকেন্ডারি মার্কেট থেকে যেকোনো সময় বাজারদরে এই সিকিউরিটিজগুলো কিনে নিতে পারেন।


বাজারের কাঠামো ও প্রাইমারি ডিলার (পিডি) ব্যাংক

সরকার যখন নতুন ট্রেজারি বিল বা বন্ড ইস্যু করে, তখন তা সরাসরি বাজারে আসে না। বাংলাদেশ ব্যাংক সরকারের পক্ষে একটি নিলামের আয়োজন করে। এই নিলামে শুধুমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমোদিত ‘প্রাইমারি ডিলার’ (PD) ব্যাংকগুলো অংশগ্রহণ করতে পারে।

এই পিডি ব্যাংকগুলো প্রথমে সরকারের কাছ থেকে নিলামের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণে বিল ও বন্ড কিনে নেয়। এরপর তারা সেই কেনা সিকিউরিটিজগুলো তাদের নিজস্ব গ্রাহক বা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে। বিনিয়োগকারীরা চাইলে মেয়াদপূর্তির আগেও সেকেন্ডারি মার্কেটের মাধ্যমে এই বন্ডগুলো অন্য বিনিয়োগকারীর কাছে বিক্রি করে নগদ টাকা তুলে নিতে পারেন।

বর্তমানে দেশের বন্ড বাজারকে আরও গতিশীল করতে সোনালী ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের মতো বড় বড় ব্যাংকগুলো সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সম্প্রতি সরকার এই বাজারে প্রতিযোগিতা ও তারল্য বাড়ানোর লক্ষ্যে নতুন করে ব্র্যাক ব্যাংক ও পূবালী ব্যাংককেও প্রাইমারি ডিলার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে। এর ফলে দেশে বর্তমানে পিডি ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬টিতে। ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রেফাত উল্লাহ খানের মতে, পিডি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ফলে তারা এখন সরকারি বন্ডবাজারে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ বাড়াতে আরও কার্যকর ও সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারবেন।


সুদের হার: ব্যাংকের চেয়ে কতটা লাভজনক?

সাধারণ মানুষের ট্রেজারি বিল ও বন্ডমুখী হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর আকর্ষণীয় মুনাফা বা সুদের হার। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকের সাধারণ আমানত বা এফডিআরের সুদের হার অনেক ক্ষেত্রেই বিনিয়োগকারীদের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। সেই তুলনায় সরকারি সিকিউরিটিজে সুদের হার বেশ প্রতিযোগিতামূলক এবং বাজারমুখী।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য (২৯ এপ্রিল) অনুযায়ী, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদের হার রীতিমতো চমকপ্রদ:

  • ৯১ দিন মেয়াদের ট্রেজারি বিলে সুদের হার ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ।

  • ১৮২ দিন মেয়াদের ট্রেজারি বিলে সুদের হার ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

  • ৩৬৪ দিন বা এক বছর মেয়াদের ট্রেজারি বিলে সুদের হার ১০ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি আকর্ষণীয়:

  • দুই থেকে তিন বছর মেয়াদের বন্ডে মুনাফা মিলছে ১০ দশমিক ২ থেকে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত।

  • পাঁচ বছর মেয়াদের বন্ডে সুদের হার ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

  • দশ বছর মেয়াদের বন্ডে মুনাফার হার ১০ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

  • পনেরো বছর মেয়াদের দীর্ঘমেয়াদি বন্ডে সুদের হার ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ।

  • এবং বিশ বছর মেয়াদের সর্বোচ্চ দীর্ঘ বন্ডে সুদের হার দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের মতে, বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে যেখানে শেয়ারবাজার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং ব্যাংকে টাকা রাখলে প্রকৃত মুনাফা কমে যাওয়ার শঙ্কা থাকে, সেখানে ডাবল ডিজিটের এই নিশ্চিত মুনাফা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি দারুণ আর্থিক রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে।


তারল্য সুবিধা: মেয়াদপূর্তির আগেও বিক্রির স্বাধীনতা

সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংকের অনেক মেয়াদি আমানতের একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টাকা তুললে মুনাফার একটি বড় অংশ কাটা যায় বা জরিমানা দিতে হয়। কিন্তু ট্রেজারি বিল এবং বন্ডের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা এক অনন্য তারল্য সুবিধা ভোগ করেন।

বিনিয়োগকারীর যদি হঠাৎ নগদ টাকার প্রয়োজন হয়, তবে তিনি মেয়াদ শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা না করেই সেকেন্ডারি মার্কেটে তার কেনা বিল বা বন্ড বিক্রি করে দিতে পারেন। সংশ্লিষ্ট পিডি ব্যাংকের মাধ্যমে সেই দিনের বাজারদরের (Market Yield) ভিত্তিতে সহজেই এটি নগদায়ন করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা স্বল্পমেয়াদে নিজেদের নগদ টাকার প্রবাহ ঠিক রাখতে চান, তাদের জন্য ট্রেজারি বিল একটি আদর্শ হাতিয়ার। অন্যদিকে, যারা ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও নিয়মিত আয়ের কথা ভাবেন, তাদের জন্য ট্রেজারি বন্ড সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম।


সুকুক: শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগের নতুন দুয়ার

দেশের একটি বিশাল সংখ্যক মানুষ ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে প্রচলিত সুদভিত্তিক ব্যাংকিং বা বন্ডে বিনিয়োগ করতে চান না। তাদের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে সরকার সরকারি সিকিউরিটিজের পাশাপাশি ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগপণ্য ‘সুকুক’ চালু করেছে। সুকুক মূলত এমন একটি আর্থিক সনদ বা সার্টিফিকেট, যা কোনো নির্দিষ্ট সম্পদের ওপর বিনিয়োগকারীর আংশিক মালিকানা নির্দেশ করে। এখান থেকে প্রাপ্ত মুনাফা হালাল হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় সাধারণ ও ধার্মিক বিনিয়োগকারীদের কাছে এটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি সাধারণ মানুষের জন্য সুকুকে বিনিয়োগের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজলভ্য করে নতুন একটি যুগান্তকারী নির্দেশনা জারি করেছে। এখন থেকে যেকোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজে ‘সুকুক ইনভেস্টর আইডি’ খোলা সম্ভব।

সুকুকে বিনিয়োগের খরচ ও নিয়মাবলী:

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য সুকুক আইডি খোলা, নিলামে অংশগ্রহণ করা এবং বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সর্বোচ্চ মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ২০০ টাকা। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এই মাশুল সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা। এছাড়া সেকেন্ডারি মার্কেটে এটি কেনাবেচা করার ক্ষেত্রে প্রতি লেনদেনে মাত্র ১০০ টাকা ফি দিতে হবে। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো—মুনাফার টাকা গ্রহণ, আসল টাকা ফেরত নেওয়া, হোল্ডিং রিপোর্ট সংগ্রহ করা কিংবা সুকুক আইডি বন্ধ করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীকে কোনো ধরনের বাড়তি মাশুল বা ফি প্রদান করতে হবে না।

কী কী লাগে সুকুক আইডি খুলতে?

ট্রেজারি বন্ডের মতোই এখানেও খুব সাধারণ কিছু নথিপত্র প্রয়োজন:

  • নির্ধারিত আবেদন ফরম

  • ব্যাংক হিসাবের সঠিক তথ্য

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) বা পাসপোর্টের কপি

  • রঙিন ছবি ও টিআইএন (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)

  • নমিনির বিস্তারিত তথ্য ও ছবি

প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু নথিপত্র যেমন—নিবন্ধন সনদ, বোর্ড রেজোল্যুশন, মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সম্পূর্ণ শরিয়াহ সিকিউরিটি মডিউলের মাধ্যমে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে এই হিসাবগুলো পরিচালিত হবে।


আগামীর সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা

বাংলাদেশের বন্ড মার্কেট দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে ছিল। কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই খাতের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটছে। বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংক খাতের কিছু ক্ষেত্রে আস্থার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ পরিবেশ সাধারণ মানুষকে একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল আয়ের উৎসের দিকে ধাবিত করছে।

সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বর্তমানে জাতীয় পরিচয়পত্রের বাধ্যবাধকতা, টিআইএন রিটার্ন জমার রসিদ এবং ৫ লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগে অতিরিক্ত কর আরোপের ফলে অনেকেই এই খাত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। আবার ব্যাংকের এফডিআরের সুদহার অনেক সময়ই মূল্যস্ফীতির হারকে ছাড়িয়ে যেতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই দ্বিমুখী সংকটের মাঝখানে সরকারি ট্রেজারি বিল, ট্রেজারি বন্ড ও সুকুক সাধারণ মানুষের জন্য একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস হয়ে এসেছে। এখানে বিনিয়োগে মূলধন হারানোর কোনো শঙ্কা নেই, কারণ এর পেছনে রয়েছে স্বয়ং সার্বভৌম রাষ্ট্রের গ্যারান্টি।

সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, সাধারণ মানুষের এই অংশগ্রহণ দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে। সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার চাপ কমিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারলে তা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বাজারব্যবস্থাকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত করতে হবে। বিনিয়োগকারীরা যেন ঘরে বসেই মোবাইল অ্যাপ বা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজেই ট্রেজারি বিল ও বন্ড কিনতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই বিনিয়োগপণ্যগুলো নিয়ে দেশব্যাপী আরও ব্যাপক সচেতনতা ও প্রচার-প্রচারণা চালানো গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বন্ডবাজার বৈশ্বিক মানের একটি বৃহৎ ও গভীর পুঁজিবাজারে পরিণত হবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করবে।

 

সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন


এ জাতীয় আরো খবর...