আমার সিলেট থেকে চট্টগ্রাম বদলির অর্ডার হয়েছে। কয়েকদিন পর চলে যাবো। তাই অনেকেই দেখা করতে আসছেন। একদিন এলেন ডক্টর কবির চৌধুরী। শিক্ষানুরাগী হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম আছে। স্থানীয় একটি নামকরা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর বেশির ভাগ সময় কাটে সেই স্কুলের ছাত্র-ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে।
কথায় কথায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন-
‘কমিশনার সাহেব, আপনার মেয়ের বয়স কত?’
আমি উত্তর দিলাম- ‘আগামী জুনে চৌদ্দ বছরে পড়বে।’
তিনি হেসে বললেন- ‘ডিনামাইট এজ। সাবধানে থাকবেন।’
‘কেন?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি উত্তর দিলেন- টিন এজে হরমোনাল চেঞ্জের কারণে চেনা বাচ্চা অচেনা হয়ে যায়। তার অনেক আচরণ ভালো লাগে না। ওদের খুব সাবধানে হ্যান্ডেল করতে হয়। নয়ত ওরা ডিনামাইটের মতো বিস্ফোরিত হয়। তখন বাবা-মায়ের জীবন নরক হয়ে যায়।’
আমি কিছুটা উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম- ‘কী ধরনের আচরণ?’
তিনি বললেন- ‘তার মধ্যে একধরনের স্বাধীনচেতা ভাব দেখবেন। দ্রুত মুড পরিবর্তন দেখবেন। মেজাজ খিটখিটে হবে। তার উপর আপনাদের চেয়ে বন্ধুদের প্রভাব বেশি থাকবে। রূপ- ফ্যাশন এগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামাবে। এমনকি ছেলেদের ব্যাপারেও আগ্রহী হয়ে উঠতে পারে।’
আমি আরো বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। বললাম- ‘এ জাতীয় সমস্যার কথা আমি শুনেছি। কিন্তু এগুলো হ্যান্ডেল করব কীভাবে?’
তিনি চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বললেন- টিন এজ বয়সের সমস্যার জন্য আমরা শুধু বাচ্চাদের দায়ী করি। কিন্তু এর পেছনে মা-বাবারও দায় আছে। বকাঝকা না করে তাঁরা কিছু আচরণ বদলালে এ সমস্যা সমাধান অনেক সহজ হয়। স্কুল চালানোর অভিজ্ঞতা থেকে জানি, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে টিন এজারদের সাথে মা- বাবার আচরণগত কিছু সমস্যা আছে।’
‘কেমন আচরণ?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
তিনি কিছু আচরণের কথা বললেন। সেগুলো নিচে পয়েন্ট আকারে দিলাম।
১ ) টিন এজে বাচ্চারা শিশুকাল ছাড়িয়ে কিশোরকালে পা দেয়। এ রূপান্তর শারীরিক ও মানসিকভাবে খুব কঠিন। তারা চায় বাবা-মা এ কঠিন সময়ে তাদের বন্ধু হবেন। কিন্তু অনেক মা-বাবা ব্যাপারটা না বুঝে উল্টো আচরণ করেন। ফলাফল হচ্ছে- ‘বিদ্রোহ’।
২ ) ওরা কিছু বলতে চাইলেই ধমক দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওদের ভেতরে আগ্নেয়গিরি সৃষ্টি হয়- যা শেষ পর্যন্ত বিস্ফোরণ ঘটায়।
৩ ) তাদের প্রতিটি ভুলের জন্য বাড়িতে আদালত বসানো হয়। তারা তা চায় না- সহমর্মিতা চায়। তা না পেলে তারা বেঁকে বসে। তাই কথায় কথায় বিচার না বসিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভুলগুলো শোধরানোর পথ দেখানো উচিত। বয়সটাই ভুলের- এটা মা-বাবা যত দ্রুত বুঝবেন ততই মঙ্গল।
৪ ) ওরা কোনো সমস্যার কথা বললেই মা-বাবা উপদেশের দীর্ঘ লেকচার দেন। বয়সটা লেকচার সহ্য করার নয়। তারা চায় মা-বাবা সমস্যা শুনবেন। সমাধান দেবেন। কিন্তু লেকচারের জ্বালায় তারা সমস্যার কথা বলাই বন্ধ করে দেয়।
৫ ) তারা প্রশংসা চায়। অনেক বাবা- মা বাচ্চা লাই পাবে ভেবে তা করেন না। ফলে অভিমানের সমুদ্র তৈরি হয়। এ সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য কোনো সেতু নেই।
৬ ) মা- বাবা যখন তাদের বোঝার চেষ্টা করেন না তখন বাইরের কেউ সামান্য সহানুভূতি দেখালে তারা তার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক সময় এভাবেই তাদের জন্য ফাঁদ পাতা হয়।
৭ ) মা-বাবার আরেকটি বড় ভুল হলো- টিন এজারদের শাসন করার জন্য তারা তৃতীয় পক্ষকে টেনে আনেন। এতে ওরা খুব অপমানিত বোধ করে। তাই আরো উদ্ধত হয়ে ওঠে- খুব বাজেভাবে রিয়্যাক্ট করে।
দীর্ঘক্ষণ কথা বলে কবির চৌধুরী থামলেন। তারপর ঝুঁকে এসে বললেন- ‘টিন এজের বাচ্চা মানে বারুদ ঠাসা দেয়াশলাই। একটু ঘষা দেবেন দাউদাউ আগুন জ্বলে উঠবে।’
তিনি দম নিলেন। তারপর হাসতে হাসতে বললেন –
‘A teenager may outgrow your lap, but they never outgrow your love.’
‘ও আপনার কোল ছাড়ে, ভালোবাসা ছাড়ে না….। ওকে ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে রাখলে সমস্যা হবে না।’
আমি ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে আছি, কিন্তু চোখে ভাসছে মেয়ের ছবি। মাথায় ঘুরছে তাঁর শেষ কথাটি-
‘ওকে ভালোবাসা দিয়ে মুড়িয়ে রাখলে সমস্যা হবে না।’
এ জাতীয় আরো খবর...