বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১১:৩০ অপরাহ্ন

কোন বিপদের আভাস দিলেন প্রধানমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত নতুন সরকারের প্রথম একশত দিন পার হতে না হতেই দেশজুড়ে এক ধরনের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থবিরতা, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দা, আন্তর্জাতিক স্তরে বিতর্কিত চুক্তি, সীমান্তে উত্তেজনা এবং মাঠের রাজনীতিতে বিরোধী শিবিরের নানামুখী তৎপরতা বর্তমান প্রশাসনকে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত চাপের মুখে ফেলেছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া একটি বিশেষ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের সচেতন মহলে নতুন করে নানা প্রশ্ন ও গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তিনি তাঁর বক্তব্যে দেশের সামনে এক অত্যন্ত ‘কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়’ অপেক্ষা করছে বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—সরকারপ্রধান কি তবে পর্দার আড়ালে থাকা কোনো বড় বিপদের আভাস পেলেন, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর কোনো অভ্যন্তরীণ সংকট?

দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট আলতাফ পারভেজ উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান সামগ্রিক প্রেক্ষাপটটি নিঃসন্দেহে বেশ জটিল। তিনি মনে করেন, দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, বিশেষ করে ব্যাংকগুলোতে চলমান অস্থিরতা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের অনিশ্চয়তা এবং দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব সরকারকে বেশ বেগতিক অবস্থায় ফেলেছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্যিক চুক্তি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক এবং মাঠপর্যায়ে একটি সদ্য নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের আকস্মিক তৎপরতা প্রশাসনকে বেশ ভাবিয়ে তুলছে। মূলত এই সার্বিক নেতিবাচক পরিস্থিতি অনুধাবন করেই প্রধানমন্ত্রী তাঁর দলীয় নেতাকর্মীদের আগাম সতর্ক থাকার তাগিদ দিয়েছেন বলে তাঁর ধারণা।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ও আগামীর শঙ্কা

গত ৩১ মে রাজধানী ঢাকার খামারবাড়িতে অবস্থিত কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (কেআইবি) প্রাঙ্গণে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক স্মরণ সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান সংকটকাল নিয়ে তাঁর চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ দিনগুলো অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হতে চলেছে এবং এই মুহূর্তে জনগণের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে থাকায় সামান্যতম উদাসীনতা বা অবহেলা আগামী প্রজন্মের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। সরকারের ১০০ দিন পূর্তির ঠিক পরপরই সরকারপ্রধানের এমন দূরদর্শী ও চিন্তিত মন্তব্য দেশীয় রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রার অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।

টালমাটাল অর্থনীতি ও আর্থিক খাত

দেশের অভ্যন্তরে চলমান অর্থনৈতিক মন্দা নিয়ে খোদ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকেই এক ধরনের প্রচ্ছন্ন শঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে ব্যাপক কৃচ্ছ্রসাধন বা ব্যয় সংকোচনের নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এরই অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ব্যবহার না করা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোতে মিতব্যয়ী হওয়া এবং দেশের বড় বড় শপিং মল ও বিপণিবিতানগুলো খোলা রাখার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মতো জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপগুলোই প্রমাণ করে যে দেশের অর্থনৈতিক সংকট কতটা গভীর।

এর বাইরে দেশের ব্যাংকিং খাতে এক নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। বিগত সময়ে দেশ থেকে পাচার হয়ে যাওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়নি। তদুপরি, বিগত আন্দোলনের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অপসারিত একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নরকে বিতর্কিতভাবে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে বসানোকে কেন্দ্র করে ব্যাংকটির গ্রাহক ও সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাংক চত্বরে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনাও ঘটেছে, যার সমাধান এখনো সুদূরপরাহত।

মূল্যস্ফীতির সূচকও সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ২০২৫ সালের পুরোটা সময় মূল্যস্ফীতির হার ৮ থেকে ৯ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করার পর চলতি বছরের মার্চে তা কিছুটা কমলেও, এপ্রিলে তা পুনরায় ৯ শতাংশ পার করে যায়। এর ফলে নির্দিষ্ট ও নিম্ন আয়ের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। এর সাথে আইএমএফ-এর পরবর্তী কিস্তির ঋণ পাওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া চরম অনিশ্চয়তা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে এক বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও মব কালচার

গত ২৭ মে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ১০০ দিন পূর্ণ হলেও দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান বা সন্তোষজনক উন্নতি দেশের মানুষ দেখতে পায়নি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ড, জোরপূর্বক চাঁদা আদায়, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি বা মব জাস্টিস এবং চুরির মতো অপরাধ আশঙ্কাজনক হারে ঘটছে। এমনকি খোদ সরকারি দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সংঘাত সাধারণ মানুষের মনে এক তীব্র নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে পাশবিক নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা দেশের সামাজিক সুরক্ষার কঙ্কালসার রূপটিকেই জনগণের সামনে উন্মোচন করেছে। দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মাজার ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উপর্যুপরি হামলা ও ভাঙচুর অব্যাহত রয়েছে। ঢাকার শাহ আলী মাজারে সংঘটিত হামলায় ভক্তদের মারধরের ঘটনা ঘটলেও মূল অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা নিয়ে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন যে, পুলিশ বাহিনীর ভেতরের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।

মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মাত্র তিন দিন আগে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বিশেষ বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির নেপথ্য কারিগর হিসেবে পরিচিত ড. খলিলুর রহমান দাবি করেছেন যে, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রচ্ছন্ন সম্মতিতেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। তবে সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এই দাবি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, এই স্পর্শকাতর চুক্তি নিয়ে তাঁদের দলের সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক আলোচনা করা হয়নি। এই চুক্তিকে কেন্দ্র করে সংসদের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে, এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীন নীতিনির্ধারণের ক্ষমতাকে সম্পূর্ণ খর্ব করবে। বামপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোও এই চুক্তি বাতিলের দাবিতে রাজপথে নামার হুশিয়ারি দিয়েছে, যা আগামী দিনে রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার জন্য যথেষ্ট।

মহামারি হামের প্রকোপ ও সীমান্ত উত্তেজনা

জনস্বাস্থ্য খাতেও বর্তমান সরকার এক বড় ধরনের পরীক্ষার সম্মুখীন। গত দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে চলা হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ দাবি করেছে যে, তারা এই ভাইরাসের বিস্তার ও সম্ভাব্য ভ্যাকসিন সংকটের বিষয়ে বর্তমান প্রশাসনকে আগেই সতর্ক করেছিল, যা তৎকালীন সময়ে উপেক্ষিত হয়েছিল। ইতোমধ্যে এই রোগে মৃতের সংখ্যা ৫৮৮ জনে পৌঁছেছে, যা সরকারের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরই মধ্যে দেশের সীমান্ত পরিস্থিতিও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর আগ্রাসী মনোভাব বৃদ্ধি পেয়েছে, যার ফলে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১ জুন যশোরের বেনাপোল সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী জোরপূর্বক কিছু মানুষকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার (পুশ-ইন) চেষ্টা করলে বিজিবির দৃঢ় অবস্থানের কারণে তা নস্যাৎ হয়ে যায়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।

বিরোধী শিবিরের তৎপরতা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণ

মাঠের রাজনীতিতেও সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়া সত্ত্বেও সাবেক ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ঢাকা ও চট্টগ্রামে বড় ধরনের জনসমাগম ঘটিয়ে নিজেদের শক্তি প্রদর্শনের চেষ্টা করছে। গত ১ জুন প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদের জানাজাকে কেন্দ্র করে ঢাকায় এবং তার পরের দিন ভোলায় দলটির হাজার হাজার নেতাকর্মী সমবেত হয়ে স্লোগান দেয়, যা প্রশাসনের জন্য এক নতুন দুশ্চিন্তার কারণ। একই সাথে সংসদের ভেতরে থাকা প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীও বিভিন্ন ইস্যুতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে রাজপথে নানা কর্মসূচি দিচ্ছে।

এই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল ক্বাফী রতন মন্তব্য করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সরকারের অদক্ষতা আগামী দিনগুলোতে আরও বড় আর্থিক ও সামাজিক রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমও সরকারের সার্বিক ব্যর্থতার সমালোচনা করে বলেছেন যে, দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও আর্থিক খাতের লুটপাট প্রমাণ করে সরকারপ্রধানের আশঙ্কা অমূলক নয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপির উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য আমানউল্লাহ আমান বলেছেন, একটি বিশেষ চক্র দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করলেও প্রধানমন্ত্রীর যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই কঠিন পরিস্থিতি সফলভাবে কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন


এ জাতীয় আরো খবর...