শিরোনামঃ
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এডিবি প্রেসিডেন্টের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে ইরানের সম্মতি, চুক্তির সম্ভাবনা আতাউর রহমানের স্মরণসভায় আবুল হায়াতের আক্ষেপ সুস্থ ও প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরু চেনার উপায় চুক্তি না হলে ইরানের সঙ্গে ‘বড় সংঘাতের’ হুঁশিয়ারি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টাঙ্গাইলে রডবাহী ট্রাক খাদে উল্টে নিহত পনেরো যাত্রী টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজায় নেই কোরবানির ঈদ চাঁদপুরে আকস্মিক ঝড়ের কবলে যাত্রীবাহী লঞ্চ আহত অর্ধশতাধিক গরু কোরবানির দাবিতে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু খামারিদের বিক্ষোভ শিশু রামিসা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র দাখিল শুনানি জুনে
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ১২:২৬ পূর্বাহ্ন

আগামী অর্থবছরে চার ডজন পণ্যে শুল্ক বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২৫ মে, ২০২৬

আগামী অর্থবছরে অন্তত চার ডজন পণ্য ও সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে চাল, গম, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, মাছ, মাংস, চিনি এবং চায়ের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে ব্যাটারিচালিত রিকশা, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারের ওপর অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আয় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এসব পণ্যে কর ও শুল্ক বৃদ্ধির ছক কষা হয়েছে। এছাড়া অনলাইন মার্কেটিং এজেন্টদের কমিশনের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ এবং প্লাস্টিক পণ্যে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব রয়েছে। নির্মাণ খাতেও ভ্যাট ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো, নতুন গঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে বিশাল সরকারি ব্যয়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান করা।

তবে অর্থনীতিবিদরা সরকারের এই রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেছেন, অতিরিক্ত করের এই বোঝা যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের ওপর নতুন করে চেপে না বসে। গত তিন বছর ধরে টানা দুই অঙ্কের উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া পূর্ববর্তী রাজনৈতিক সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে এমনিতেই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর মহাপরিচালক এ কে এনামুল হক বলেন, সাধারণ মানুষ আগামী নতুন বাজেটে স্বস্তি চায়। তাই নতুন বাজেটে কর ও ভ্যাট আদায়ের প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সাজানো উচিত যা সাধারণ মানুষের জন্য সুবিধাজনক হয়।

নতুন সরকারের প্রথম মেয়াদের এই বাজেটে এনবিআর-এর জন্য রাজস্ব আয়ের একটি বড় ও উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, যা হতে পারে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এই অঙ্ক বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ কোটি টাকার চেয়ে অন্তত ২০ শতাংশ বেশি। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ভ্যাট থেকে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৫১.৩ শতাংশ এবং কাস্টমস শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যার পুরোটাই পরোক্ষ কর। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই দেশের সেবা খাতকে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের আওতায় আনার জন্য সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে।

ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে. মুজেরি বলেন, পরোক্ষ কর থেকে সরকারের বেশি আয় করার অর্থ হলো দরিদ্র মানুষের ওপর বোঝা চাপানো এবং ধনীদের সুবিধা দেওয়া। এর ফলে সমাজে আয়বৈষম্য আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। তিনি গিনি সহগের (Gini Coefficient) তথ্য তুলে ধরে বলেন, ২০১০ সালে এর মান ছিল ০.৪৫৮, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ০.৪৮২ এবং ২০২২ সালে ০.৪৯৯৯-এ দাঁড়ায়। গিনি সহগের মান যত ছোট হয়, জাতীয় সম্পদের সুষম বণ্টন তত ভালো হয়, কিন্তু এই মান বৃদ্ধির অর্থ হলো সমাজে বৈষম্য বাড়ছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন অর্থবছর থেকে ভ্যাট সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করা হবে। বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত ভ্যাটদাতার সংখ্যা মাত্র আট লাখ। যাদের বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকার বেশি, তাদের জন্য ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, আগামী চার বছরের মধ্যে ভ্যাটদাতার সংখ্যা এক কোটিতে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে আগামী বাজেট থেকে নতুন প্রক্রিয়া শুরু হবে। পাশাপাশি ভ্যাট ফাঁকি রোধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাও (অটোমেশন) আরও শক্তিশালী করা হবে বলে তিনি জানান।

২০২৪ সালের এপ্রিলে বিশ্বব্যাংক তাদের ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট স্পেশাল ফোকাস: স্ট্রেন্থেনিং ডমেস্টিক রিসোর্স মোবিলাইজেশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে যে, বাংলাদেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হচ্ছে ভ্যাট। বিশ্বব্যাংকের মতে, নীতি ও পরিপালনগত ফাঁকফোকর বন্ধ করতে পারলে বর্তমানের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি ভ্যাট সংগ্রহ করা সম্ভব। কর প্রশাসনে প্রত্যাশার চেয়ে কম পারফরম্যান্স, দুর্নীতির কারণে রাজস্ব ক্ষতি এবং বিভিন্ন কর ছাড়ের কারণেই ২০১১ সালে কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে ৯.২ শতাংশ ছিল, তা ২০২৪ সালে এসে ৭ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত কর কর্মকর্তাদের কারণে গত এক দশকে কর-জিডিপি অনুপাত ব্যাপকভাবে কমেছে, কারণ গড়ে ৬ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে তাল মিলিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানো সম্ভব হয়নি। শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবেই প্রত্যক্ষ কর বাড়ানোর প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ধীরগতিতে এগোচ্ছে, ফলে এনবিআর প্রতি বছর পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।

ক্যাম্পেইন ফর গুড গভর্নেন্স এবং অক্সফাম বাংলাদেশের ২০২১ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা দরিদ্র মানুষের আয়ের ১২.১ শতাংশ নিয়ে নেয়, যেখানে ধনীদের ক্ষেত্রে এটি মাত্র ৫.৯ শতাংশ। মোবাইল ফোন ব্যবহার, গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওষুধসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ওপর যে প্রতিদিন ভ্যাট দিতে হচ্ছে, সে বিষয়ে দরিদ্র মানুষের তেমন কোনো ধারণাই নেই। এই অবস্থায় নতুন করে নিত্যপণ্যের ওপর ভ্যাট ও শুল্ক বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনে আরও একটি বড় আঘাত হিসেবে দেখা দিতে পারে।

সূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...