আজ ৩০ মে, শনিবার। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ও বেদনাবিধুর দিন। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের এই দিনে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের অধিনায়ক, স্বাধীনতার ঘোষক এবং আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শাহাদাতবরণ করেন। চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটের আঘাতে শাহাদাতবরণ করেন এই মহান নেতা। তাঁর এই ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে সমগ্র জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করছে।
এবারের শাহাদাতবার্ষিকী দেশবাসীর কাছে এক ভিন্ন আবেগ ও তাৎপর্য নিয়ে হাজির হয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে শহীদ জিয়ার প্রতিষ্ঠিত দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পুনরায় রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শহীদ জিয়াউর রহমানের জ্যেষ্ট পুত্র এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বর্তমানে নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সাথে দেশ পরিচালনা করছেন। দেশের মানুষের বিপুল আস্থা ও অভূতপূর্ব সমর্থন নিয়ে এবারসহ মোট পাঁচবার রাষ্ট্র পরিচালনার গৌরব অর্জন করলো বিএনপি। ফলে আজ রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি প্রান্তের প্রতিটি জনপদে শহীদ জিয়ার দর্শন ও অবদান নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা ও স্মরণানুষ্ঠান।
দিবসটি উপলক্ষে বিএনপি গত ২৫ মে থেকে আগামী ১ জুন পর্যন্ত আট দিনব্যাপী এক বিস্তারিত ও বিশেষ কর্মসূচি পালন করছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশজুড়ে বিশেষ পোস্টার প্রকাশ করা হয়েছে এবং সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছেন। আজ ৩০ মে ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারাদেশের সকল স্তরের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং উত্তোলন করা হয়েছে শোকের প্রতীক কালো পতাকা। আজ সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের লাখো নেতাকর্মী শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ, ফাতেহা পাঠ ও বিশেষ মোনাজাত করবেন। জিয়াতর শেষে মাজার প্রাঙ্গণে জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের উদ্যোগে এক বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিটি থানা এবং দেশের সব জেলা ও মহানগরে আজ দিনভর অসহায়, অসচ্ছল ও দুস্থ মানুষের মাঝে কাপড়, চাল, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। পরদিন ৩১ মে রোববার বেলা ২টায় রাজধানীর রমনা ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে এক কেন্দ্রীয় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে।
১৯৩৬ সালের ১৯ জানুয়ারি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ী গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান। তাঁর ডাকনাম ছিল ‘কমল’। পিতা মনসুর রহমান ছিলেন একজন সরকারি রসায়নবিদ এবং মাতা জাহানারা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। শৈশবের কিছুকাল বগুড়ার গ্রামে কাটলেও পিতার চাকরির সূত্রে তাঁর শিক্ষাজীবনের বড় অংশ কাটে কলকাতায় এবং দেশভাগের পর করাচিতে। করাচির বিখ্যাত একাডেমি থেকে কৃতিত্বের সাথে শিক্ষা শেষ করে ১৯৫৩ সালে তিনি কাকুল পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে ক্যাডেট হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভ করেন।
সামরিক জীবনে জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন অত্যন্ত চৌকস, কড়া শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং অকুতোভয় অফিসার। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার হিসেবে তিনি যে অসীম সাহসিকতা ও রণকৌশল প্রদর্শন করেছিলেন, তা সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য নজির সৃষ্টি করে। তাঁর এই বীরত্বের জন্য তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাঁকে সম্মানজনক সামরিক পদকে ভূষিত করে। ১৯৬৯ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন এবং ১৯৭০ সালে নবগঠিত অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ডার হিসেবে চট্টগ্রামে বদলি হয়ে আসেন।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এদেশের নিরীহ ও নিরস্ত্র মানুষের ওপর কাপুরুষোচিত ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বা গণহত্যা শুরু করে, তখন সমগ্র জাতি এক চরম অনিশ্চয়তা ও দিশেহারা অবস্থার মধ্যে পড়েছিল। ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে এবং পরবর্তীতে ২৭ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা পাঠ করেন। তাঁর সেই বজ্রকণ্ঠের ঘোষণা দিকভ্রান্ত ও আতঙ্কিত বাঙালি জাতিকে এক মুহূর্তে উজ্জীবিত করে তোলে এবং সর্বস্তরের মানুষকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার এক অদম্য মানসিক শক্তি জোগায়।
স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েই মেজর জিয়া ক্ষান্ত হননি, তিনি নিজের রেজিমেন্ট নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং সরাসরি রণাঙ্গনে নেমে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সিলেট, ময়মনসিংহ ও রৌমারী অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধের জন্য তাঁর নামে গঠিত হয় প্রথম সামরিক ব্রিগেড ‘জেড ফোর্স’। তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক এবং ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। রণাঙ্গনের প্রতিটি যুদ্ধে তিনি নিজের জীবনের পরোয়া না করে সম্মুখভাগ থেকে নেতৃত্ব দিতেন। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য অবদান, বীরত্ব ও রণকৌশলের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সামরিক খাতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকাণ্ড এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে এক চরম অস্থিতিশীল ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানে যখন সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে, ঠিক তখনই ৭ নভেম্বর দেশের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব অধ্যায়ের সূচনা হয়। সিপাহী ও সাধারণ জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমে আসে এবং বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসে তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। এই ঐতিহাসিক ‘সিপাহী-জনতার বিপ্লব’-এর মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশের শাসনক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। প্রথমে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব নিয়েই তিনি একটি বিপর্যস্ত, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন করা।
শহীদ রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৃতি হলো দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনর্প্রবর্তন। ১৯৭৫ সালে প্রবর্তিত একদলীয় শাসনব্যবস্থা বা ‘বাকশাল’ বিলুপ্ত করে তিনি দেশের সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার অধিকার ফিরিয়ে দেন। সংবাদপত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী, কমিউনিস্ট পার্টিসহ সব দল তাঁর আমলেই নতুন করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু করার আইনি অধিকার পায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী দল ছাড়া গণতন্ত্র কখনো পূর্ণতা পেতে পারে না। এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপের কারণেই দেশবাসী তাঁকে ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা’ হিসেবে চেনে।
দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘১৯ দফা কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন। এই ১৯ দফা ছিল মূলত বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের এক মাস্টারপ্ল্যান। তাঁর নেতৃত্বে দেশে এক বিশাল অর্থনৈতিক বিপ্লবের সূচনা হয়। গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল করতে তিনি দেশব্যাপী ‘স্বেচ্ছাশ্রমে খাল খনন কর্মসূচি’ শুরু করেন, যা নদীমাতৃক বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক অভূতপূর্ব সেচ বিপ্লব নিয়ে আসে। খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বাংলাদেশ তাঁর আমলেই প্রথমবারের মতো উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশে পরিণত হয় এবং বিদেশে চাল রপ্তানি শুরু করে।
আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম দুটি প্রধান স্তম্ভ—তৈরি পোশাক শিল্প (গার্মেন্টস সেক্টর) এবং বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি (রেমিট্যান্স)—এই দুটি খাতেরই গোড়াপত্তন হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সুদূরপ্রসারী ও দূরদর্শী পরিকল্পনার মাধ্যমে। তিনি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে শিল্প ব্যাংক ও শিল্প ঋণ সংস্থা স্থাপন করেন, যার ফলে দেশে প্রথম উদ্যোক্তা শ্রেণির বিকাশ ঘটে। গ্রামীণ নারীর ক্ষমতায়ন ও সার্বিক নিরাপত্তার জন্য তিনি ‘গ্রাম প্রতিরক্ষা দল’ (ভিসিপি) গঠন করেন এবং পুলিশ বাহিনীতে প্রথম নারীদের নিয়োগের ব্যবস্থা করেন।
জিয়াউর রহমান অনুভব করেছিলেন যে, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে হলে এদেশের মানুষের একটি সুনির্দিষ্ট ও নিজস্ব জাতীয় পরিচয় প্রয়োজন। সেই চেতনা থেকেই তিনি প্রবর্তন করেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। এই দর্শন ধর্ম, বর্ণ, উপজাতি ও ভৌগোলিক অবস্থান নির্বিশেষে বাংলাদেশের সকল নাগরিককে এক অভিন্ন সূত্রে বেঁধে দেয়। এই কালজয়ী দর্শন এদেশের মানুষের মনে এক তীব্র স্বাজাত্যবোধ ও আত্মমর্যাদার জন্ম দেয়।
নিজের এই রাজনৈতিক দর্শনকে স্থায়ী রূপ দিতে এবং দেশের সাধারণ মানুষকে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম উপহার দিতে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল’ (বিএনপি)। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া—দেশের প্রতিটি প্রান্তের সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী ও তরুণ সমাজকে এই দলে অন্তর্ভুক্ত করেন তিনি। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই বিএনপি এদেশের মানুষের হৃদয়ে অন্যতম প্রধান ও বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্থান করে নেয়।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে জিয়াউর রহমান এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনেন। তিনি ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়’—এই নীতির ওপর ভিত্তি করে এক স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তোলেন। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ককে তিনি এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে যান, যার ফলে বাংলাদেশ ওআইসি (OIC)-এর আল-কুদস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়। এছাড়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের গৌরবময় অন্তর্ভুক্তি তাঁর কূটনৈতিক সাফল্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও শান্তি বজায় রাখার জন্য তিনি একটি আঞ্চলিক জোট গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁরই অক্লান্ত পরিশ্রম, সুচিন্তিত রূপরেখা ও দূরদর্শী কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফসল হলো ‘সার্ক’ (SAARC)। যদিও সার্কের আনুষ্ঠানিক যাত্রা তাঁর শাহাদাতবরণের পর শুরু হয়েছিল, তবে এই জোটের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে জিয়াউর রহমানের নাম চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান যখন জনপ্রিয়তার শীর্ষে এবং দেশ যখন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াচ্ছিল, ঠিক তখনই নেমে আসে এক অন্ধকার কালো রাত। ১৯৮১ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সফরে চট্টগ্রামে যান। ৩০ মে গভীর রাতে একদল উশৃঙ্খল, পথভ্রষ্ট ও ষড়যন্ত্রকারী সেনা কর্মকর্তার সশস্ত্র দল চট্টগ্রামের সার্কিট হাউস আক্রমণ করে। সেখানে এই মহান দেশপ্রেমিক, অকুতোভয় রাষ্ট্রনায়ককে অত্যন্ত নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়।
তাঁর মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে সমগ্র বাংলাদেশে এক অবর্ণনীয় শোকের ছায়া নেমে আসে। দেশের মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ১ জুন ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে অনুষ্ঠিত শহীদ জিয়ার জানাজায় প্রায় ৩০ লাখের বেশি মানুষের সমাগম হয়েছিল, যা ছিল তৎকালীন বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম জানাজা। কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি ছাড়াই কেবল অন্তরের ভালোবাসা থেকে সাধারণ মানুষ তাদের এই প্রিয় নেতাকে শেষ বিদায় জানাতে এসেছিলেন।
শহীদ জিয়াউর রহমান আজ আমাদের মাঝে সশরীরে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া রাজনৈতিক দর্শন, সততা, দেশপ্রেম এবং দূরদর্শী কর্মপরিকল্পনা আজ ৪৫ বছর পরও এদেশের মানুষের মাঝে সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও জাজ্বল্যমান। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে যে সততা ও সাদামাটা জীবনযাপনের দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তা বিশ্ব রাজনীতিতে বিরল। একজন রাষ্ট্রপতি হওয়া সত্ত্বেও মৃত্যুর পর তাঁর ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া আর কোনো বৈষয়িক সম্পদ পাওয়া যায়নি—এই একটি তথ্যই তাঁর সততার গভীরতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।
আজকের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপির বিপুল বিজয় এবং তাঁর সুযোগ্য পুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের দেশ পরিচালনা শহীদ জিয়ার আদর্শেরই এক ঐতিহাসিক বিজয়। দেশের আপামর জনতা আজ প্রমাণ করেছে যে, শহীদ জিয়ার ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেতনা এদেশের মাটির গভীরে প্রোথিত। রাষ্ট্র ও সমাজের যেকোনো সংকটে জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শন আজও আমাদের আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখায়। এই মহান জাতীয় নেতার ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে দেশের প্রতিটি নাগরিকের একটাই অঙ্গীকার হওয়া উচিত—তাঁর রেখে যাওয়া স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের চেতনাকে চিরকাল সমুন্নত রাখা। বাংলাভাষী প্রতিটি মানুষের প্রাণের স্পন্দন আজ একটি কথাই বলবে—শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, আপনাকে স্যালুট।