২০১০ সালে ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গর্বভরে একটি কথা বলেছিলেন, “আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটা ভারত সারাজীবন মনে রাখবে।” সেদিনের সেই মন্তব্যের মধ্যে কোনো রাখঢাক ছিল না; বরং তা ছিল নিজেদের দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ উজাড় করে দিয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে তুষ্ট করার এক নির্লজ্জ স্বীকারোক্তি। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসনামলে এই উক্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকর বাস্তবতা আজ দেশের মানুষের সামনে পুরোপুরি উন্মোচিত হতে শুরু করেছে। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের সেই কুখ্যাত মন্তব্য— “আমি ভারতকে গিয়ে বলেছি শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে”, কিংবা ওবায়দুল কাদেরের মুখে শোনা “ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রক্তের রাখি বন্ধনে আবদ্ধ বা হিমালয়ের চেয়েও উঁচু”—এই কথাগুলো কেবল রাজনৈতিক স্তুতি বা কথার কথা ছিল না। জনগণের ম্যান্ডেটহীন একটি সরকার ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখার অন্ধ মোহে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব, অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে ভারতের হাতে কীভাবে সস্তায় বিকিয়ে দিয়েছিল, এটি তারই সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণ।
গত ১৬ বছরে ‘উন্নয়ন’ এবং ‘দ্বিপক্ষীয় অটুট বন্ধুত্বের’ চটকদার স্লোগানের আড়ালে ভারতের সঙ্গে একের পর এক এমন সব অসম চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই করা হয়েছে, যা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত ফাঁদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই চুক্তিগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ কেবল দুই হাত ভরে দিয়েই গেছে, বিনিময়ে নিজেদের ন্যায্য পাওনাটুকুও টেবিল থেকে আদায় করতে পারেনি।
অর্থনীতির কফিনে পেরেক: আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি
অসম চুক্তির সবচেয়ে বড়, দৃশ্যমান এবং ভয়ংকর উদাহরণ হলো ২০১৭ সালে ভারতের আদানি গ্রুপের সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং একটি স্বাধীন দেশের অর্থনীতিকে ভিনদেশি একটি করপোরেট আগ্রাসনের হাতে তুলে দেওয়ার আইনি দলিল। চুক্তিটির শর্তগুলো এতটাই একপাক্ষিক, অস্বচ্ছ ও বৈষম্যমূলক যে, বাংলাদেশ আদানির ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ব্যবহার করুক বা না করুক, প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকা কেবল ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ হিসেবে তাদের দিয়ে যেতে হবে।
কয়লার দাম নির্ধারণেও এই চুক্তিতে চরম শুভংকরের ফাঁকি রয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দামে কয়লার মূল্য হিসাব করে বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। বর্তমানে দেশে যখন তীব্র ডলার সংকট চলছে, তখন আদানির এই বিপুল পরিমাণ পাওনা মেটাতে গিয়ে দেশের অর্থনীতি রীতিমতো খাদের কিনারে এসে দাঁড়িয়েছে। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত ধীরে ধীরে পুরোপুরি ভারতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অলস বসিয়ে রেখে আদানির পকেট ভারী করার এই ভ্রান্ত নীতির মাসুল আজ গুনতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে, যাদের ক্রমাগত চড়া দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। ক্ষমতা ছাড়ার আগে পতিত সরকার দেশকে এমনভাবে ঋণের ও শর্তের বেড়াজালে আটকে দিয়ে গেছে, যেন বাংলাদেশ আর কখনোই অর্থনৈতিকভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।
ট্রানজিট ও কানেক্টিভিটির নামে কৌশলগত আধিপত্য সমর্পণ
‘কানেক্টিভিটি’ বা আঞ্চলিক সংযোগের সুন্দর মোড়কে বাংলাদেশ মূলত ভারতের কাছে তার ভৌগোলিক সুবিধার (Geographic leverage) পুরোটাই সমর্পণ করেছে। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে তাদের দুর্গম উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে (সেভেন সিস্টার্স) পণ্য পরিবহন শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ দিয়ে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এই সমস্যা সমাধানে ভারত যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ট্রানজিট চেয়ে আসছিল। মিরসরাই ইকোনমিক জোন এবং ত্রিপুরার সাবরুমের সঙ্গে ফেনী নদীর ওপর নির্মিত ‘মৈত্রী সেতু’ আপাতদৃষ্টিতে একটি উন্নয়ন প্রকল্প মনে হলেও, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এর আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়ংকর এক ব্লু-প্রিন্ট। এই প্রকল্পগুলো যদি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হতো, তবে দীর্ঘমেয়াদে পুরো চট্টগ্রাম বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বা কৌশলগত আধিপত্য কার্যত ভারতের হাতে চলে যেত।
এমনকি বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থে ও ভূখণ্ডে নির্মিত পায়রা বন্দরকে এমনভাবে ভারতের ট্রানজিট বা কানেক্টিভিটি নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করার নীল নকশা করা হয়েছিল, যাতে বঙ্গোপসাগরের এই অতি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টটিতেও ভারতের একচেটিয়া আধিপত্য বজায় থাকে। ২০২৩-২৪ সালের দিকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার এবং সর্বশেষ রেল ট্রানজিটের যে চুক্তিগুলো হয়েছে, তার খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করলে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয়। ভারতের পণ্য চলাচলের জন্য বাংলাদেশ নামমাত্র কিছু ফি বা মাশুল নির্ধারণ করেছে। এই সামান্য অর্থে আমাদের রাস্তাঘাট বা রেললাইনের ন্যূনতম রক্ষণাবেক্ষণ খরচও ওঠে না।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, বাংলাদেশ যখন নিজের বুক চিরে ভারতকে এক অংশ থেকে অন্য অংশে পণ্য নিতে অবাধ সুবিধা দিল, তখন ভারতের ওপর দিয়ে নেপাল বা ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি বাণিজ্যের জন্য কোনো কার্যকর ট্রানজিট সুবিধা আদায় করতে পারেনি। এটি কোনো কূটনৈতিক ব্যর্থতা নয়, বরং ক্ষমতার স্বার্থে জাতীয় স্বার্থকে চরমভাবে বিকিয়ে দেওয়ার এক পরিকল্পিত দাসত্ব ছিল।
নিজস্ব বাণিজ্যে স্থবিরতা ও অবকাঠামোর বিনাশ
ট্রানজিটের নামে ভারতের কোটি কোটি টাকার পরিবহন ব্যয় কমানো হলেও উল্টো দিকে ধ্বংস হচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব অবকাঠামো। আমাদের আমদানিকারকদের পণ্য খালাস করতে যেখানে বন্দরগুলোর সক্ষমতার অভাবে জাহাজের জট লেগে থাকে এবং দিনের পর দিন সাগরে বা বন্দরে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়, সেখানে ভারতীয় ট্রানজিট পণ্যগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে খালাস ও পরিবহন করার সুবিধা পাচ্ছে। এর ফলে আমাদের নিজস্ব বাণিজ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় প্রতিনিয়ত পিছিয়ে পড়ছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। ভারত নামমাত্র খরচে বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করছে, আর সেই ভারী যানবাহনের চাপে নষ্ট হওয়া সড়কের মেরামতের বিপুল আর্থিক ভার বইতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাধারণ করদাতাদের। নিজেদের ক্ষতি করে প্রতিবেশীকে এমন সুবিধা দেওয়ার নজির বিশ্বে বিরল।
পানি কূটনীতিতে চরম ব্যর্থতা ও নতজানু নীতি
পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিগত সরকারের নতজানু নীতির চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার জন্য বাংলাদেশ যুগের পর যুগ ধরে অপেক্ষা করছে। ভারত বারবার রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিয়েও শুষ্ক মৌসুমে এক ফোঁটা পানিও দেয়নি, উল্টো বর্ষায় বাঁধ খুলে দিয়ে ভাসিয়েছে দেশের উত্তরাঞ্চলকে। অথচ মানবিকতার দোহাই দিয়ে ২০১৯ সালে ত্রিপুরার সাবরুম শহরের জন্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ফেনী নদী থেকে পানি প্রত্যাহারের চুক্তি ঠিকই সই করে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, অভিন্ন নদীর পানির অধিকার সবার থাকলেও, ভারতের একতরফা পানি আগ্রাসন এবং সীমান্তে ফেলানীর মতো অসংখ্য বাংলাদেশিকে পাখির মতো গুলি করে হত্যার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করার সাহস দেখায়নি বিগত সরকার।
ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি ও জাতীয় নিরাপত্তার চরম হুমকি
ভবিষ্যতের দিনগুলোতে এই অসম চুক্তিগুলো বাংলাদেশের জন্য কী ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা গভীরভাবে ভাবলে আতঙ্কিত হতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় যখন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে এবং পরাশক্তিগুলোর নজর এই অঞ্চলের দিকে, তখন ভারতের হাতে অবাধ ট্রানজিট সুবিধা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে।
যেকোনো আঞ্চলিক যুদ্ধ বা উত্তেজনার সময় (যেমন: চীন-ভারত দ্বন্দ্ব), যদি ভারত আমাদের রেলপথ, নৌপথ বা সড়ক ব্যবহার করে সংবেদনশীল সামরিক সরঞ্জাম বা সৈন্য পরিবহন করে, তবে অবধারিতভাবেই বাংলাদেশ অন্য কোনো আঞ্চলিক পরাশক্তির বিষনজরে পড়বে এবং হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারে। একটি স্বাধীন দেশ কখনোই ভিনদেশি সামরিক বা কৌশলগত পরিবহনের রুট হতে পারে না, অথচ কানেক্টিভিটির নামে প্রকারন্তরে সেই রাস্তাই প্রশস্ত করা হয়েছে।
প্রপাগান্ডা ও বর্তমান বাস্তবতা
অত্যন্ত হাস্যকর এবং হতাশাজনক ব্যাপার হলো, ৫ আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে ভারত এবং তাদের এদেশীয় দোসর বা পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা এখন নতুন করে নানা প্রপাগান্ডা শুরু করেছে। তারা এখন বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার বা অন্য কোনো দেশের যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি বা সম্পর্ক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখছে এবং তীব্র সমালোচনা করছে। সেন্টমার্টিন লিজ দেওয়ার কাল্পনিক তত্ত্ব দাঁড় করিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের চেষ্টা করছে।
আজ যারা আমেরিকার সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে গলা ফাটাচ্ছেন এবং জাতীয়তাবাদীর মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছেন, তাদের উদ্দেশে দেশের সাধারণ মানুষের একটি কথাই বলার আছে—গত ১৬ বছরে আপনারা যখন বিনা শর্তে ভারতের হাতে আমাদের বুক চিরে ট্রানজিট দিয়েছেন, নামমাত্র ভাড়ায় বন্দর তুলে দিয়েছেন এবং আদানি চুক্তির মাধ্যমে দেশকে দেউলিয়া করেছেন, তখন আপনাদের সেই তথাকথিত দেশপ্রেম কোথায় লুকিয়ে ছিল? বিগত সরকারের করা এই চুক্তিগুলো অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্ধ মোহে দেশের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব ও সার্বভৌমত্বকে কতটা সস্তায় বিকিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও করণীয়
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশ এখন আর কারও ‘প্রক্সি স্টেট’ বা করদ রাজ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে রাজি নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এখন আর কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেশীর প্রতি নতজানু বা একপাক্ষিক থাকার সুযোগ নেই। এখনকার নীতি হতে হবে একটি স্বাধীন, বহুমুখী এবং শক্তিসাম্যপূর্ণ (Balanced) পররাষ্ট্রনীতি, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থই হবে সর্বোচ্চ ও একমাত্র অগ্রাধিকার।
দেশ কখনো শুধু মানচিত্র আর পতাকা দিয়ে স্বাধীন হয় না, দেশ পরাধীন হয় অসম ও গোলামির চুক্তির হাত ধরে। তাই অবিলম্বে ভারতের সঙ্গে বিগত সরকারের আমলে করা ট্রানজিট, বিদ্যুৎ, বন্দর ব্যবহার এবং পানি বণ্টন সংক্রান্ত প্রতিটি চুক্তির প্রতিটি ধারা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। যেসব চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার পরিপন্থী, সেগুলো বাতিল বা যৌক্তিকভাবে সংশোধন করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিসরে আইনি ও কূটনৈতিক দরকষাকষি শুরু করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। সার্বভৌমত্ব রক্ষার এই লড়াইয়ে পিছপা হওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই, অন্যথায় ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না।