রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

সন্দেহ হলেই তল্লাশি ও গ্রেপ্তার ক্ষমতা পাচ্ছে গোয়েন্দারা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

ডিজিটাল যুগের আধুনিক অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি-ভিত্তিক নিত্যনতুন অপরাধ দমনের নামে দেশে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘বেটিং ও জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬’ শিরোনামের এই নতুন আইনের খসড়ায় অপরাধ দমনের পাশাপাশি এমন কিছু কঠোর আইনি ধারা যুক্ত করা হয়েছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশের আইন, প্রযুক্তি ও মানবাধিকার মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। খসড়া আইনটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জুয়া কিংবা বেটিং সংক্রান্ত অপরাধের সামান্যতম ‘যুক্তিসংগত সন্দেহ’ থাকলেই দেশের নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও কোনো ধরনের পূর্ব অনুমতি বা বিচারিক পরোয়ানা ছাড়াই যেকোনো সময় তল্লাশি চালানো, মালামাল জব্দ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সরাসরি গ্রেপ্তারের অবারিত ক্ষমতা পেতে যাচ্ছে। এই আইনের আওতায় আনা সমস্ত অপরাধকে একই সাথে আমলযোগ্য, সম্পূর্ণ অজামিনযোগ্য এবং কোনো অবস্থাতেই আপস-অযোগ্য করার এক কঠোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা সাধারণ নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট এবং সমন্বিত পরিচয় নজরদারি

নতুন এই আইনের অন্যতম বিতর্কিত ও বহুল আলোচিত দিক হলো খসড়ার ৪৩ ধারায় প্রস্তাবিত ‘জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট’ বা কেন্দ্রীয় কালো তালিকা গঠন। এই নতুন বিধানের আওতায় সন্দেহভাজন জুয়াড়ি বা অনলাইন বেটিংয়ে যুক্ত ব্যক্তিদের সমস্ত ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল সার্ভারে সংরক্ষণ করা হবে। এই তালিকায় একজন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নম্বর, ব্যবহৃত সমস্ত মোবাইল ফোন নম্বর, ব্যাংক হিসাবের তথ্য, মোবাইল ব্যাংকিং বা বিকাশ-রকেটের মতো আর্থিক হিসাব, ডিজিটাল ওয়ালেট, ইন্টারনেট ব্রাউজ করার আইপি ঠিকানা, ব্যবহৃত ডিভাইসের অনন্য নম্বর, ডোমেইন নাম এবং মোবাইল অ্যাপসের যাবতীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে খসড়ায় সবচেয়ে বড় যে ধোঁয়াশা ও ঘাটতি রয়েছে তা হলো, ঠিক কী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বা কার একক সিদ্ধান্তে একজন নাগরিককে এই কালো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে, কত দিন তাকে এই তালিকায় বন্দি রাখা হবে কিংবা কেউ যদি ভুলবশত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে এই তালিকায় ঢুকে যান, তবে তার আইনি প্রতিকার বা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ কী থাকবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়নি। এর সাথে ৪৪ ধারায় এনআইডি, মোবাইল সিম এবং ব্যাংক হিসাবের তথ্য একীভূতভাবে যাচাইয়ের ব্যবস্থার পাশাপাশি ফেশিয়াল রিকগনিশন ও বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের বাধ্যতামূলক সুযোগ রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে একজন মানুষের পরিচয়, দৈনন্দিন যোগাযোগ এবং সমস্ত আর্থিক লেনদেন একই কাঠামোর আওতায় রাষ্ট্র সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে।

ডিপিআই প্রযুক্তি এবং অবিশ্বাস্য জরিমানার বিধান

প্রযুক্তিগত নজরদারিকে এক ভয়ংকর উচ্চতায় নিয়ে যেতে আইনের ৪৭ ধারায় সরকারকে ইন্টারনেটভিত্তিক সমস্ত যোগাযোগ ও তথ্যপ্রবাহ সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ডিপ প্যাকেট ইনস্পেকশন’ (ডিপিআই) এবং উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (AI) প্রযুক্তি ব্যবহারের আইনি ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ডিপিআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে রাষ্ট্র কেবল একজন ব্যক্তি কোন ওয়েবসাইটে যাচ্ছেন তা-ই জানবে না, বরং তার ইন্টারনেট ট্রাফিকের ভেতরে থাকা সমস্ত গোপন বার্তা, ব্যক্তিগত চ্যাট এবং ডাটা সরাসরি বিশ্লেষণ ও পুনরুদ্ধার করতে পারবে, যা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকারকে পুরোপুরি ক্ষুণ্ন করে। এছাড়া বর্তমান সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এ অনলাইন জুয়া পরিচালনা বা প্রচারের জন্য যেখানে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানা বা কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে, সেখানে এই নতুন আইনের খসড়ায় সাজা বহুগুণ বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ১২ বছরের কঠিন কারাদণ্ড এবং অবিশ্বাস্যভাবে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি এই অপরাধগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে ৩৬ ধারায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বিচার ও দণ্ড দেওয়ার বিধানও রাখা হয়েছে। এই আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন যে, দেড়শ বছরের পুরোনো মান্ধাতার আমলের প্রকাশ্য জুয়া আইন দিয়ে বর্তমান সময়ের হাইটেক সাইবার অপরাধ দমন করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। জুয়া ও অনলাইন বেটিং প্রতিরোধে এই যুগোপযোগী আইন প্রণয়নের কাজ এখন একদম শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী সংসদ অধিবেশনেই এটি পাস করার জন্য বিল আকারে পেশ করা হবে।

নজরদারিভিত্তিক রাষ্ট্রকাঠামো গঠনের আশঙ্কা ও বিশেষজ্ঞ প্রতিক্রিয়া

যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে কেবল জুয়াবিরোধী একটি আধুনিক উদ্যোগ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে, তবে খসড়ার ভেতরের ধারাগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেশের প্রযুক্তি গবেষক ও মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও গবেষক আসিফ শাহরিয়ার সুস্মিত এই খসড়া আইনের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন যে, ওপরে-ওপরে এটিকে দেড়শ বছরের পুরোনো ঔপনিবেশিক একটি আইনের আধুনিকায়ন মনে হলেও, ধারা ধরে ধরে পড়লে এর আসল ভিন্ন ও নিবর্তনমূলক রূপটি বেরিয়ে আসে। এটি আদতে জুয়া বা বেটিং দমনের আইন যতটা না, তার চেয়ে অনেক বেশি একটি সর্বগ্রাসী নজরদারি এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নমূলক আইনি কাঠামো মাত্র, যা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধ করতে পারে।

একই সুরে তীব্র ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, অনলাইন ও অফলাইন জুয়া কিংবা বেটিংয়ের মতো অপরাধ প্রতিরোধ ও দমন করা রাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই অপরিহার্য, কিন্তু তাই বলে জুয়া নিয়ন্ত্রণের নামে কোনো প্রকার বিচারিক তদারকি বা আদালতের ওয়ারেন্ট ছাড়া যেকোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত ডিজিটাল ডিভাইসে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের অবারিত ক্ষমতা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এর ফলে দেশে একটি সম্পূর্ণ নজরদারিভিত্তিক স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো তৈরি হবে। এমন কিছু সংস্থাকে এই আইনের মাধ্যমে অবাধ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, যাদের অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের তিক্ত অভিজ্ঞতা দেশের সাধারণ মানুষের রয়েছে। এমনকি বর্তমানে যারা ক্ষমতায় রয়েছেন কিংবা সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সেই সমস্ত political বা রাজনৈতিক দলের অনেক শীর্ষ নেতা-কর্মী এবং খোদ সরকারি কর্মকর্তাদের অনেকেই অতীতে এই সংস্থাগুলোর দ্বারা বিভিন্ন সময় হয়রানি ও নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। তাই এই ভয়ংকর নিবর্তনমূলক খসড়াটি সংসদে বিল আকারে উত্থাপনের আগে এর সমস্ত বিতর্কিত ধারাগুলোর উপযুক্ত সংশোধন করা উচিত এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজন, আইনজীবী ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সরাসরি অংশগ্রহণে পর্যাপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে একটি সামঞ্জস্যপূর্ণ আইন তৈরি করা সময়ের দাবি।

তথ্যসূত্র: আজকের প্রত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...