বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের পাতায় ওবায়দুল কাদের একসময়ের এক হেভিওয়েট ও আলোচিত নাম। যাঁর একেকটি রাজনৈতিক সংলাপ শোনার জন্য কান পেতে থাকত কোটি মানুষ, যাঁর বাহারি রঙের মুজিব কোট, দামি হাতঘড়ি আর চশমার ফ্যাশন ছিল রাজনীতির অন্দরে মুখরোচক আলোচনার খোরাক—আজ তাঁর জীবনের নাট্যমঞ্চে নেমে এসেছে এক গভীর ও নির্মম নীরবতা। সুদূর কলকাতার নিউটাউনের এক নিরবিলি ফ্ল্যাটে বসে তিনি এখন কাটাচ্ছেন এক নির্বাসিত ও নিঃসঙ্গ জীবন। ‘খেলা হবে’ বলে যে স্লোগান তিনি একসময় প্রতিপক্ষের দিকে সগর্বে ছুড়ে দিয়েছিলেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে রাজনীতির সেই জটিল খেলায় আজ তিনি নিজেই মাঠের বাইরে ছিটকে পড়েছেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদে বসা ওবায়দুল কাদেরের উত্থান ছিল অনেকটা ধুমকেতুর মতো। একসময় তাঁকে মনে হতো অপরাজেয়। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকস্মিক ঝড়ে সস্ত্রীক ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় আশ্রয় নেওয়ার পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এক অদ্ভুত একাকিত্ব নেমে এসেছে। একসময় যে মানুষটির একটুখানি দেখা পাওয়ার জন্য হাজারো নেতাকর্মী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতেন, আজ তাঁর ছায়াও মাড়াতে চাচ্ছেন না দলের সিংহভাগ নেতা। তৃণমূল থেকে শুরু করে দলের শীর্ষ মহল—সবখানেই এখন ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভের দেয়াল। দলের ভেতরের মানুষরাই এখন তাঁর রাজনৈতিক অতীত নিয়ে নানা চুলচেরা বিশ্লেষণ ও সমালোচনা শুরু করেছেন।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ওবায়দুল কাদের নিজেই দলে অনুপ্রবেশকারী নব্য সুযোগ সন্ধানীদের ‘কাউয়া’ বা ‘হাইব্রিড’ বলে ব্যঙ্গ করতেন। কিন্তু তিনি নিজে সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর দলের ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ ও পরীক্ষিত কর্মীদের অবমূল্যায়ন করে সেই বিতর্কিত ও হাইব্রিড মুখদেরই লাইমলাইটে এনেছিলেন বলে এখন গুরুতর অভিযোগ উঠছে। বিভিন্ন উপ-কমিটির পদ দেওয়া নিয়ে নানা আর্থিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক, বিনোদন জগতের তারকাদের সঙ্গে তাঁর মাত্রাতিরিক্ত মেলামেশা এবং জনসভার মঞ্চে যাত্রাপালার ঢঙে দেওয়া বক্তব্য একটা সময় জনমনে বিনোদন জোগালেও, দলের ভেতরে তা চরম বিরক্তি ও অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দলের ভেতরে অনেকেরই ক্ষোভ—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগকে রাজপথে নামানোর মতো চরম উস্কানিমূলক ও ভুল সিদ্ধান্ত দিয়ে তিনি পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন, যার চূড়ান্ত ও ভয়াবহ খেসারত আজ পুরো সংগঠনকে দিতে হচ্ছে।
কলকাতায় যাওয়ার পর ওবায়দুল কাদেরের জীবনে নিঃসঙ্গতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। সেখানে গিয়েও তাঁর ভাগ্যের চাকা ঘোরেনি। গত দুই বছরে দলের কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় নেতাকর্মীদের যত গোপন ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে, তার কোথাও এই শীর্ষ নেতার কোনো আমন্ত্রণ মেলেনি। জানা গেছে, হাতে গোনা কয়েকজন সুবিধাভোগী ছাড়া এখন আর কেউ তাঁর বিন্দুমাত্র খোঁজ নেন না। এমনকি বছরখানেক আগে দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে তাঁকে ডেকে পাঠালেও তিনি সেই ডাকে সাড়া দেননি। এটি কি নেত্রীর ওপর কোনো গোপন অভিমান নাকি আইনি ও পারিপার্শ্বিক ভয়ের কারণে—তা আজও এক মস্ত বড় রহস্য। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তিনি মন্ত্রী থাকাকালীন দেশের আসল পরিস্থিতি অনুধাবনের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের ফ্যাশন প্রদর্শন, বাহারি মুজিব কোট আর চাটুকারদের স্তুতি শুনতেই বেশি ব্যস্ত ছিলেন। এই চাটুকারিতার আড়ালে যে সংগঠনের ভেতরের ভিত্তিটা দিন দিন ফাঁপা হয়ে যাচ্ছিল, তা টের পাওয়ার মতো রাজনৈতিক দূরদর্শিতা তাঁর ছিল না।
বর্তমানে আওয়ামী লীগের শীর্ষ মহলে এক নতুন হাওয়া বইছে। দল পুনর্গঠন ও ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি তৃণমূলের সঙ্গে নানা বৈঠক করছেন। তবে বিস্ময়করভাবে, সেইসব ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কোথাও ওবায়দুল কাদেরের নাম বা উল্লেখ নেই। শেখ হাসিনা এখন ওবায়দুল কাদেরের মতো বাচাল, আত্মকেন্দ্রিক ও জনবিচ্ছিন্ন নেতার বিকল্প খুঁজছেন। আগামী দিনে দলের হাল ধরতে পারেন—এমন ত্যাগী নেতার সন্ধান চলছে, যাঁর মাঝে থাকবে প্রয়াত জিল্লুর রহমান কিংবা সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মতো নম্রতা, সততা, দেশপ্রেম আর সংকটে ধীরস্থিরভাবে দলকে টেনে তোলার অসামান্য সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক দক্ষতা।
আইনি দিক থেকেও ওবায়দুল কাদেরের চারপাশটা এখন ঘোর মেঘাচ্ছন্ন। দেশে বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শতাধিক মামলা ঝুলছে। হয়তো খুব শিগগিরই তাঁর অনুপস্থিতিতেই এসব মামলার রায় ঘোষণা হবে। কলকাতার ফ্ল্যাটে বসে এখন নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ছাড়া ওবায়দুল কাদেরের আর কোনো ব্যস্ততা নেই। যে মুঠোফোনটি একসময় অবিরাম ও ব্যস্ততায় বেজে চলত, আজ তা সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। রাজনীতির সবুজ মাঠে রেফারি হয়তো অনেক আগেই তাঁর জন্য শেষ বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের এখন কেবল গ্যালারিতে বসে থাকা এক নিঃসঙ্গ, অসহায় দর্শক। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে তাঁর অধ্যায়টি যেভাবে শেষ হতে চলেছে, তা আগামী দিনের উঠতি রাজনীতিবিদদের জন্য এক বড় শিক্ষণীয় গল্প হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪