রবিবার, ২১ জুন ২০২৬, ১২:৪২ পূর্বাহ্ন

ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত মানচিত্রে বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অবস্থানগত গুরুত্ব অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একসময় আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশকে প্রধানত একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতি, সস্তা শ্রমবাজার কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। তবে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার সমীকরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ, বিভিন্ন আঞ্চলিক সংযোগ প্রকল্প এবং সর্বোপরি চীন, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ত্রিমুখী ক্ষমতার প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান একটি কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই চরম গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল সময়ে ভারতে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত রিউভেন আজারের বাংলাদেশসংক্রান্ত একটি সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নানা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের সংগঠন হামাসের প্রভাব বিস্তার এবং সামগ্রিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের নাম টেনে আনেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক ভাষার এই ধরনের মন্তব্যকে সাধারণ কোনো সাদামাটা বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ একেবারেই কম। কারণ বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট যেকোনো ধরনের বয়ান প্রায়শই একটি সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত সুদূরপ্রসারী বার্তা বহন করে।

নিরাপত্তা বয়ানের অন্তরালে থাকা মূল উদ্বেগ

বাংলাদেশ গত দুই দশকে অভ্যন্তরে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ দমনে অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০০৫ সালে জেএমবির দেশব্যাপী একযোগে সিরিজ বোমা হামলা থেকে শুরু করে ২০১৬ সালের গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বাহিনী ধারাবাহিক কঠোর অভিযানের মাধ্যমে উগ্রবাদী নেটওয়ার্কগুলোকে প্রায় সম্পূর্ণ নির্মূল ও দুর্বল করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিরাপত্তা মূল্যায়নেও বাংলাদেশকে বর্তমানে একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

এমন একটি ইতিবাচক বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ না এনে, পরোক্ষভাবে এক ধরনের ‘নিরাপত্তা উদ্বেগ’ বা শঙ্কা উত্থাপন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ভাবমূর্তি নষ্ট করতে একটি বিশেষ ধরনের নেতিবাচক বয়ান তৈরি করতে পারে। রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্রকে যদি সুকৌশলে “নিরাপত্তা ঝুঁকি” বা “উগ্রপন্থার সম্ভাব্য উর্বর ক্ষেত্র” হিসেবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে চিত্রিত করা যায়, তবে তা দিয়ে ভবিষ্যতে সেই রাষ্ট্রের ওপর বড় ধরনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের একটি মোক্ষম ক্ষেত্র প্রস্তুত করা সম্ভব হয়।

মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও ঢাকার অনমনীয় অবস্থান

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ও জনগণের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান জন্মলগ্ন থেকেই অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অনমনীয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে বিশ্বমঞ্চে সোচ্চার অবস্থান নিয়েছে এবং আজ পর্যন্ত ইসরাইলকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

সাম্প্রতিক গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশের জনমত, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল, ইসলামপন্থী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের একটি বিশাল অংশ প্রকাশ্যে ও তীব্রভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন জানিয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও সিলেটের মতো প্রধান প্রধান শহরগুলোতে ফিলিস্তিনের পক্ষে এবং ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বড় বড় গণবিক্ষোভ ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও গাজা ইস্যু নিয়ে ইসরাইলবিরোধী জনমত ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল বর্তমানে শুধু গাজায় সামরিক যুদ্ধই লড়ছে না, বরং আন্তর্জাতিক জনমত ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশ্বজুড়ে এক কঠিন ও কোণঠাসা লড়াইয়ের মুখোমুখি। ফলে যেসব মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্তর্জাতিকভাবে দৃশ্যমান ও জোরালো অবস্থান নিচ্ছে, সেগুলোর প্রতি ইসরাইলি কূটনীতির একটি বিশেষ ক্ষোভ বা নজর থাকাটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

নয়াদিল্লির নিরাপত্তা ফ্রেমওয়ার্ক এবং ঢাকা

ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে কয়েকটি নির্দিষ্ট ও সনাতন উদ্বেগ নিয়মিত উত্থাপন করে আসছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—অবৈধ অভিবাসন, সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের গোপন তৎপরতা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অনাকাঙ্ক্ষিত কার্যক্রম এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন।

যদিও গত এক যুগে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভারত সরকার নিজে বহুবার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের এই সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেছে, তবুও ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও গণমাধ্যম পরিসরে বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট নেতিবাচক বয়ান পুরোপুরি বন্ধ বা অদৃশ্য হয়নি। বিশেষ করে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তা এবং সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের মতো সংবেদনশীল ইস্যুগুলো প্রায়শই তাদের নির্বাচনী আলোচনার অন্যতম প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। এর ফলে বাংলাদেশের নামটি অনেক সময় কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সহজ প্রেক্ষাপটে নয়, বরং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের বাস্তবতার সাথেও অবলীলায় যুক্ত হয়ে যায়।

বেইজিং ও নয়াদিল্লির প্রতিযোগিতা বনাম মার্কিন অক্ষ

বর্তমান বিশ্বরাজনীতির অন্যতম প্রধান বাস্তব চিত্র হলো বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা। চীনের প্রস্তাবিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই)-এর আওতায় বাংলাদেশে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, গভীর সমুদ্রবন্দর, যোগাযোগ এবং ভারী শিল্পখাতে বিপুল পরিমাণ চীনা পুঁজির বিনিয়োগ হয়েছে। পদ্মা সেতুর ঐতিহাসিক রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা ও মাতারবাড়ী ঘিরে গড়ে ওঠা বিশাল সব মেগা অবকাঠামোগত উন্নয়ন—সবকিছুই আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর তীব্র নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ শুধু একটি ভৌগোলিক প্রতিবেশীই নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সাথে মূল ভূখণ্ডের ট্রানজিট সংযোগ, সমগ্র বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখার জন্য একটি অপরিহার্য অংশ।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বা আইপিএস-এও বাংলাদেশের ভৌগোলিক গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে সমুদ্র নিরাপত্তা, গ্লোবাল সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক রাখা এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মোকাবেলার আলোচনায় মার্কিন প্রশাসন এখন বাংলাদেশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করতে আগ্রহী। ফলে বাংলাদেশকে ঘিরে প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ—তা রাষ্ট্রপ্রধানদের চীন সফর হোক, মালয়েশিয়ার সাথে নতুন সম্পর্ক জোরদার হোক কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর সাথে নতুন অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব তৈরি হোক—সবকিছুই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নিবিড় এবং কড়া পর্যবেক্ষণের আওতার মধ্যে পড়ে।

সীমান্ত রাজনীতি ও আস্থার সংকট

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সামগ্রিক সম্পর্ক একাধারে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা এবং অন্য দিকে কিছু অমীমাংসিত দীর্ঘস্থায়ী বিরোধের এক মিশ্র বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। একদিকে যেমন দুই দেশের মাঝে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পারষ্পরিক সহযোগিতা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন নতুন রেল ও সড়ক সংযোগ এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে যৌথ মেলবন্ধন তৈরি হয়েছে; ঠিক অন্যদিকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের অব্যাহত হত্যা, সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, কথিত ‘পুশইন’ বা ঠেলে দেওয়ার ইস্যু এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সংখ্যালঘু ও অভিবাসন প্রশ্নে ভারতের রাজনৈতিক নেতাদের বিতর্কিত বক্তব্য দুই দেশের জনগণের মধ্যে একটি দৃশ্যমান আস্থার ঘাটতি বা সংকট তৈরি করে। ফলে যখনই আন্তর্জাতিক কোনো মঞ্চ থেকে নতুন কোনো নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট অভিযোগ বা অপপ্রচার সামনে আসে, তখন তা খুব দ্রুত দেশের ভেতরের রাজনৈতিক বিতর্কে রূপ নেয়।

তথ্যযুদ্ধের নতুন যুগে বাংলাদেশের করণীয়

আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুদ্ধ এখন আর কেবল মাঠের সামরিক ট্যাংক বা কামানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তথ্যযুদ্ধ (Information Warfare), গণমাধ্যমের কৃত্রিম বয়ান তৈরি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুনিপুণ ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করা এখন আধুনিক পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী ও ধারালো অস্ত্র হয়ে উঠেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজা উপত্যকার ভয়াবহ সঙ্ঘাত কিংবা চলমান মার্কিন-চীন বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই পরিষ্কার দেখা গেছে যে, সঠিক তথ্য এবং গণমাধ্যম বয়ানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাটা যেকোনো কৌশলগত শক্তির অন্যতম প্রধান অংশ।

বাংলাদেশকেও এখন এই নতুন ও জটিল বৈশ্বিক বাস্তবতায় নিজেদের সার্বভৌম অবস্থান এবং ভাবমূর্তি রক্ষা করতে হচ্ছে। যেকোনো ধরনের আন্তর্জাতিক ভিত্তিহীন অভিযোগ বা পরিকল্পিত অপপ্রচারের জবাব শুধু আবেগঘন রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা ক্ষোভ প্রকাশ করে দেওয়া যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন নিরেট তথ্য, পরিসংখ্যান, জোরালো আন্তর্জাতিক আইনি সহযোগিতা এবং অত্যন্ত সক্রিয় কূটনৈতিক তৎপরতা।

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপ সফলভাবে মোকাবেলা করার জন্য বাংলাদেশের সামনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি:

  • প্রথমত: সন্ত্রাসবাদ ও আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ যে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে, তা আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা ফোরামে তথ্যচিত্র ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে আরও জোরালো ও সার্থকভাবে তুলে ধরা।

  • দ্বিতীয়ত: কোনো একক পরাশক্তির দিকে না ঝুঁকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সাথে একটি সুষম ও দূরদর্শী ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র সম্পর্ক বজায় রাখা।

  • তৃতীয়ত: ভারতের সাথে বিদ্যমান সীমান্ত সমস্যা, পানি বণ্টন এবং কথিত অবৈধ অভিবাসন ইস্যুতে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক আলোচনার টেবিলে তথ্য ও প্রমাণভিত্তিক শক্তিশালী কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা।

  • চতুর্থত: দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জাতীয় ঐকমত্য এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যেকোনো মূল্যে বজায় রাখা। কারণ ঘরোয়া বা অভ্যন্তরীণ যেকোনো ধরনের বিভাজন ও কোন্দল বহির্বিশ্বের বড় বড় আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবেলার রাষ্ট্রীয় সক্ষমতাকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়।

  • পঞ্চমত: আন্তর্জাতিক মূল ধারার গণমাধ্যম, বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন খ্যাতনামা থিঙ্কট্যাঙ্ক পর্যায়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ইতিবাচক সামাজিক অবস্থান তুলে ধরার জন্য অত্যন্ত কার্যকর ও আধুনিক ‘জনকূটনীতি’ (Public Diplomacy) বা জনসংযোগ পরিচালনা করা।

ভারত ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা বয়ান ও বক্তব্যকে সরাসরি কোনো একটি ‘আন্তর্জাতিক ষড়যোজন’ বা চক্রান্ত হিসেবে তড়িঘড়ি করে চিহ্নিত করার আগে বাংলাদেশের সামনে সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটিও কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতিতে নিরাপত্তা বয়ান, সুপরিকল্পিত গণমাধ্যম প্রচার এবং কূটনীতিবিদদের আকস্মিক মন্তব্য প্রায়শই কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্য হাসিলের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে তাকে একই সাথে চীন-ভারত প্রতিযোগিতা, ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল, মধ্যপ্রাচ্যের জটিল যুদ্ধাবস্থা এবং বৈশ্বিক শক্তির নতুন মেরুকরণের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পথ চলতে হচ্ছে। এই কঠিন অগ্নিপরীক্ষায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে আবেগনির্ভর তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তথ্যনির্ভর পরিপক্ব কূটনীতি, সুদূরপ্রসারী কৌশলগত স্বাধীনতা, অটুট জাতীয় ঐক্য এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করা। কারণ একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কোনো রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু তার সামরিক বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা অনেকাংশে নিহিত থাকে রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...