বাংলাদেশ পুলিশের মাঠপর্যায়ের সদস্যদের চেনা অবয়ব ও চিরাচরিত পোশাকে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী ইউনিফর্মের খোলস ভেঙে বাহিনীর সদস্যদের জন্য সম্পূর্ণ নতুন রঙের ড্রেস কোড নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্যে ‘পুলিশ ড্রেস রুলস, ২০২৫’ সংশোধন করে একটি নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। নতুন এই সংশোধনী ও আইনি নীতিমালার আলোকে এখন থেকে জেলা পুলিশ এবং বিভিন্ন মহানগর (মেট্রোপলিটন) পুলিশের পোশাকে রঙের ক্ষেত্রে স্পষ্ট ভিন্নতা ও দৃশ্যমান বৈচিত্র্য আনা হয়েছে, যা বাহিনীর সামগ্রিক কার্যক্রমে এক নতুন পেশাদারিত্বের ছোঁয়া দেবে।
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ১২ ধারায় দেওয়া আইনি ক্ষমতা অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এই বিশেষ ও যুগোপযোগী সংশোধনী প্রজ্ঞাপনটি জারি করেন। এই প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও সাধারণ সদস্যদের মাঝে নতুন পোশাক নিয়ে এক ধরনের কৌতূহল ও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। নতুন এই পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ে দীর্ঘদিনের চেনা ‘আয়রন’ রঙের পোশাকের অধ্যায়টির আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, পূর্বে নির্ধারিত ‘আয়রন’ রঙের শার্টের পরিবর্তে এখন থেকে দেশের সব জেলা পুলিশ ও সাধারণ অন্যান্য ইউনিটের সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল (ডিপ ব্লু) রঙের টিসি (সাধারণ বুননের) কাপড়ের শার্ট চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে বিভাগীয় ও মহানগর বা মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্ষেত্রে এই নিয়মে কিছুটা ভিন্নতা রাখা হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন শার্টের রং হবে হালকা জলপাই (লাইট অলিভ)। এর ফলে সাধারণ মানুষ দূর থেকেই পোশাকের রং দেখে বুঝতে পারবেন কোন সদস্য জেলা পুলিশের আর কে মহানগর পুলিশের দায়িত্বে রয়েছেন।
শার্টের পাশাপাশি প্যান্ট বা ট্রাউজারের ক্ষেত্রেও একটি বড় ও অভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর আগে কফি (শেইল) রঙের ট্রাউজার বা প্যান্ট ব্যবহার করা হলেও নতুন নিয়মে তার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো হয়েছে। এখন থেকে পুলিশের সব ইউনিটের সদস্যদের জন্যই খাকি রঙের ট্রাউজার পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ জেলা কিংবা মহানগর—সব পুলিশের প্যান্টের রং হবে খাকি, তবে শার্টের রঙের ক্ষেত্রে আগের মতো অভিন্নতা থাকছে না।
বাংলাদেশে ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার তারতম্যের কারণে পুলিশ সদস্যদের জন্য আলাদা শীতকালীন পোশাকের ব্যবস্থা রয়েছে। নতুন সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী শীতকালীন কাপড়ের রঙের ক্ষেত্রেও বড় আধুনিকায়ন করা হয়েছে। পূর্বে নির্ধারিত আয়রন রঙের জ্যাকেট, জার্সি, কার্ডিগান ও পুলওভারের সম্পূর্ণ অবসান ঘটিয়ে এখন থেকে গাঢ় নীল রঙের আকর্ষণীয় শীতকালীন পোশাক ব্যবহার করা হবে। তবে শার্টের মতো এখানেও মহানগর পুলিশের ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রমী নিয়ম রাখা হয়েছে। মেট্রোপলিটন পুলিশের জ্যাকেটের রং তাদের নিয়মিত পোশাকের রঙের সাথে মিল বা সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে লাইট অলিভ।
বর্তমান পুলিশ বাহিনীতে নারী পুলিশ সদস্যদের সংখ্যার পাশাপাশি তাঁদের কাজের পরিধিও অনেক বেড়েছে। তাই নারী সদস্যদের কর্মক্ষেত্রের স্বাচ্ছন্দ্য, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পেশাদারিত্বের কথা বিবেচনা করে শাড়ি, ব্লাউজ ও পোশাকের হাতার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নতুন নিয়ম চূড়ান্ত করা হয়েছে:
জেলা পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিট: জেলা ও সাধারণ ইউনিটে কর্মরত নারী সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল রঙের শাড়ি এবং তার সাথে ম্যাচিং করা গাঢ় নীল ব্লাউজ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই নিয়মের বাইরে থাকবে পুলিশের বিশেষায়িত কিছু ইউনিট যেমন—আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (APBn), বিশেষায়িত পুলিশ ব্যাটালিয়ন (SPBn), স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB), অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (RAB)।
মহানগর পুলিশ: দেশের বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকায় কর্মরত নারী সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল রঙের শাড়ির সাথে পরতে হবে লাইট অলিভ রঙের ব্লাউজ।
পোশাকের হাতায় বিশেষ ছাড়: নতুন বিধানে সাধারণ সদস্যদের জন্য গ্রীষ্মকালে অর্ধহাতা (হাফ স্লিভ) এবং শীতকালে পূর্ণহাতা (ফুল স্লিভ) শার্ট পরার নিয়ম বহাল রাখা হলেও নারী সদস্যদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ট্রাফিক ইউনিটে কর্মরত অথবা নিজস্ব পছন্দে মাথা ঢাকতে (হিজাব ব্যবহার করতে) ইচ্ছুক নারী পুলিশ সদস্যরা চাইলে গরমের দিনসহ সারা বছরই ফুল স্লিভ শার্ট বা ব্লাউজ পরিধান করতে পারবেন।
হেড কভার: ডিউটি বা প্যারেডের সময় নারী সদস্যদের জন্য অনুমোদিত ও নির্ধারিত গাঢ় নীল রঙের হেড কভার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয়, ঐতিহাসিক ও মানবিক সিদ্ধান্ত যুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্যরা তাঁদের শারীরিক অবস্থা, সন্তান ও নিজের সার্বিক সুরক্ষার কথা বিবেচনা করে একটি বিশেষ সুবিধা পাবেন। তাঁরা সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানের পূর্বանুমতি সাপেক্ষে ডিউটির সময় যেকোনো ধরনের সাধারণ ও শালীন পোশাক (সিভিল ড্রেস) পরিধান করে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। পুলিশের মতো একটি কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীতে এমন সংবেদনশীল ও মানবিক সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করাকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন সবাই।
পুলিশ সদর দপ্তর ও বিভিন্ন মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, প্রজ্ঞাপন জারির পর এখন নতুন পোশাক তৈরির আনুষঙ্গিক প্রস্তুতি চলছে। খুব দ্রুতই সরকারি সরবরাহ ও নিয়ম মেনে মাঠপর্যায়ের সকল সদস্যের মাঝে এই নতুন রঙের পোশাক বিতরণ করা হবে এবং নতুন ড্রেস কোড পুরোপুরি কার্যকর করা শুরু হবে।
তথ্যসূত্র: সময় টিভি ও বাংলানিউজ২৪