রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:১৭ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বিদ্যমান সৌহার্দ্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত এবং বহুমাত্রিক করতে এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান আজ শনিবার রাজধানী ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাতে মিলিত হন। অত্যন্ত আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নতুন সরকারের অধীনে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির এই অগ্রযাত্রায় তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।

দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আলোচনা

শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়ে গণমাধ্যমকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী। তিনি জানান, বৈঠকে উভয় নেতা বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং প্রযুক্তিগত ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আগামী দিনে কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, সে বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে বাংলাদেশে স্বাগত জানিয়ে বলেন, তুরস্ক সর্বদাই বাংলাদেশের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু এবং উন্নয়ন অংশীদার। আগামী দিনগুলোতে দুই দেশের এই যৌথ প্রয়াস আরও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

উচ্চপর্যায়ের এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে আরও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা এম হুমায়ুন কবির এবং বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ। তুর্কি প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিভিন্ন সংস্কারমুখী উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক দূরদর্শিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সংকটগুলোতে আঙ্কারা সর্বদাই ঢাকার পাশে থাকবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে তুরস্কের ভূমিকা ও কক্সবাজার সফর

এই কূটনৈতিক সফরের অন্যতম প্রধান ও সংবেদনশীল এজেন্ডা ছিল বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ ফিলিস্তিনি ও রোহিঙ্গা শরণার্থীর মানবিক সংকট। তিন দিনের এই সংক্ষিপ্ত সফরের অংশ হিসেবে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শুক্রবার সরাসরি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পগুলো পরিদর্শনে যান। সেখানে তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বর্তমান যাপনচিত্র, তাঁদের মৌলিক চাহিদার অপ্রতুলতা এবং সার্বিক মানবিক পরিস্থিতি সরজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন।

কক্সবাজার সফরকালে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা এবং বাংলাদেশের স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও মতবিনিময় করেন। রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে শুক্রবার রাতেই তিনি পুনরায় বিশেষ বিমানে ঢাকায় ফিরে আসেন। উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকটের শুরু থেকেই তুরস্ক আন্তর্জাতিক মহলে ফিলিস্তিনিদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের অধিকার রক্ষায় সবচেয়ে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছে। তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট এবং দেশটির বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ক্যাম্পে হাসপাতাল ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে হাকান ফিদান স্পষ্ট করেছেন যে, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক চাপ বজায় রাখতে তুরস্ক তার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে।

সিউল থেকে ঢাকা: তিন দিনের সংক্ষিপ্ত ও ঠাসা সফর

তুর্কি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের এই বাংলাদেশ সফরটি ছিল কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত ব্যস্ত ও ঠাসা কর্মসূচিতে ভরা। দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর শেষ করে গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি একটি বিশেষ ফ্লাইটে সরাসরি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। বিমানবন্দরে তাঁকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উষ্ম অভ্যর্থনা জানানো হয়। সফরের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ গতকাল শুক্রবার সকালে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে (FOC) অংশ নেন। সেই বৈঠকেও দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে যৌথ অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আজ শনিবার দুপুরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই চূড়ান্ত সৌজন্য সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে তাঁর তিন দিনের সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত সফল এই সফরের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটছে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এই নতুন সমীকরণকে বিদায় জানিয়ে আজ বিকেলেই তুরস্কের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে দেশটির এই প্রভাবশালী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্যিক ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে এক নতুন গতিশীলতা পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


এ জাতীয় আরো খবর...