যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা। যুদ্ধের ময়দানে ইরানের সামরিক শক্তি আসলে কতটুকু চূর্ণ হয়েছে বা তারা কতটা টিকে আছে, তা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তৈরি হয়েছে চরম ধোঁয়াশা। একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার প্রশাসন জোর গলায় দাবি করছেন যে, মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ হামলায় ইরানের সামরিক শক্তি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব গোপন গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাসী দাবির সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্যের এই বিশাল ও প্রকাশ্য গরমিল মার্কিন প্রশাসনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।
ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই দেশবাসীর কাছে এই বয়ান প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করে আসছে যে, গত এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার আগেই মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণে ইরানের সামরিক অবকাঠামো মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ট্রাম্প অত্যন্ত গর্বের সঙ্গে জাতিকে উদ্দেশ করে এক ভাষণে বলেছিলেন, “তাদের (ইরানের) আছড়ে পড়ার মতো ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। তাদের অস্ত্রের কারখানা ও রকেট লঞ্চারগুলো একেবারে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। খুব অল্পই অবশিষ্ট আছে। যুদ্ধের ইতিহাসে কোনো শত্রু মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এত স্পষ্ট এবং বিধ্বংসী বড় মাপের ক্ষতির শিকার হয়নি। আমাদের শত্রুরা হারছে।”
তবে, বাস্তব পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই বর্ণনার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন সম্প্রতি একটি গোপন গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ইরান তাদের ড্রোন সক্ষমতার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবং উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার একটি বড় অংশ এখনো অক্ষত অবস্থায় টিকিয়ে রেখেছে। সিএনএন-এর এই গোয়েন্দা মূল্যায়নটি ট্রাম্পের সেই সময়ের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ছয় সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সুযোগকে ইরান অত্যন্ত সুকৌশলে কাজে লাগিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তারা সেই সব রকেট লঞ্চার এবং সামরিক সরঞ্জাম খুঁড়ে বের করেছে, যা আগের হামলার সময় হয়তো মাটির নিচে চাপা পড়েছিল বা তারা পরিকল্পিতভাবে লুকিয়ে রেখেছিল। এই ঘটনাই স্পষ্ট করে দেয় যে, কেন এত বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের দাবি সত্ত্বেও ইরান এত কার্যকরভাবে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে সক্ষম হয়েছে। হরমুজ প্রণালির এই অবরোধের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক টান পড়েছে। যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সক্ষমতা বোঝাতে ‘পুরোপুরি চূর্ণ’ বা ‘টুকরো টুকরো’ হওয়ার মতো শব্দ ব্যবহার করছেন, সেখানে গোয়েন্দা তথ্য বলছে—বর্তমান কঠোর নৌ-অবরোধের মধ্যেও ইরান অন্তত আরও চার মাস তাদের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম।
চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের আরেক শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’ পরিস্থিতি নিয়ে আরও একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়, হরমুজ প্রণালিতে থাকা ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির মধ্যে মাত্র ৩টি বাদে বাকি ৩০টিতেই এখনো তাদের ‘অপারেশনাল অ্যাক্সেস’ বা পূর্ণ পরিচালনার সক্ষমতা রয়েছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে ঝড় ওঠে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এতে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দীর্ঘ ও আক্রমণাত্মক পোস্ট দেন। ওই প্রতিবেদনে তার আগের দাবির সরাসরি বিরোধিতা করায় তিনি সংবাদমাধ্যমটিকে ‘দেশদ্রোহী’ হিসেবে অভিহিত করেন।
ট্রাম্প তার পোস্টে লেখেন:
“যখন ফেইক নিউজ বলে যে ইরানি শত্রু আমাদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে ভালো করছে, তখন এটি কার্যত দেশদ্রোহিতা; কারণ এটি একটি মিথ্যা এবং এমনকি অযৌক্তিক বক্তব্য। তারা শত্রুকে সাহায্য ও প্ররোচনা দিচ্ছে! এটি কেবল ইরানকে একটি মিথ্যা আশা দিচ্ছে, যখন তাদের কোনো আশাই থাকা উচিত নয়। এরা আমেরিকান কাপুরুষ যারা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ইরানের নৌবাহিনীতে ১৫৯টি জাহাজ ছিল—প্রতিটি জাহাজ এখন সমুদ্রের তলদেশে। তাদের কোনো নৌবাহিনী নেই, তাদের বিমান বাহিনী চলে গেছে, সমস্ত প্রযুক্তি শেষ, তাদের ‘নেতারা’ আর নেই এবং দেশটি একটি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের নাম। কেবল পরাজিত, অকৃতজ্ঞ এবং বোকারাই আমেরিকার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প।”
তবে বিশ্লেষকরা ট্রাম্পের এই পোস্টের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক খেয়াল করেছেন। এত ক্ষোভ প্রকাশের পরও ট্রাম্প তার পোস্টে একবারের জন্যও সরাসরি এটি অস্বীকার করেননি যে, হরমুজ প্রণালির ওই ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে ইরানের প্রবেশাধিকার বা পরিচালনার ক্ষমতা নেই।
প্রেসিডেন্টের দাবি এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের এই সাংঘর্ষিক অবস্থা নিয়ে গত মঙ্গলবার মার্কিন সিনেট শুনানিতেও ব্যাপক উত্তাপ ছড়ায়। শুনানিতে জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, টাইমসের প্রতিবেদনটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগের দাবির বিরোধী কি না। কিন্তু শীর্ষ এই জেনারেল অত্যন্ত সুকৌশলে উত্তর দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।
জেনারেল কেইন বলেন, “আমাদের যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের (Battle Damage Assessment) সব বিষয় সম্পূর্ণ গোপন এবং এই উন্মুক্ত ফোরামে সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা আমার জন্য অনুচিত হবে। আমি প্রশ্নের প্রশংসা করছি, কিন্তু আমি এর কোনো উত্তর দেব না।”
প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথও জেনারেল কেইনের সঙ্গে সুর মিলিয়ে গণমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, “মানুষ কী ফাঁস করল বা না করল তা আমি কেন নিশ্চিত করতে যাব? আমরা এসব বিষয়ে জনসমক্ষে কথা বলি না।” অথচ এই হেগসেথই গত এপ্রিলে পেন্টাগনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জোর গলায় দাবি করেছিলেন, “তাদের (ইরানের) ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে, লঞ্চার, উৎপাদন কেন্দ্র এবং বিদ্যমান মজুত ফুরিয়ে গেছে ও ধ্বংস হয়েছে এবং প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর।”
সিনেট শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি ইঙ্গিত দেন যে, ট্রাম্প প্রশাসন জনসমক্ষে যা বলছে, গোপন বা ক্লাসিফাইড সেটিংসে (Classified Settings) তারা আইনপ্রণেতাদের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলছে।
শুনানিতে মারফি যখন প্রতিরক্ষাসচিব হেগসেথকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেন—যুক্তরাষ্ট্রের কি হরমুজ প্রণালি খোলার মতো কোনো সামরিক উপায় বা সক্ষমতা অবশিষ্ট নেই? হেগসেথ তা অস্বীকার করে বলেন যে, “অবশ্যই আমাদের উপায় আছে।” মারফি তখন পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “ব্যক্তিগত ব্রিফিংয়ে আমাদের কাছে যা সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, এটি তেমন নয়।” তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, যদি সামরিকভাবে প্রণালিটি খোলার পথ খোলাই থাকে, তবে কেন প্রশাসন তা ব্যবহার করে জ্বালানি সংকট মেটাচ্ছে না। জবাবে হেগসেথ সরাসরি উত্তর না দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে প্রসঙ্গ ঘোরানোর চেষ্টা করেন।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্প প্রশাসন প্রায়শই তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা এগিয়ে নিতে এবং নিজেদের সাফল্য জাহির করতে সামরিক ও কৌশলগত অতিরঞ্জিত তথ্য ব্যবহার করে থাকে। যুদ্ধের শুরুতে গোয়েন্দারা ট্রাম্পকে আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে, ইরানের শীর্ষ নেতাকে হত্যা করলেই দেশটির শাসন ব্যবস্থার পতন ঘটবে না। কিন্তু প্রশাসন সেই পূর্বাভাস আমলে নেয়নি।
সাবেক ন্যাটো কমান্ডার এবং অবসরপ্রাপ্ত অ্যাডমিরাল জেমস স্টাভরিডিস বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, “যদি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনগুলো সঠিক হয়, তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ঠিক তাই করছে যা তাদের পেশাগতভাবে করা উচিত—সত্য তুলে ধরা।”
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই যুদ্ধ নিয়ে হোয়াইট হাউসের অনেক যুক্তিই প্রশাসনের অতিরঞ্জিত বয়ান তৈরির পুরোনো অভ্যাসের সঙ্গে হুবহু মিলে যাচ্ছে। এর আগে গণ-ডিপোর্টেশন (Mass Deportation) নিয়ে অবাস্তব তথ্য প্রদান বা মার্কিন নির্বাচনে জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ—সবখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের এই একই ধরনের ছক লক্ষ্য করা গেছে। এখন ইরানের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে এই ফারাক প্রমাণ করছে যে, যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতার চেয়েও রাজনৈতিক বয়ান তৈরিকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে হোয়াইট হাউস।