রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:১৯ পূর্বাহ্ন

বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। প্রান্তিক মানুষের প্রাথমিক ও সার্বিক চিকিৎসাসেবা একেবারে সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় অত্যন্ত সহজে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় নিয়ে এক মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার। জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতিতে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে স্থানান্তরের দীর্ঘদিনের সংকট দূর করতে এবার সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স দেশেই উৎপাদনের বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। আজ শনিবার দুপুরে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এই যুগান্তকারী ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নিয়ে এক উচ্চपर্যায়ের বিশেষ নীতি-নির্ধারণী সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ সভায় দেশীয় প্রযুক্তিতে উন্নত মানের বৈদ্যুতিক অ্যাম্বুলেন্স তৈরির নানাদিক, এর বাস্তবায়ন কৌশল এবং কারিগরি সক্ষমতা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সভা শেষে প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু গণমাধ্যমকে এই বিশেষ সভার মূল সিদ্ধান্ত ও সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করেন। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে জানান যে, দেশের সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে এবং স্বাস্থ্য খাতের পরিকাঠামোগত আমূল পরিবর্তন আনতে এই নতুন উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

পাইলট প্রকল্প এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু সরকারের এই নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক রোডম্যাপ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী প্রকল্পটি একবারে পুরো দেশে চালু না করে, শুরুতে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও পরিকল্পিত উপায়ে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হবে। সেই লক্ষ্যে দেশের যেকোনো একটি উপযুক্ত উপজেলাকে প্রথম দফায় ‘মডেল উপজেলা’ হিসেবে নির্বাচন করা হবে এবং সেখানে এই দেশীয় বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স সেবার প্রথম পাইলট প্রকল্পের কাজ শুরু করা হবে। প্রাথমিক এই মডেল প্রকল্পের সফলতা, চ্যালেঞ্জ এবং মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করার পর তা পর্যায়ক্রমে সারা দেশের অন্যান্য সমস্ত উপজেলা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হবে। সরকারের এই মহতী ও সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ যদি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে অ্যাম্বুলেন্সের দীর্ঘদিনের যে বিশাল ঘাটতি রয়েছে, তা খুব সহজেই নিজস্ব উৎপাদনের মাধ্যমে পূরণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে চিকিৎসা খাতের সবচেয়ে বড় একটি ব্যয়বহুল ক্ষেত্র অর্থাৎ সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর বিলাসী অ্যাম্বুলেন্স ক্রয়ের প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও প্রযুক্তির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

তিন স্তরের সমন্বিত জরুরি রোগী পরিবহন নেটওয়ার্ক

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এই বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্স প্রকল্পটি কেবল একটি সাধারণ গাড়ি তৈরির পরিকল্পনা নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থার একটি ত্রিমাত্রিক ও সমন্বিত দূরদর্শী নেটওয়ার্ক। সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনা করে মোট তিনটি সুনির্দিষ্ট স্তরে বা পর্যায়ে এই জরুরি সেবা দেওয়ার জন্য একটি মহাপরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এই বিশেষ পরিকল্পনার মূল ভিত্তি হলো গ্রামীণ পর্যায় থেকে শুরু করে দেশের সর্বোচ্চ চিকিৎসা কেন্দ্র বা রাজধানী পর্যন্ত রোগীদের একটি অবিচ্ছিন্ন ও নিরাপদ চেইন তৈরি করা। প্রথম স্তরে দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে রোগীদের নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করা হবে। দ্বিতীয় স্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তুলনামূলক জটিল রোগীদের জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য শক্তিশালী ও মাঝারি পাল্লার অ্যাম্বুলেন্স ডিজাইন করা হবে। আর সর্বশেষ বা তৃতীয় স্তরে জেলা পর্যায় থেকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় থাকা রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য বিভাগীয় শহর কিংবা খোদ রাজধানী ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে দ্রুত ও নিরাপদে নিয়ে আসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে সক্ষম উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন দ্রুতগতির বৈদ্যুতিক অ্যাম্বুলেন্স তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

কারিগরি নকশা ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব

উচ্চপর্যায়ের এই বিশেষ সভায় দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা অংশ নিয়ে এই প্রকল্পের কারিগরি ও ব্যবহারিক দিকগুলো তুলে ধরেন। প্রেস উইংয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সভায় উপস্থিত কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন যে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হতে যাওয়া এই বিদ্যুৎচালিত অ্যাম্বুলেন্সগুলো কেবল সাধারণ কোনো যাত্রীবাহী যান হবে না, বরং এগুলো হবে চলন্ত একেকটি মিনি লাইফ-সাপোর্ট ইউনিট। এই বিশেষ অ্যাম্বুলেন্সগুলোর ভেতরে আধুনিক ও জরুরি চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় সমস্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম, উন্নত মানের সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্ট ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক ও জরুরি জীবন রক্ষাকারী সেবার জন্য বিভিন্ন ধরনের আধুনিক ডিজিটাল ও অ্যানালগ সুযোগ-সুবিধা প্রথম থেকেই স্থায়ীভাবে বা ডিফল্ট আকারে সংযোজন করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, আমাদের দেশের বৈচিত্র্যময় ভৌগোলিক অবস্থান, গ্রামীণ কাঁচা-পাকা রাস্তার বর্তমান পরিস্থিতি এবং বর্ষা বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র গভীরভাবে বিবেচনা ও মাথায় রেখেই এই যানবাহনগুলোর চ্যাসিস ও বডির মূল ডিজাইন চূড়ান্ত করা হবে। এর ফলে দেশের যেকোনো অঞ্চলের আঁকাবাঁকা ও দুর্গম পথেই এই পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক অ্যাম্বুলেন্সগুলো অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে রোগী পরিবহন করতে সক্ষম হবে, যা দেশের সামগ্রিক জরুরি রোগী পরিবহন ব্যবস্থাকে এক অনন্য আধুনিক উচ্চতায় নিয়ে যাবে। একই সাথে এটি অত্যন্ত কম পরিচালন ও জ্বালানি খরচে সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে আধুনিক সুযোগ-সম্পন্ন জরুরি সেবা নিশ্চিত করবে।

শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও বুয়েট বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত যৌথ প্রয়াস

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই অতীব গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী সভায় সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সচিব এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষায়িত শিক্ষকেরা উপস্থিত থেকে তাঁদের মূল্যবান মতামত ও কারিগরি দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। সভায় অন্যান্যদের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বর্তমান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস এম জিয়াউদ্দিনু হায়দার। এছাড়া প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক সমন্বয় নিশ্চিত করতে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী। এই প্রকল্পের মূল কারিগরি ও প্রযুক্তিগত ভিত্তি তৈরি করতে এবং এর সফল ডিজাইনের রূপরেখা দিতে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একদল প্রখ্যাত ও অভিজ্ঞ শিক্ষক সভায় অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ এহসান, অধ্যাপক জিয়াউর রহমান, অধ্যাপক আবদুল সালাম আখন্দ এবং অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলমসহ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। এই যৌথ ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, সরকার দেশের মেধা ও দেশীয় প্রযুক্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে একটি স্বাবলম্বী, আধুনিক ও জনবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর।


এ জাতীয় আরো খবর...