বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২৯ অপরাহ্ন

হাদি হত্যাকাণ্ডে অমিত শাহের জড়িত: মমতার বিস্ফোরক অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের ধাক্কা কাটিয়ে প্রথম রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েই এক নজিরবিহীন ও বিস্ফোরক মন্তব্য করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারকে কোণঠাসা করতে তিনি সরাসরি নাম উল্লেখ না করে বাংলাদেশের ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে আনেন। ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের চাপ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেন, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে দিল্লির হাত রয়েছে।

অমিত শাহের ফোন ও মমতার তথ্যভাণ্ডার

গত মঙ্গলবার (২ জুন) কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত এক ধরনা কর্মসূচিতে দাঁড়িয়ে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মূল খুনিকে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) গ্রেপ্তার করেছিল। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসার পর এসটিএফ তাদের সফলতার সাথে আটক করে।

মমতার অভিযোগ, এই গ্রেপ্তারের পরপরই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং তাঁকে ফোন করেছিলেন। ফোনে অমিত শাহ এটিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার আখ্যা দিয়ে পুরো বিষয়টি যেন কোনোভাবেই বাইরে জানাজানি না হয় বা মিডিয়ায় না আসে, সেই জন্য রাজ্য পুলিশকে নির্দেশ দিতে মমতাকে অনুরোধ করেন। অমিত শাহকে সরাসরি নিশানা করে মমতা প্রশ্ন তোলেন, “কাকে দিয়ে এই খুনটি করিয়েছিলেন এবং এতে কার কার নাম জড়িয়েছিল? ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পরিবর্তন হলেও সব তথ্যই আমার জানা আছে, কারণ আমার হৃদয়টাই একটা বড় তথ্যভাণ্ডার।”

তিনি আরও যোগ করেন, এতদিন দেশের স্বার্থে তিনি মুখ খোলেননি। কিন্তু বর্তমানে বিজেপির রাজনৈতিক অত্যাচারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে বলেই তিনি বাধ্য হয়ে এই সত্য সামনে এনেছেন। তবে মূল অপরাধীর নাম প্রকাশ করলে বাংলাদেশ নতুন করে উত্তাল হয়ে উঠতে পারে এবং বাংলাদেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসা রয়েছে বলেই তিনি সেই নির্দিষ্ট নামটি এখনই জনসমক্ষে আনছেন না। এর পাশাপাশি মিশনারিজ অব চ্যারিটির তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

ভাঙনের মুখে তৃণমূল ও দলীয় অসন্তোষ

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেস এই মুহূর্তে চরম অভ্যন্তরীণ ভাঙন ও অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। দলের মোট ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জন বিধায়কই বর্তমানে বিদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। দলের চরম বিপর্যয়ের এই চিত্রটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে মঙ্গলবারের মমতার কর্মসূচিতেও। তৃণমূলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের এই সমাবেশে যোগ দেওয়ার জোর আহ্বান জানানো হলেও, ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৬ জন বিধায়ক সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং দলীয় সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই নগণ্য।

এমন এক নাজুক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, দিল্লি থেকে কলকাঠি নেড়ে তৃণমূলকে ভেঙে টুকরো করার চক্রান্ত চালানো হচ্ছে। বেআইনিভাবে কেন্দ্রীয় পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে তাদের দলের বিধায়ক ও কাউন্সিলরদের প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

গাদ্দারদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ও নীতি আদর্শের বার্তা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলেন, কেন্দ্র থেকে তাঁকে বহুবার নানা কিছুর প্রলোভন বা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আদর্শের কারণে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। নিজের দলের সুযোগসন্ধানী নেতাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আজকে আমার একটাই বড় দুঃখ যে, যাদের জন্য আমি সারা জীবন রাজনীতি করলাম, তারাই আজ বেইমান ও গাদ্দারদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। যারা আজ তৃণমূলকে ধ্বংস করার জন্য গাদ্দারি করছে, ঈশ্বর যেন তাদের সুমতি দেন।”

ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে এই মূল রাজনৈতিক ধরনা কর্মসূচি শুরু করার আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার রেড রোডে যান। সেখানে তিনি ভারতীয় সংবিধানের প্রণেতা ড. বি আর আম্বেদকর এবং মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। political বা রাজনৈতিক মহলের ধারণা, দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও ব্যাপক ভাঙন থেকে সাধারণ নেতাকর্মীদের মনোযোগ ঘুরিয়ে দিতেই মমতা এই আন্তর্জাতিক ও সংবেদনশীল ইস্যুটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।


এ জাতীয় আরো খবর...