সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

সম্পদ ব্যয়ে আখেরাতের সঞ্চয়

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ১৪ জুন, ২০২৬

মানুষের ইহলৌকিক জীবনে ধন-সম্পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং কল্যাণকর এক নেয়ামত। দৈনন্দিন বৈষয়িক চাহিদা পূরণ, পরিবার-পরিজনের সুন্দর রক্ষণাবেক্ষণ, সমাজে আত্মসম্মানের সাথে বসবাস এবং মানবতার কল্যাণে ভূমিকা রাখার জন্য অর্থ-সম্পদের আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। তবে ইসলাম সম্পদকে মানবজীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বা আরাধনা হিসেবে নির্ধারণ করেনি; বরং এটিকে একটি সাময়িক পরীক্ষা ও পবিত্র আমানত হিসেবে বিবেচনা করেছে। একজন মানুষ কীভাবে সম্পদ উপার্জন করছে, কোন খাতে তা ব্যয় করছে এবং সমাজের অনগ্রসর মানুষের প্রতি কতটা উদারতার পরিচয় দিচ্ছে—তার ওপরই নির্ভর করে পরকালীন জীবনের আসল সাফল্য ও মুক্তি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেছেন, “তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কখনো প্রকৃত পুণ্য ও কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমরা তোমাদের প্রিয় বস্তুগুলো থেকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করবে।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৯২)

এই শাশ্বত বাণী মানুষের অন্তরে নিখাদ দানশীলতার যে পবিত্র চেতনা জাগ্রত করে, তা কেবল নিছক অর্থ ব্যয়ের শিক্ষা নয়; বরং মানব হৃদয়ের চিরন্তন কৃপণতা, সংকীর্ণতা ও মোহ দূর করার এক মহৎ আত্মশুদ্ধি। মানুষ স্বভাবগতভাবেই তার কষ্টার্জিত ধন-সম্পত্তি, জমি-জমা, সোনা-দানা কিংবা প্রিয় কোনো বস্তু নিজের কাছে আজীবন আঁকড়ে ধরে রাখতে ভালোবাসে। কিন্তু ঐশী নির্দেশনা অনুযায়ী, আল্লাহর ভালোবাসায় নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই নিহিত রয়েছে জীবনের পরম সার্থকতা।

সম্পদ কুক্ষিগত করার ভয়াবহ পরিণতি ও সামাজিক ভারসাম্য

ইসলামের সুমহান বিধান অনুযায়ী, সম্পদ সঞ্চয় করা বা ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য বৈধ উপায়ে সংরক্ষণ করা কোনো অপরাধ বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়। কিন্তু যখন সেই সঞ্চিত সম্পদ মানুষের হৃদয়কে কঠিন ও মায়াহীন করে তোলে, যখন তা অধিকারবঞ্চিত দরিদ্র মানুষের ন্যায্য পাওনা ভুলিয়ে দেয় এবং মানুষকে চরম আত্মকেন্দ্রিক বানিয়ে ফেলে, তখন সেই ঐশ্বর্যই তার ইহকাল ও পরকালের জন্য ধ্বংসের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পবিত্র কোরআনে সম্পদ জমিয়ে রাখা এবং তা আল্লাহর সৃষ্টিজীবের কল্যাণে ব্যয় না করার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে। আল-কোরআনে এরশাদ হয়েছে, “আর যারা সোনা ও রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ দাও।” (সূরা তাওবা, আয়াত: ৩৪)

ইসলামী অর্থনীতি এমন একটি মানবিক সমাজ বিনির্মাণ করতে চায়, যেখানে রাষ্ট্রের মোট সম্পদ কেবল গুটিকয়েক ধনী ও পুঁজিপতিদের হাতে কুক্ষিগত বা আবর্তিত থাকবে না; বরং তা সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে প্রবহমান থাকবে। এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্যই ইসলামে বাধ্যতামূলকভাবে জাকাত, ফিতরা এবং ঐচ্ছিক হিসেবে সদকা ও ওয়াকফ-এর মতো যুগান্তকারী জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে। এই সব অর্থসামাজিক ব্যবস্থার সুনিপুণ প্রয়োগের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার পর্বতসম বৈষম্য হ্রাস পায়, সমাজে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহমর্মিতা বৃদ্ধি পায় এবং একটি সাম্যবাদী শান্তিময় পরিবেশ তৈরি হয়।

স্থায়ী সম্পদের প্রকৃত সংজ্ঞা ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস

দানশীলতা মুমিনের চরিত্রের এক অনন্য ও সর্বোত্তম ভূষণ। একজন প্রকৃত দানশীল মানুষ নিজের চাহিদার ঊর্ধ্বে উঠে অন্যের দুঃখ-কষ্ট নিজের অন্তরে গভীরভাবে অনুভব করেন। ক্ষুধার্তকে অন্ন দেওয়া, বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান, অসহায়-এতিমদের পাশে দাঁড়ানো, অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং সুযোগবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মূলত মানবতার শ্রেষ্ঠ সেবা সম্পন্ন করেন। এই নিঃস্বার্থ সেবার পুণ্যময় প্রতিদান কেবল এই নশ্বর পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা চিরস্থায়ী আখেরাতের ব্যাংকে পরম সুরক্ষায় সঞ্চিত থাকে।

হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের সম্পদ সম্পর্কে প্রচলিত সংকীর্ণ ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেছেন, “বান্দা সর্বদা বলে—আমার সম্পদ, আমার সম্পদ! অথচ হে মানুষ, তোমার সম্পদের মধ্যে শুধু ততটুকুই তোমার প্রকৃত সম্পদ, যা তুমি খেয়ে শেষ করেছ অথবা যা পরিধান করে পুরনো করেছ কিংবা যা তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করে পরকালের জন্য চিরস্থায়ীভাবে সঞ্চয় করেছ।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৯৫৮)

এই হাদিসটি আমাদের চেনা চিন্তাভাবনাকে এক ধাক্কায় পরিশুদ্ধ করে দেয়। আমরা সাধারণত মনে করি, আমাদের ব্যাংক ব্যালেন্স, প্রাসাদোপম অট্টালিকা, জমি বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগই আমাদের আসল সম্পত্তি। কিন্তু ইসলামের গভীর শিক্ষা হলো, যে অংশটুকু আল্লাহর রাস্তায় অভাবী মানুষের জন্য উৎসর্গ করা হলো, কেবল সেটুকুই মানুষের আসল ও স্থায়ী সম্পদ। এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষ যা কিছু রেখে যাবে, মৃত্যুর পরমুহূর্তেই তা অন্য উত্তরাধিকারীদের মালিকানায় চলে যাবে। কিন্তু আল্লাহর পথে দান করা অংশটুকু পরকালে অক্ষয় পুরস্কার হিসেবে মানুষের নিজের কাছে ফিরে আসবে।

সাহাবিদের গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ও বহুগুণ প্রতিদানের ঐশী ঘোষণা

ইসলামের সোনালী ইতিহাসে দানশীলতার এমন অসংখ্য ও অলৌকিক দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা মানবজাতিকে আজীবন অনুপ্রাণিত করবে। সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের সর্বপ্রিয় সম্পদ উৎসর্গ করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) একাধিকবার দ্বীনের প্রয়োজনে নিজের ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র ও পুঞ্জীভূত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় দান করে দিয়েছিলেন। ইসলামের তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমান জিন্নুরাইন (রা.) মুসলমানদের দুর্ভিক্ষ ও ক্রান্তিকালে নিজের পানির কূপ ও বিপুল ধনভাণ্ডার অকাতরে উৎসর্গ করেছিলেন। একইভাবে হযরত আবু তালহা (রা.) তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় ও মূল্যবান বাগানটি নিঃসংকোচে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

দান মানুষের কলুষিত অন্তরকে অহংকার, লোভ, ও মারাত্মক কৃপণতা থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ পরিশুদ্ধ করে তোলে। সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি মানুষের হৃদয়কে অন্ধ করে দেয়। কিন্তু মানুষ যখন দান করে, তখন সে উপলব্ধি করতে শেখে যে—সম্পদের প্রকৃত ও একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ এবং মানুষ এই ধরাতলে কেবল তাঁর নিয়োজিত সাময়িক আমানতদার ও রক্ষণাবেক্ষণকারী মাত্র।

মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে দানকারীদের দানকে একটি লাভজনক ও নিশ্চিত অবিনাশী বিনিয়োগের সাথে তুলনা করে বহুগুণ প্রতিদানের মহিমান্বিত ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয় এবং প্রতিটি শীষে থাকে একশত দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহে আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন।” (সূরা বাকারা, আয়াত: ২৬১)

এই পরম সত্যটি স্পষ্ট করে যে, দান করলে মানুষের সম্পদ কখনো কমে না বা কোনো ক্ষতি হয় না; বরং এটি হলো পরকালের সবচেয়ে নিশ্চিত ও লাভজনক বিনিয়োগ। পার্থিব যেকোনো ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির চরম আশঙ্কা থাকে, কিন্তু আল্লাহর সাথে করা আধ্যাত্মিক ব্যবসায় লোকসানের কোনো সুযোগ নেই। বর্তমান আধুনিক পৃথিবীতে সম্পদ অর্জনের এক অন্ধ ও অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে। মানুষ আরও ধনী হওয়ার তীব্র নেশায় নিরন্তর ছুটে চলেছে। কিন্তু এই বৈষয়িক প্রতিযোগিতার মাঝেও আমাদের আশপাশে অসংখ্য দরিদ্র, ক্ষুধার্ত, এতিম ও গৃহহীন মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। তাদের প্রতি মানবিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব অবহেলা করে কেবল নিজের ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ানোর চিন্তা কখনোই একজন প্রকৃত মুমিনের আদর্শ হতে পারে না। তাই আসুন, জীবন ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই নিজেদের সম্পদ বিলিয়ে আখেরাতের অক্ষয় ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করি।


এ জাতীয় আরো খবর...