সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের রহস্য কী?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

লাতিন আমেরিকার ফুটবল দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাঠের লড়াই শুরুর আগেই বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। পবিত্র ঈদুল আজহা পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটিই প্রধান আলোচনার বিষয়—কবে এবং ঠিক কীভাবে দেশের রাজনীতিতে ফিরছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন দল আওয়ামী লীগ? আগামী ২৩শে জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এই বিশেষ দিনটিকে সামনে রেখে গত কয়েকদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছদ্মবেশে কিংবা হঠাৎ করে ঝটিকা মিছিল ও আকস্মিক ফ্ল্যাশব করার খবর সামনে আসছে। ভোরবেলা বা জনশূন্য সময়ে হঠাৎ ব্যানার নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে দলটির অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এই রাজনৈতিক শোডাউন দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে সশরীরে এই মিছিলগুলো সাধারণ মানুষের চোখে না পড়লেও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলোর ভিডিও এবং ছবি ব্যাপকভাবে প্রচার করে নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই ধরণের বেআইনি ঝটিকা মিছিলের ওপর ভর করে কি আসলেই আওয়ামী লীগের পক্ষে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব, নাকি দলটি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছে?

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু মাঠপর্যায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ৬ই জুন চট্টগ্রামের বন্দর থানাধীন ব্যারাক বিল্ডিং এলাকায় মাথায় সাদা কাপড় বেঁধে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী জড়ো হয়ে একটি মিছিল বের করেন। একই দিন ময়মনসিংহের ভালুকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের জামিরদিয়া এলাকায় সরকারের নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের ব্যানার নিয়ে শতাধিক নেতাকর্মী ঝটিকা মিছিল করার চেষ্টা করেন। এরপর ৮ই জুন ভোরবেলা ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বর এলাকায় জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে আকস্মিক একটি মিছিল বের হয়, যেখান থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম এবং দলীয় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হয়। এছাড়া ৯ই জুন ঢাকার কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা গোপন নাশকতার পরিকল্পনা ও দলগত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য জড়ো হওয়ার চেষ্টা চালান। জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে লালমনিরহাট, শরীয়তপুর, গোপালগঞ্জ ও পটুয়াখালীতেও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একই ধরণের বিচ্ছিন্ন কর্মকাণ্ডের খবর পাওয়া গেছে।

আইনিভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার কারণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। পুলিশ ও যৌথ বাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী আইন এবং নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে একের পর এক মামলা ও গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করছে। সাম্প্রতিক তৎপরতায় চট্টগ্রাম থেকে ১৩ জন, ভালুকায় ৯ জন এবং ঝিনাইদহে ৩ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করা হয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপনে দলীয় প্রচারপত্র তৈরির অভিযোগে এক সাবেক নারী ইউপি সদস্যসহ দুইজনকে এবং যশোরে আওয়ামী লীগের সাবেক এক জেলা সদস্য ও কলেজ শিক্ষককে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দল নিষিদ্ধ হওয়ার পর এভাবে আইন অমান্য করে মিছিল করায় দলটির নেতাকর্মীরা আইনের দৃষ্টিতে নতুন করে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছেন। যদি এই ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে কোনো গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে বর্তমান সরকারের পতন ঘটানো সম্ভব হতো, তবে তা দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ফলপ্রসূ হতো। কিন্তু ভোরবেলা চুপিচুপি করা এই চোরাগোপ্তা মিছিল দিয়ে গণঅভ্যুত্থান কখনোই সম্ভব নয়। ফলে এই কৌশল দলটিকে আরও বড় আইনি বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০০৭ সালের ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সমস্ত রাজনৈতিক কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু সে সময় দলগুলোর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও, রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা সম্পূর্ণ আইনি সীমানার ভেতরে থেকে পার্টি অফিসসহ বিভিন্ন সামাজিক জায়গায় জড়ো হতেন এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দলকে সুসংগঠিত রাখতেন। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আওয়ামী লীগ দলীয় ব্যানারে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড না চালিয়ে সম্পূর্ণ আইনের আওতাভুক্ত থেকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আশ্রয় নিতে পারত। একই সাথে দলটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আইনি সুযোগও ছিল। কিন্তু বড় বাস্তব সংকট হলো, দলটির শীর্ষ থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সমস্ত প্রভাবশালী নেতা বর্তমানে হয় কারাগারে নতুবা দেশ ছেড়ে পলাতক। এই চরম সাংগঠনিক শূন্যতার কারণে আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে দলের পক্ষ থেকে আইনি লড়াই লড়বেন, এমন কোনো দায়িত্বশীল প্রতিনিধি এখন দলটিতে নেই।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ও দলগত কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলেও, দলটির সাবেক সদস্যদের ব্যক্তিগত মৌলিক ও নাগরিক অধিকার—যেমন নাগরিক সুবিধা, চিকিৎসা বা আইনি আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রাষ্ট্র কেড়ে নেয়নি; যদি না তাদের বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের মামলা থাকে। এমনকি তাদের সামাজিক বা সাংস্কৃতিক অধিকারও কেউ কেড়ে নেয়নি। তারা যেকোনো সামাজিক ও পারিবারিক আয়োজনে অংশ নিতে পারেন। এরশাদ আমল কিংবা ১/১১-এর সময়সহ দেশের ইতিহাসে এ পর্যন্ত চারবার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ বা কোণঠাসা করা হয়েছিল। কিন্তু অতীত দিনগুলোতে দলের বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীরা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক চর্চার মাধ্যমে দলীয় মতাদর্শ প্রচার করে দলকে সক্রিয় রেখেছিলেন। বর্তমানে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার অর্থ হলো—দলীয় ব্যানারে কোনো মিছিল, সমাবেশ, লিফলেট বিতরণ, বিবৃতি বা প্রেস রিলিজ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি। এই কারণেই সাম্প্রতিক ঝটিকা মিছিলগুলোর বিরুদ্ধে পুলিশ সরাসরি সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দিচ্ছে। অথচ দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনাও বারবার নেতাকর্মীদের অন্য ব্যানারে বা স্বতন্ত্রভাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সক্রিয় থাকার নির্দেশনা দিয়েছিলেন। এমনকি বর্তমান সরকারের এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডক্টর জায়েদসহ অনেকেই স্পষ্ট করেছেন যে, যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই, তারা চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এতে কোনো আইনি বাধা নেই।

প্রকৃতপক্ষে, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থানের প্রধান বাধা আইনি নিষেধাজ্ঞার চেয়েও তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ ও নৈতিক সংকট। যদি আজ দলটির ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলেও নেওয়া হয়, তবুও কি দেশজুড়ে থাকা প্রায় ২০ হাজার পলাতক নেতা দেশে ফিরে আসার সাহস পাবেন? আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক দল—যেমন জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি বা বিকল্পধারার কার্যক্রম কিন্তু সরকার নিষিদ্ধ করেনি। তা সত্ত্বেও তারা কেন রাজনীতির মাঠে নামতে পারছে না? এর প্রধান কারণ দুটি—প্রথমত, দেশের সাধারণ জনগণ তাদের সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দ্বিতীয়ত, বিগত ১৫ বছরে তাদের করা অভূতপূর্ব দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কারণে তারা নিজেরা এখন জনসম্মুখে যাওয়ার নৈতিক সাহস হারিয়ে ফেলেছেন। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরবর্তী টানা ১০ মাস কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছিল না। কিন্তু সেই দীর্ঘ ১০ মাসে দলটির একজন সাধারণ নেতাকর্মীকেও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় দেখা যায়নি। সুতরাং, নিষিদ্ধ হওয়ার দীর্ঘ ১৩ মাস পর এখন ঝটিকা মিছিল করে পুনরায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার যে স্বপ্ন নেতাকর্মীরা দেখছেন, তার কোনো বাস্তব বা যৌক্তিক ভিত্তি নেই। আওয়ামী লীগকে যদি দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে হয়, তবে তা বেআইনি চোরাগোপ্তা পথে নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়াদ্বারা জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি পন্থায় আসতে হবে। এই ঝটিকা মিছিলের হঠকারী কৌশল দলটির সাংগঠনিক শূন্যতা পূরণ করবে না, বরং তাদের আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে। আর এই আত্মঘাতী পথ পরিবর্তন করতে না পারলে, পৃথিবীর ইতিহাসের বড় বড় রাজনৈতিক শক্তির মতো আওয়ামী লীগও যদি চিরতরে ইতিহাসের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়, তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ ২৪


এ জাতীয় আরো খবর...