হৃদরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হার্টের রিং বা করোনারি স্টেন্টের দাম ৫ থেকে ১৯ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সরকারি সিদ্ধান্ত গত তিন মাসেও বাস্তবায়ন করা যায়নি। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ১১টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের ২৮ ধরনের রিংয়ের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য কমিয়ে নির্দেশনা জারি করলেও রোগীরা এখনো আগের উচ্চমূল্যেই তা কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে ব্যয়বহুল এই চিকিৎসায় সাধারণ মানুষের জন্য যে স্বস্তির আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সভার পর সরকার এই নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছিল। তবে আমদানিকারকদের সংগঠন ‘মেডিকেল ডিভাইস ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর অভিযোগ, এই মূল্য নির্ধারণ যৌক্তিকভাবে করা হয়নি। নতুন দাম পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়ে তাদের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়ার পর গত ১৩ মে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর আবারও বৈঠকে বসে। সেখানে মাত্র দুটি রিংয়ের দাম সামান্য পুনর্বিবেচনা করা হলেও বাকিগুলোর দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। সাধারণত জনস্বার্থে এ ধরনের প্রজ্ঞাপন জাতীয় পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও এবার তা করা হয়নি, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ নিজস্বভাবে কোনো স্টেন্ট বা রিং উৎপাদন করে না। দেশের ৩১টি নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, চীন, কোরিয়া ও ভারত থেকে এগুলো আমদানি করে থাকে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ৮৫ জন রোগীর শরীরে এই স্টেন্ট বসানো হয়।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের আমদানিকৃত ২৮ ধরনের রিংয়ের আগের দাম এবং সংশোধিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
| আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান | স্টেন্ট/রিংয়ের নাম ও উৎপাদক দেশ | পূর্ববর্তী মূল্য (টাকা) | নতুন নির্ধারিত মূল্য (টাকা) |
|---|---|---|---|
| মেসার্স অ্যালায়েন্স মেডিকেল | ম্যাগমা (জার্মানি) | ৩৭,০০০ | ৩০,০০০ |
| মেসার্স অ্যালায়েন্স মেডিকেল | সুনা স্টেন্ট ডেলিভারি সিস্টেম (জার্মানি) | ১৪,০০০ | ১৪,০০০ (অপরিবর্তিত) |
| মেসার্স কার্ডিনাল হেলথকেয়ার | জেনস ডিইএস (দক্ষিণ কোরিয়া) | ৫৬,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স কার্ডিনাল হেলথকেয়ার | জেনএক্সসিঙ্ক সিরোলিমাস | ৫০,০০০ | ৪৮,০০০ |
| মেসার্স কার্ডিওড | লিমাস ট্র্যাক | ৫৫,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স ডেলটা লিমিটেড | লিমাস ট্র্যাক | ৬০,০০০ | ৫৫,০০০ |
| মেসার্স এপিক টেকনোলজিস | ইউকন চয়েস পিসি | ৫৩,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স জেনেভিক হেলথ লিমিটেড | আইএইচটি ডেসটিনি বিডির | ৫৫,০০০ | ৫২,০০০ |
| মেসার্স হার্ট কোয়েক লিমিটেড | ইউকা লিমাসের | ৫৬,০০০ | ৫৩,০০০ |
| মেসার্স দ্য হার্ট বিট | আইভাসকুলার অ্যাঞ্জিওলাইটের | ৬২,০০০ | ৫৮,০০০ |
| মেসার্স দ্য হার্ট বিট | ইনস্পিরন | ৫৫,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স লাইফলাইন ইন্টারন্যাশনালের | বায়ো-ইঞ্জিনিয়ারড | ৫৬,০০০ | ৫৩,০০০ |
| মেসার্স মেরিল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড | মেটাফর | ৪০,০০০ | ৩৮,০০০ |
| মেসার্স মেরিল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড | এভারমাইন ৫০ | ৫০,০০০ | ৪৭,০০০ |
| মেসার্স মেরিল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড | বায়োমাইম মর্ফ | ৫০,০০০ | ৪৮,০০০ |
| মেসার্স মেরিল বাংলাদেশ প্রাইভেট লিমিটেড | বায়োমাইম (অন্যান্য) | ৪৫,০০০ | ৪২,০০০ |
| মেসার্স মেডিবাড ইন্টারন্যাশনালের | সিনসিরো প্রোর | ৬০,০০০ | ৫৬,০০০ |
| মেসার্স এমটেক মেডিকেল সল্যুশন | কোরোফ্লেক্স | ৫৫,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স অ্যাডভান্সড মেডিটেক | অ্যালেক্স প্লাস, অ্যালেক্স ও অ্যাবারিস (পোল্যান্ড) | ৬০,০০০ | ৫৭,০০০ (প্রতিটি) |
| মেসার্স এশিয়া交通ফিক মেডিকেলস লিমিটেড | কোরোফ্লেক্স আইএসএআর নিও (জার্মানি) | ৫৫,০০০ | ৫২,০০০ |
| মেসার্স এশিয়া প্যাসিফিক মেডিকেলস লিমিটেড | কোরোফ্লেক্স আইএসএআর (জার্মানি) | ৫৩,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স অ্যালায়েন্স মেডিকেলের | অ্যামাজোনিয়া সির (ফ্রান্স) | ৫৩,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স বায়োভাসকুলার ইন্টারন্যাশনালের | সিআরই-৮ (ইতালি) | ৫৬,০০০ | ৫০,০০০ |
| মেসার্স বিজনেসের | ডাইরেক্ট স্টেন্ট সিরো | ৬৬,০০০ | ৬২,০০০ |
| মেসার্স কার্ডিয়াক সল্যুশন লিমিটেড | অরসিরো | ৬৩,০০০ | ৬০,০০০ |
| মেসার্স কার্ডিয়াক সল্যুশন লিমিটেড | অরসিরো মিশন | ৬৮,০০০ | ৬৫,০০০ |
নতুন নির্দেশনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর রিং আমদানির ক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে:
প্রতিটি রিংয়ের মোড়কের ওপর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP), উৎপাদনকারী দেশ, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং ডিএআর (DAR) নম্বর স্পষ্টভাবে সিলমোহর আকারে উল্লেখ থাকতে হবে।
বিদেশ থেকে আমদানির পর বাজারে বা হাসপাতালে সরবরাহ করার আগে বাধ্যতামূলকভাবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর থেকে প্রতিটি চালানের ছাড়পত্র বা ক্লিয়ারেন্স নিতে হবে।
বর্তমানে দেশের প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে রক্তনালিতে সাধারণ রিংয়ের পরিবর্তে ওষুধের প্রলেপযুক্ত ‘মেডিকেটেড স্টেন্ট’ বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ঢাকার সরকারি-বেসরকারি ২০টিরও বেশি হাসপাতালসহ চট্টগ্রাম, সিলেট, দিনাজপুর, খুলনা, সিরাজগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বগুড়া ও কুমিল্লার নির্দিষ্ট কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে এই চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়ে থাকে।
সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় চিকিৎসকমহল তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অন্যদিকে আমদানিকারকরা তাদের পলিসিগত সংকটের কথা তুলে ধরেছেন।
“চার মাস আগে দাম কমানোর সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা সত্ত্বেও কেন এটি এখনো কার্যকর হলো না, তা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। দেশের শক্তিশালী ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সাধারণ হৃদরোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।”
— অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী, পরিচালক, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (এনআইসিভিডি)।
“আমাদের সাথে কোনো ধরনের আলোচনা বা অংশীজন বৈঠক না করেই হঠাৎ এই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বছর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ছাড়া এভাবে দাম কমানো হলে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে ডিভাইস এনে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। জনস্বার্থের কথা বলা হলেও এখানে প্রকৃত ব্যবসায়িক বাস্তবতাকে আমলে নেওয়া হয়নি।”
— ওয়াসিম আহমদ, সভাপতি, মেডিকেল Device ইম্পোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ড. আখতার হোসেন জানান, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দ্রুত নতুন দাম কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। হাসপাতালগুলোর নোটিশ বোর্ডেও দামের তালিকা টানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়মের লিখিত অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়ে জানিয়েছেন, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য রাখা হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তথ্যসূত্র: সমকাল