পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ক্ষমতার লড়াই, সিদ্ধান্ত গ্রহণের টানাপোড়েন এবং পার্বত্য জেলা পরিষদ গঠন নিয়ে প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের জের ধরেই অবশেষে পদত্যাগ করেছেন পূর্ণ মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান। রাঙ্গামাটি আসন থেকে রেকর্ড ভোটে নির্বাচিত এই প্রবীণ বিএনপি নেতা ও সাবেক বিচারক নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতেই এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। যদিও সোমবার জমা দেওয়া আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্রে তিনি কেবলই শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছেন, তবে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নীতিনির্ধারক ও ভেতরের সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, মন্ত্রণালয়ে নিজের একক কর্তৃত্ব হারানোর কারণেই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি এবং দীপেন দেওয়ানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন সংসদ সদস্যের মতে, মন্ত্রীর কিছু স্বাস্থ্যগত জটিলতা থাকলেও তা কোনোভাবেই তার দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সাড়ে তিন মাস আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হওয়ার পর থেকেই মূলত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে একধরনের সুপ্ত মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের সৃষ্টি হয়, যা এক মাসের মাথায় প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। এই প্রশাসনিক বিরোধের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে যখন প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল স্বীয় ক্ষমতা খাটিয়ে মন্ত্রণালয়ের সচিব মিজানুর রহমানকে নির্দেশ দেন যে, তার (প্রতিমন্ত্রীর) স্বাক্ষর বা অনুমোদন ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল যেন সরাসরি মন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো না হয়।
যদিও সরকারের ‘রুলস অব বিজনেস’ বা কার্যবিধি অনুযায়ী, যেকোনো মন্ত্রণালয়ের প্রধান নির্বাহী হলেন স্বয়ং মন্ত্রী এবং কোনো সিদ্ধান্তের জন্য প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনের আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। সাধারণত সচিবগণ প্রতিমন্ত্রীর দপ্তরের মাধ্যমে মন্ত্রীর কাছে ফাইল উপস্থাপন করেন, যা একটি দাপ্তরিক শিষ্টাচার মাত্র। সরকারের সাবেক একজন আইন সচিবের মতে, মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরামর্শ করে প্রতিমন্ত্রীর কাজের পরিধি নির্ধারণ করে দেন, কিন্তু এই মন্ত্রণালয়ে সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে প্রতিমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ক্রমাগত হস্তক্ষেপের অভিযোগ আসছিল। এই পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ দীপেন দেওয়ান বিষয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে আনেন। তবে প্রধানমন্ত্রী তাকে প্রতিমন্ত্রীকে আস্থায় নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার পরামর্শ দিলে মন্ত্রী চরম হতাশ হয়ে পড়েন।
এই দ্বন্দ্বের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়ায় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ পুনর্গঠন এবং এর প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি। গত মে মাসে রাঙ্গামাটির এক অনুষ্ঠানে মন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে, ঈদুল আজহার আগেই পরিষদগুলো পুনর্গঠন করা হবে। সেই অনুযায়ী বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রশাসক নিয়োগে আঞ্চলিক নেতারা একমত হলেও, রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের শীর্ষ পদটি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। স্থানীয় সূত্রমতে, দীপেন দেওয়ান নিজের ভগ্নিপতি মানস মুকুরকে এই পদে বসাতে চেয়েছিলেন, যার তীব্র বিরোধিতা করেন চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য মীর নাসির উদ্দিনের ছেলে প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল। নিজের নির্বাচনী অঞ্চলেই স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এবং প্রতিমন্ত্রীর অনড় অবস্থানের কারণে ঈদের আগে পরিষদ পুনর্গঠন করতে না পেরে চরম অপমানিত বোধ করেন সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত দীপেন দেওয়ান।
একই সাথে মন্ত্রণালয়ের অধীনে খাস জমি বরাদ্দ ও অন্যান্য সরকারি সম্পদ বণ্টনকে কেন্দ্র করে দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে একধরনের প্রচ্ছন্ন বৈরিতার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। প্রতিমন্ত্রীর প্রভাবশালী অনুসারী চক্র মন্ত্রণালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে বলে দলের হাইকমান্ডকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাননি মন্ত্রী। অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রীর শিবিরের দাবি ছিল, দীপেন দেওয়ান প্রায়শই প্রতিমন্ত্রীকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং এই বিষয়ে মীর হেলালও পূর্বে প্রধানমন্ত্রীর কাছে নালিশ করেছিলেন। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর দীপেন দেওয়ান প্রধানমন্ত্রীর সাথে একান্ত সাক্ষাৎ করে নিজের সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানান এবং পরবর্তীতে নিজের সহকারীর মাধ্যমে পদত্যাগপত্রটি পাঠিয়ে দেন।
দীপেন দেওয়ানের এই আকস্মিক বিদায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ১৯৯৮ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির আলোকেই এই বিশেষায়িত মন্ত্রণালয়টি গঠিত হয়েছিল, যার নিয়ম অনুযায়ী এর দায়িত্বে অবশ্যই একজন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক। ফলে নতুন কোনো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মন্ত্রী নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়টি সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অধীনেই পরিচালিত হবে। ৬৫ বছর বয়সী দীপেন দেওয়ান, যিনি ২০০৫ সালে যুগ্ম জেলা জজের পদ ছেড়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন এবং যার পিতা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উপদেষ্টা, তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায় পার্বত্য অঞ্চলের দলীয় রাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ