রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে নির্মমভাবে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে নিম্ন আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি—সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের পক্ষে আইনি শুনানির জন্য ‘স্টেট ডিফেন্স’ (রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী) নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ফৌজদারি আইন ও এ সংক্রান্ত মামলায় অভিজ্ঞ একজন আইনজীবীকে এই আসামিদের পক্ষে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দিতে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর উইংকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (১৬ই জুন) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ এই তাৎপর্যপূর্ণ আদেশ দেন। এই বিশেষ বেঞ্চের দৈনিক কার্যতালিকায় (কজ লিস্ট) মামলাটি বর্তমানে শুনানির জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স) এবং আসামিদের জেল আপিল শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথিপত্র ও বিবরণী) সরকারি ছাপাখানা বা বিজি প্রেস থেকে প্রস্তুত হয়ে সুপ্রিম কোর্টে এসে পৌঁছেছে। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের ডেথ রেফারেন্স শাখায় এই পেপারবুকের চূড়ান্ত যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগের প্রক্রিয়াটি শেষ হওয়ার পর যেকোনো দিন হাইকোর্টের এই বিশেষ বেঞ্চে আসামিদের ফাঁসির রায় অনুমোদনের মামলার চূড়ান্ত শুনানি শুরু হবে।
এর আগে, গত ৯ই জুন ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে আসামিদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের মূল নথি (ডেথ রেফারেন্স) হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছিল। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন দুই আসামির ফাঁসির রায়ের নথিতে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষর করার পর তা উচ্চ আদালতে পাঠান। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী, নিম্ন আদালত কোনো মামলায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে তা কার্যকর করার জন্য হাইকোর্ট বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়, যা বিচারিক মহলে ‘ডেথ রেফারেন্স’ মামলা হিসেবে পরিচিত।
গত ৭ই জুন রাজধানীর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে মূল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। আসামিদের সশরীরে উপস্থিতিতে ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন এই চাঞ্চল্যকর রায় ঘোষণা করেছিলেন।
মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত প্রধান আসামি সোহেল রানাকে ৫ লাখ টাকা এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। রায়ে স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, এই অর্থদণ্ডের সম্পূর্ণ টাকা ভুক্তভোগী শিশু রামিসার আইনগত উত্তরাধিকারী বা তার পরিবার পাবে। আসামিরা এই ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে ব্যর্থ হলে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি সরকারি নিলামে বিক্রি করে সেই অর্থ মৃত রামিসার পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত তাঁর রায়ের পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, শিশু রামিসাকে হত্যার আগে তাকে পাশবিকভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল এবং তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখমের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া, গ্রেফতারের পর আসামি সোহেল রানা আদালতে স্বেচ্ছায় ও সজ্ঞানে যে জবানবন্দি বা দোষ স্বীকারোক্তি দিয়েছিল, পরবর্তীতে তা প্রত্যাহারের জন্য আইনি কোনো আবেদন না করায় প্রমাণিত হয় যে সে নিজেই এই জঘন্যতম অপরাধের কথা স্বীকার করেছে। অন্যদিকে, সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না আক্তার অপরাধ সংঘটনে স্বামীকে বাধা বা প্রতিরোধ করার কোনো চেষ্টা তো করেনইনি, উল্টো অপরাধের পর স্বামীকে এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহযোগিতা করেছেন। অপরাধে শরিক থাকা এবং তা প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না রাখায় স্ত্রীকেও সমান অপরাধী হিসেবে গণ্য করে আদালত মৃত্যুদণ্ডের এই কঠোর রায় দেন।