মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহল ও প্রত্যাশা ছিল। বিশেষ করে তার সফরসঙ্গী হিসেবে যখন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি, কৃষি, বিমান চলাচল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের একটি বিশাল ও প্রভাবশালী প্রতিনিধিদল বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখেন, তখন বিশ্ববাসী ধারণা করেছিল যে বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতির মধ্যে হয়তো ঐতিহাসিক কোনো বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা চিত্রিত করেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্যপট। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বেইজিংয়ে চূড়ান্ত দফার বৈঠক শেষে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাবি করেছেন যে, তিনি ‘অসাধারণ সব বাণিজ্য চুক্তি করেছেন, যা দুই দেশের জন্যই দারুণ লাভজনক হবে।’ এমনকি তিনি এই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক’ বলেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অর্থনীতি বিশ্লেষকদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এই সম্মেলনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কোনো বাস্তব ও সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়ে বরং উষ্ণ বাক্যবিনিময়, জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা এবং বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যের মাঝেই বেশি সীমাবদ্ধ ছিল। প্রথম দিনের জমকালো আয়োজন এবং অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনার আবহের পরও কোনো বড় ধরনের বাণিজ্যিক অগ্রগতি বা যুগান্তকারী ব্যবসায়িক চুক্তির ঘোষণা এই বহু প্রতীক্ষিত সফর থেকে আসেনি।
গত বৃহস্পতিবার গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং দুই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকটিকে ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেছে। নিজের চিরচেনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই বৈঠককে ‘সম্ভবত সর্বকালের সবচেয়ে বড় সম্মেলন’ বলে দাবি করে এর গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও এর আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত বাণিজ্য আলোচনায় যে ‘অগ্রগতি’ সাধিত হয়েছিল, তার সূত্র ধরে একটি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। এতসব ইতিবাচক আলোচনা এবং শীর্ষ নির্বাহীদের উপস্থিতির পরও কোনো কাঠামোগত সমঝোতা বা বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি সই না হওয়াটা অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের দারুণভাবে হতাশ করেছে। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২০০টি বোয়িং বিমান কিনতে সম্মত হয়েছে। প্রায় এক দশক পর চীন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বাণিজ্যিক বিমান কেনার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিছক মার্কিন বিমান চলাচল শিল্পের জন্য একটি বড় খবর হিসেবেই বিবেচিত হতে পারত। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকরা এই ঘোষণায় মোটেও সন্তুষ্ট হতে পারেননি। দীর্ঘ দশ বছরের স্থবিরতার পর চীনের মতো একটি বিশাল ও ক্রমবর্ধমান বাজারের কাছ থেকে তারা আরও অনেক বড় আকারের অর্ডারের প্রত্যাশা করেছিলেন। তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় ট্রাম্পের এই ঘোষণার পরপরই ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং বিশ্বখ্যাত বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ৪ শতাংশেরও বেশি কমে যায়। প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এই বিশাল ফারাক স্পষ্টভাবেই প্রমাণ করে যে, বড় চুক্তির যে আশা নিয়ে এই সফর আয়োজিত হয়েছিল, তা দৃশ্যত ব্যর্থ হয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির এই শূন্যতার পাশাপাশি বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে চলমান ‘বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি’ বা ট্রেড ট্রুসের ভবিষ্যৎ নিয়েও এক ধরনের গভীর ধোঁয়াশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। গত অক্টোবরে দুই পরাশক্তির মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তার আওতায় ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এর বিপরীতে সদিচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ বেইজিংও তাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করেছিল। কিন্তু এই যুদ্ধবিরতি দীর্ঘমেয়াদে কতটা টিকবে বা আদৌ টিকবে কি না, তা নিয়ে এখনো বড় ধরনের প্রশ্ন রয়েছে। ট্রাম্পের অন্যতম সফরসঙ্গী এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার শুক্রবার ব্লুমবার্গ টিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, আগামী নভেম্বরের পর এই বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হবে কি না, সে বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সুর বজায় রেখে জানানো হয়েছে যে, নতুন করে শুল্ক সংক্রান্ত জটিল ও তিক্ত আলোচনায় না গিয়ে সামগ্রিক বাণিজ্য সম্পর্ক সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে দুই নেতা একটি ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠনে সম্মত হয়েছেন। ওয়াশিংটনের পক্ষে বাণিজ্য আলোচনায় নেতৃত্ব প্রদানকারী যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আশা প্রকাশ করেছেন যে, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগে সহায়তার জন্য একটি নতুন ‘মেকানিজম’ বা প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল তৈরির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হবে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, এই কাঠামোগুলো পুরোপুরি চালু হওয়ার আগে এখনো অনেক কাঠখড় পোড়াতে হবে এবং বিস্তর আলোচনা বাকি রয়েছে।
এবারের চীন সফরে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে, তা হলো প্রযুক্তির ওপর একচ্ছত্র গুরুত্ব প্রদান। এটা এখন আর কারও অজানা নয় যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে সবচেয়ে বড় স্নায়ুযুদ্ধ ও বিভেদের জায়গাটি হচ্ছে এই প্রযুক্তি খাত। মূলত বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এই হাই-প্রোফাইল সফরে পিট হেগসেথ, মার্কো রুবিও এবং জেমিসন গ্রিয়ারের মতো জ্যেষ্ঠ মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের পেছনে ফেলে সবার আগে বিমান থেকে নামতে দেখা যায় টেসলা এবং স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ককে। শুধু বিমান থেকে নামার সময়ই নয়, স্বাগত অনুষ্ঠানেও মাস্ক এবং বিশ্বখ্যাত এআই চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খুব কাছাকাছি অবস্থানে ছিলেন। এই অভূতপূর্ব দৃশ্যপট স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র-চীন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কে বৈদ্যুতিক গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টর শিল্প ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। এই দুই প্রযুক্তি জায়ান্ট কোম্পানির ব্যবসাই চীনের বিশাল বাজারের সঙ্গে অত্যন্ত গভীরভাবে যুক্ত। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা তাদের সাংহাই গিগাফ্যাক্টরি এবং বিশাল সংখ্যক চীনা ক্রেতাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাপী চলমান এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তীব্র প্রতিযোগিতার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এনভিডিয়া। জেনসেন হুয়াংয়ের এই সফরে উপস্থিতি বিশেষভাবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে, কারণ মার্কিন মূল প্রতিনিধিদলের তালিকায় প্রাথমিকভাবে তার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, এআই এবং অত্যাধুনিক চিপের বিষয়টি এই শীর্ষ আলোচনায় পূর্বধারণার চেয়েও অনেক বেশি মাত্রায় গুরুত্ব পেয়েছে, যদিও প্রথম দিনের আলোচনার আনুষ্ঠানিক সারসংক্ষেপে এর কোনো সরাসরি উল্লেখ ছিল না। উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এবং চিপ তৈরির সরঞ্জামের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত কড়াকড়ি ও নিয়ন্ত্রিত রপ্তানি নীতি এখনো বহাল রয়েছে। মূলত এআইয়ের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতেই ওয়াশিংটন এই কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অবাধ সুযোগ পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিয়ে আসছে এবং একই সঙ্গে তারা তাদের দেশীয় শিল্প বিকাশে বাধা সৃষ্টির এই মার্কিন প্রচেষ্টার তীব্র মাত্রায় সমালোচনাও করছে। তবে গ্রিয়ারের মতে, এবারের আলোচনায় এটি কোনো প্রধান বা উত্তপ্ত বিষয় ছিল না। ট্রেজারি সেক্রেটারি বেসেন্ট অবশ্য জানিয়েছেন, সম্মেলনে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা এআইয়ের বিভিন্ন নিয়মকানুন এবং ভবিষ্যৎ পরিচালনা নীতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জোর দিয়ে বলেন, এআইয়ের ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আধিপত্য বজায় রাখাটা ওয়াশিংটনের জন্য ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ এবং এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এর মধ্যেই ট্রাম্প ফক্স নিউজকে একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে জানিয়েছেন যে, তার সঙ্গে আসা শীর্ষ নির্বাহীদের কোম্পানিতে চীন শত শত বিলিয়ন ডলার বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। তবে এই বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ কবে, কীভাবে এবং কোন রূপরেখার অধীনে আসবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত আলোচনার বাইরে এই বহুল আলোচিত সম্মেলনে সবচেয়ে বড় যে কাঠামোগত পরিবর্তনটি লক্ষ্য করা গেছে, তা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেইজিং এখন তাইওয়ান ইস্যুকে সরাসরি ও শর্তহীনভাবে যুক্ত করছে। গত এক বছরের বিভিন্ন স্তরের বাণিজ্য আলোচনায় তাইওয়ানকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার অনেকগুলো বিরোধপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে একটি সাধারণ ইস্যু হিসেবেই দেখা হতো। বিশেষ করে তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান সরাসরি শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক এবং তাইপেকে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র বিক্রির মতো বিষয়গুলোর জন্যই এই বিরোধ এতটা জোরালোভাবে বজায় ছিল। কিন্তু এবারের বেইজিং বৈঠক থেকে চীনের দেওয়া বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং কঠোর। তারা যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ানকে একটি প্রধান ও অলঙ্ঘনীয় শর্ত হিসেবে দাঁড় করাচ্ছে। বেইজিংয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং বলেছেন, ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার’ ভিত্তিতে দুই পক্ষ সম্পর্কের একটি ‘নতুন অবস্থান’ তৈরিতে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেছেন যে, তাইওয়ান এখনো দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর এবং অবিচ্ছেদ্য ইস্যু। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শি জিনপিং এই আলোচনায় অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় মার্কিন প্রশাসনকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাইওয়ান প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এ পরিস্থিতি ঠিকমতো সামলাতে না পারলে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ, এমনকি ভয়াবহ যুদ্ধও হতে পারে।’ শি জিনপিংয়ের এই কড়া সতর্কবার্তা এই প্রমাণই দেয় যে, তাইওয়ান প্রশ্নে চীন তাদের অখণ্ডতার নীতিতে কোনো ধরনের ছাড় দিতে বিন্দুমাত্র রাজি নয় এবং ভবিষ্যতে যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে এটি একটি বড় নির্ধারক হয়ে দাঁড়াতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং তাইওয়ান ইস্যুর পাশাপাশি এই শীর্ষ আলোচনায় বিশ্ব রাজনীতির অন্যান্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষ করে সংঘাতময় মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং ইরান ইস্যুও উল্লেখযোগ্যভাবে স্থান পেয়েছে। ট্রাম্প এই দীর্ঘ আলোচনায় ইরান সংঘাত কমানো এবং বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়ে বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে চীনের সক্রিয় সহযোগিতাও প্রত্যাশা করেছিলেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি (শি জিনপিং) হরমুজ প্রণালি খোলা দেখতে চান এবং বলেছেন, “আমি যদি কোনোভাবে সাহায্য করতে পারি, তবে আমি সাহায্য করতে চাই।”’ শুক্রবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মানবিক বিপর্যয়ের দিকে ইঙ্গিত করে ‘সর্বাত্মক এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতির’ আহ্বান জানিয়েছে। ওই বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তীব্র আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিশ্ববাণিজ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো যত দ্রুত সম্ভব আবার খুলে দেওয়া উচিত।’ ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন, বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লাইফলাইন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের অবাধ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে চীন চাইলে কৌশলগত মিত্র হিসেবে ইরানের ওপর তাদের শক্তিশালী প্রভাব অনায়াসেই খাটাতে পারে। চীনের দেওয়া তথ্যেও মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে দুই নেতার গভীর আলোচনার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো সিদ্ধান্ত বা শান্তি প্রতিষ্ঠার রূপরেখা গণমাধ্যমকে জানানো হয়নি।
সামগ্রিকভাবে, দৃশ্যমান কোনো চুক্তিবিহীন এই চীন সফরকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মহলের অনেকেই একটি বড় চুক্তির প্রাথমিক প্রস্তুতি পর্ব হিসেবে দেখছেন। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সম্মানে আয়োজিত জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক অভাবনীয় কূটনৈতিক চাল চেলে শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে ফিরতি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল এখন সেই কাঙ্ক্ষিত সফরের দিকেই গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। বিশ্লেষকরা দৃঢ়ভাবে আশা করছেন, সেই শীর্ষ সম্মেলনের আগে দুই পক্ষের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে পর্দার আড়ালে আরও অনেক নিবিড় ও চুলচেরা আলোচনা হবে। আর সেই ধারাবাহিক ও দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমেই হয়তো বিশ্বের দুই বৃহত্তম ও প্রভাবশালী অর্থনীতি আগামী সেপ্টেম্বরে এমন কোনো বৃহৎ, কাঠামোগত এবং কার্যকর চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, যা এবারের বেইজিং সফরে নানা কারণে সম্ভব হয়ে ওঠেনি।