দেশের প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কাঠামোতে একটি অভাবনীয় এবং যুগান্তকারী পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত প্রথা ভেঙে সংসদ সদস্যদের (এমপি) পকেটে সরাসরি সরকারি উন্নয়নের কোটি কোটি টাকা যাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেছে। নিজ নির্বাচনী এলাকার উন্নয়নের চাবিকাঠি এখন আর এমপিদের একক কর্তৃত্বে থাকছে না। জনপ্রতিনিধিরা আর সরাসরি কোনো থোক বরাদ্দ পাবেন না। তবে এলাকার উন্নয়ন কাজ থেমে থাকবে না; শুধু এর নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ নতুন এবং স্বচ্ছ একটি কাঠামোর অধীনে চলে যাচ্ছে।
আগের নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রতিবছর সরকারের কাছ থেকে সরাসরি একটি বিশাল অঙ্কের নগদ অর্থ পেতেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘থোক বরাদ্দ’ নামেই বেশি পরিচিত। বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সর্বশেষ বাজেটেও প্রতিটি সংসদীয় এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বছরে ৫ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তিনটি জেলাসহ ময়মনসিংহের কিছু অঞ্চল সিটি কর্পোরেশনভুক্ত থাকায় সেখানকার ২০ জন সংসদ সদস্য বাদে বাকি ২৮০ জন এমপি পাঁচ বছরে মোট ২৫ কোটি টাকা করে পাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
এর পেছনের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ যখন প্রথম সরকার গঠন করে, তখন প্রত্যেক সংসদ সদস্য তাদের আসনের উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছরে ১৫ কোটি টাকা করে পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে ২০১৪ ও ২০১৮ সালের মেয়াদে এই বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছিল। সরকারি কোষাগারের এই বিশাল অর্থ দিয়ে এমপিরা তাদের এলাকায় নিজেদের পছন্দমতো সড়ক, সেতু বা অন্যান্য দরকারি স্থাপনা নির্মাণ করতে পারতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই টাকার নিয়ন্ত্রণ এককভাবে এমপিদের হাতে থাকায় প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ ও ঠিকাদারি নিয়োগের ক্ষেত্রে পদে পদে দুর্নীতি, চরম স্বজনপ্রীতি এবং সরকারি অর্থ তছরুপের পাহাড়সম অভিযোগ উঠত।
চলতি অর্থবছরে সেই পুরোনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত খেলার ছক একেবারেই বদলে গেছে। নতুন ও কঠোর নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা কোনো অর্থই নিজেদের ব্যক্তিগত বা স্থানীয় তহবিলে পাবেন না। তারা শুধু কাগজে-কলমে লিখিতভাবে সরকারকে জানাতে পারবেন যে, তাদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নের জন্য ঠিক কী ধরনের কাজ বা প্রকল্প দরকার।
তাহলে এই বিশাল উন্নয়ন বাজেটের টাকা নিয়ন্ত্রণ করবে কে? এখন থেকে এই পুরো বিষয়টি সরাসরি তদারকি করবে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (পিএমও)। এই কাজের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি স্পেশাল বা বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে, যার আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে—‘সংসদ সদস্যের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সেল’। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেলের মূল দায়িত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমির। কোনো কারণে তার অবর্তমানে এই সেলের দায়িত্ব সামলাবেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব।
নতুন এই নিয়মে বরাদ্দ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েকটি ধাপ ও কঠিন শর্তের মধ্য দিয়ে যাবে।
প্রস্তাব জমাদান: প্রথমেই এমপিদের তাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কাজের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ লিখিত প্রস্তাব এই স্পেশাল সেলে জমা দিতে হবে।
কঠোর যাচাই-বাছাই: এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল সেল সেই প্রস্তাবটির যৌক্তিকতা ও প্রয়োজনীয়তা কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করবে।
মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর: প্রস্তাবটি সেলের অনুমোদন পেলে তা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
বাস্তবায়ন: পুরো উদ্যোগটি এরপর আর এমপির হাতে থাকবে না, এটি সরাসরি ওই নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব প্রকল্পের আওতায় সরকারি নিয়মে বাস্তবায়িত হবে।
তবে যেকোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে এমপিদের বেশ কিছু কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। যদি দেখা যায় যে, প্রস্তাবিত এলাকায় অন্য কোনো সরকারি কর্মসূচির আওতায় একই ধরনের কাজ আগে থেকেই চলছে, তবে দ্বৈততা এড়াতে সংসদ সদস্যদের নতুন প্রস্তাব সরাসরি বাতিল বলে গণ্য হবে। এছাড়া, ওই বরাদ্দ পেলে তা দিয়ে আসলেই এলাকার গরিব ও প্রান্তিক মানুষের কোনো লাভ হবে কি না এবং এর মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান বাড়বে কি না—এমন সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের যথার্থ ও সন্তোষজনক উত্তর এমপিদের প্রস্তাবে থাকতে হবে।
প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চরম জবাবদিহির মধ্যে থাকতে হবে। প্রতি মাসের ৫ তারিখের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে কাজের অগ্রগতি ও খরচের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব স্পেশাল সেলে জমা দিতে হবে। প্রকল্প চলাকালীন কোনো ধরনের জটিলতা বা বাধা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি সামাল দেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই স্পেশাল সেল।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এমপিদের নেওয়া কোনো উন্নয়ন উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং তা জনকল্যাণে বড় ভূমিকা রাখে, তবে সেটিকে প্রচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বিশেষ ‘সাকসেস স্টোরি’ বা সাফল্যের গল্প তৈরি করবে। যেখানে ওই প্রকল্পের ইতিবাচক প্রভাব ও ফলাফল দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে।
উন্নয়ন বরাদ্দের পাশাপাশি নতুন সরকারের এমপিদের জন্য আরেকটি বড় নিয়ামক সিদ্ধান্ত হলো বিলাসবহুল শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা বাতিল। দীর্ঘদিন ধরে সংসদ সদস্যরা কোনো প্রকার শুল্ক বা ট্যাক্স ছাড়াই বিদেশ থেকে দামি গাড়ি আনার যে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন, তা আর থাকছে না। এখন থেকে সাধারণ আমজনতার মতোই সংসদ সদস্যদেরও প্রচলিত বাজারদরে এবং নির্ধারিত ট্যাক্স দিয়ে গাড়ি কিনতে হবে। বিএনপির সংসদীয় কমিটি ইতিমধ্যেই এই জনমুখী সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী জাতীয় বাজেটে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ভিআইপি সুবিধা বাতিল করার প্রজ্ঞাপন জারি করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
তথ্যসূত্র: যমুনা নিউজ