রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১২:২০ পূর্বাহ্ন

ঈদের ছুটিতে চাকরি হারালেন ১,৮৬৮ পোশাক শ্রমিক, পাওনার দাবিতে বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ২ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬

পবিত্র ঈদুল আজহার অনাবিল আনন্দ ভাগাভাগি করতে সাভারের কর্মব্যস্ত জীবন ছেড়ে ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় নিজের প্রত্যন্ত গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন তৈরি পোশাক কারখানার সাধারণ শ্রমিক হাসনা হেনা। তবে উৎসবের আমেজ কাটতে না কাটতেই তাঁর মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে একটি খুদে বার্তা (এসএমএস)। কারখানার মানবসম্পদ বিভাগ থেকে পাঠানো ওই একটিমাত্র যান্ত্রিক বার্তা মুহূর্তের মধ্যে হাসনা হেনার সমস্ত খুশিকে এক গভীর বিষাদ ও চরম অনিশ্চয়তায় রূপান্তর করে দেয়। বাংলাদেশ শ্রম আইনের ২০ ধারা উল্লেখ করে পাঠানো ওই বার্তায় জানানো হয়, তাঁকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। কেবল হাসনা হেনাই নন, সাভার ও আশুলিয়ার তৈরি পোশাক খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান আল-মুসলিম গ্রুপের মোট ১ হাজার ৮৬৭ জন শ্রমিক ও স্টাফের ভাগ্য একই খুদে বার্তার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়ে গেছে। উৎসবের ছুটির মধ্যে এমন আকস্মিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত দুঃসংবাদ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করেছে। ছুটি শেষে শনিবার (৬ জুন) বছরের প্রথম কর্মদিবসে যখন এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিক নতুন উদ্যেগে কাজ করার আশায় কারখানার প্রধান ফটকে এসে জড়ো হন, তখন ভেতরে প্রবেশ করতে না পেরে তাঁরা বুঝতে পারেন যে মোবাইল ফোনের ওই নির্মম বার্তাই ছিল তাঁদের জীবনের রূঢ় বাস্তবতা।

রাজপথে শ্রমিকদের ক্ষোভ ও মহাসড়ক অবরোধ

হঠাৎ করে চাকরি হারানোর এই ধাক্কা এবং কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে উলাইল এলাকার সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। কর্মস্থলে প্রবেশের অধিকার এবং নিজেদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের দাবিতে সকাল ৯টার দিকে শত শত শ্রমিক উলাইল এলাকায় একজোট হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে উত্তেজিত শ্রমিকেরা ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ঢাকাগামী লোকাল লেনটি সম্পূর্ণ অবরোধ করে ফেলেন। উত্তরবঙ্গের সাথে রাজধানীর যোগাযোগের এই অন্যতম প্রধান ধমনীটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে মহাসড়কের একপাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। সকালের ব্যস্ত সময়ে শত শত যানবাহন আটকা পড়ায় সাধারণ যাত্রী, চাকুরিজীবী এবং দূরপাল্লার চালকেরা চরম ভোগান্তির মুখোমুখি হন। পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় সাভার মডেল থানা পুলিশ এবং শিল্প পুলিশের বিশাল একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছায়। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুব্ধ শ্রমিকদের সাথে কথা বলেন, তাঁদের আশ্বস্ত করেন এবং সড়ক ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান। অবশেষে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্বাসের ওপর আস্থা রেখে প্রায় এক ঘণ্টা পর, সকাল ১০টার দিকে শ্রমিকেরা মহাসড়ক থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নিলে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং পুনরায় যান চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করে।

আইনপ্রয়োগের আইনি বিতর্ক: ধারা ২০ বনাম ধারা ২৬

এই গণছাঁটাইয়ের নেপথ্যে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের মধ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইনের ধারা প্রয়োগ নিয়ে এক সুদূরপ্রসারী আইনি ও আর্থিক দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। আন্দোলনরত শ্রমিক এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের মূল অভিযোগ হলো, কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে শ্রম আইনের ২৬ ধারাকে পাশ কাটিয়ে ২০ ধারা প্রয়োগ করেছে। শ্রম আইনের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২৬ ধারায় কোনো শ্রমিককে সাধারণ চাকরি থেকে অব্যাহতি দিতে হলে তাঁর দীর্ঘদিনের চাকরির বয়স বিবেচনা করে প্রতি বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট গ্র্যাচুইটি, তিন মাসের অগ্রিম নোটিশের সমপরিমাণ বেতন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০ ধারা অর্থাৎ ‘ছাঁটাই’ (Retrenchment) বা উদ্বৃত্ত জনবল কমানোর আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের একটি বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার পাঁয়তারা করছে।

কারখানার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ অপারেটর সাগরিকা বেগম নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, তিনি ২০১৭ সাল থেকে এই গ্রুপে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে কাজ করে আসছিলেন। আইন অনুযায়ী ২৬ ধারায় তাঁর প্রাপ্য হিসাব করা হলে তিনি ৯ বছরের চাকরির জন্য ৯টি মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থসহ অন্যান্য বড় অঙ্কের আর্থিক সুবিধা পেতেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কোনো আগাম নোটিশ বা আলোচনা ছাড়াই মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ ‘বিকাশ’-এর মাধ্যমে তাঁর অ্যাকাউন্টে মাত্র ১ লাখ ৩ হাজার টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে, যার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব বা ব্রেকডাউন তাঁকে দেওয়া হয়নি। একইভাবে মাত্র দেড় বছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়া মাহতাব হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, কোনো কারণ বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই তাঁদের এভাবে ছুটির দিনে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অন্যায্য।

মালিকপক্ষের সাফাই ও ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যান

এদিকে, আল-মুসলিম গ্রুপের উচ্চপদস্থ management বা কর্তৃপক্ষ এই ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অত্যন্ত জরুরি ব্যবসায়িক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দাবি করেছে। গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান গণমাধ্যমকে জানান, বিশ্বব্যাপী চলমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক ক্রয়াদেশ বা অর্ডার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ার কারণে কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং আর্থিক বড় বিপর্যয় এড়াতেই এই অতিরিক্ত জনবল কমানোর কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আল-মুসলিম গ্রুপের অধীনে থাকা তিনটি প্রধান কারখানায় বর্তমানে মোট ১৬ হাজার ২০০ শ্রমিক এবং ১০ হাজার ৮০০ স্টাফ কর্মরত আছেন, যার মধ্য থেকে ১ হাজার ৮৬৮ জনকে ছাঁটাইয়ের আওতায় আনা হয়েছে। কারখানাভিত্তিক তথ্যানুযায়ী, উলাইল এলাকার একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে সবচেয়ে বেশি অর্থাৎ ১ হাজার ২৮৬ জন, রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিনস ওয়্যার থেকে ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে ৫৩ জন শ্রমিক ও স্টাফকে এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে মালিকপক্ষের দাবি, তারা শ্রম আইনের ২০ ধারা মেনেই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের সমস্ত আইনগত পাওনা ও বকেয়া অর্থ ছুটির মধ্যেই বিকাশের মাধ্যমে সম্পূর্ণ পরিশোধ করেছে।

সমাধান ও সুষ্ঠু তদন্তের আশ্বাস

এই বিষয়ে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন অত্যন্ত জোরালো আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন, শ্রম আইনের ২০ ধারা কেবল সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত বা শিক্ষানবিস শ্রমিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়া যৌক্তিক। কিন্তু যারা বছরের পর বছর কারখানায় রক্ত পানি করে কাজ করে আসছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে অবশ্যই ২৬ ধারা প্রয়োগ করতে হবে এবং আল-মুসলিম গ্রুপ যেভাবে ছুটির মধ্যে খুদে বার্তায় এই কাজ করেছে, তা শ্রম আইনের মূল চেতনার পরিপন্থী।

অন্যদিকে, শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সৈয়দ ফয়ছল ইসলাম জানিয়েছেন, শ্রমিকদের প্রতিটি অভিযোগ এবং আর্থিক হিসাবের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, যদি মালিকপক্ষের হিসাব-নিকাশে বা পাওনা পরিশোধে কোনো ধরনের ভুলত্রুটি বা আইনি ব্যত্যয় পাওয়া যায়, তবে পুলিশ ও শ্রম অধিদপ্তর যৌথভাবে মধ্যস্থতা করে মালিকপক্ষকে দিয়ে আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের সম্পূর্ণ বকেয়া ও পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবে, যাতে কোনো শ্রমিকের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...