১) ইলেকট্রিসিটি এবং কেমেস্ট্রি
পঁচিশে প্রেম হচ্ছে বিদ্যুৎ। হাতে হাত রাখলেই স্পার্ক করে। চল্লিশে প্রেম হচ্ছে,শান্ত, কিছুটা পরিশ্রান্তও। ছুটির দিনে অলস দুপুরে দুজন পাশাপাশি শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া হয়- কথা তেমন হয় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সৃষ্টি হয় গভীর রসায়ন।
২) বাকবাকুম পায়রা এবং কথা না বলা ময়না
পঁচিশে দুজনের মুখে কথার খই ফুটে। কথায় কথায় রাত পেরিয়ে যায়। পরদিন ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়। চল্লিশে বাকবাকুম পায়রা কথা না বলা ময়না হয়ে যায়। কারণ তখন কথা না বললেও চলে- একজন আরেকজনের চোখের দিকে তাকালেই বোঝে সে কী বলতে চায়।
‘তখন শুধু অন্ধকার
মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন।‘
পঁচিশ হচ্ছে অভিমানের বয়স। একটুতে মান- অভিমান। তারপর অন্যজনের সে মান ভাঙানোর কত চেষ্টা। রিকশা থামিয়ে কয়েকটি টকটকে লাল গোলাপ, কিংবা র্যাপিং পেপারে মুড়িয়ে চকলেট নিয়ে বাড়ি ফিরে আসা। যদি এগুলো পেয়ে তার রাগ ভাঙে! চল্লিশ কিন্তু এমন ‘কচি’ অভিমানের বয়স নয়। তখন দুজন অনেক পরিপক্ক। যুক্তি-তর্ক দিয়ে একজন আরেকজনের সাথে কথা বলে। মাঝে মাঝে তা ঝগড়ার পর্যায়ে চলে যায়। তারপর মাথা ঠান্ডা হলে পরস্পরের মান ভাঙানোর চেষ্টা করা হয়। এ চেষ্টাগুলোও পঁচিশের মতো নয়। দেখা যায় একজন গরম চা টেবিলে রেখে ভাববাচ্যে বলেন- ‘চা এনেছি।‘ আরেকজন অন্যজনের হাত আলতো করে স্পর্শ করেন। সে হাত এক ঝটকায় সরিয়ে নেওয়া হয়। তখন আরো জোরে চেপে ধরা হয়। একসময় দুজনে দশ আঙুল এক হয়ে পেঁচিয়ে থাকে।
পঁচিশে চেষ্টা থাকে একে অপরকে নিজের মনের মতো বানানোর। এর জন্য কত কথা! কত খুনসুটি। চল্লিশে এই পরিবর্তনের চেষ্টা থাকে না। দুজনে দুজনের ভুলত্রুটি মেনে নিয়েই পরস্পরকে ভালোবাসে। তখন বোঝেন, রক্তমাংসের মানুষ কল্পনার মানুষ হয় না।
এই বাস্তবতা নিয়েই বেলা বোস এবং অঞ্জন দত্ত লাল-নীল সংসার পাতেন। পরস্পরকে ঠিক করার কোনো রিনোভেশন প্রজেক্ট সাধারণত হাতে নেওয়া হয় না।
৫) ফোন নিয়ে রুদ্ধশ্বাস প্রতীক্ষা থাকা এবং মিসড কল
পঁচিশে এক মুহূর্ত ফোনের দিক থেকে চোখ সরানো হয় না। যদি সে ফোন করে! দুনিয়া উলটে যাবে তার ফোন মিস করা যাবে না। চল্লিশে ফোন কোথায় আছে অনেক সময় মনেও থাকে না। অফিসের তুমুল ব্যস্ততা, সংসারের তুলকালাম কাণ্ড, বাচ্চার স্কুল, সব মিলিয়ে ফোন ধরা হয় না। সেটা বাজতে বাজতে এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। কিন্তু ঘুমন্ত ফোনে যে কণ্ঠ ডুব মেরেছে- তা আসলে পঁচিশের মতোই গাঢ় মমতাময়। শুধু সময় বদলানোর কারণে তা উচ্চারিত হয় না- কিন্তু প্রতিটি অনুচ্চারিত শব্দে পঁচিশের ভালোবাসাই লুকিয়ে থাকে।
৬) রোমান্টিক ফ্যান্টাসি এবং দুর্দান্ত ফুটবল ম্যাচ
পঁচিশে চোখের পাতায় থাকে কেবল স্বপ্ন। মনে হয়, কোনো সমস্যাই আমাদের ছোঁবে না। চল্লিশে সমস্যার অন্ত থাকে না। তখন স্বপ্নময় অলৌকিক জগত থেকে দুজনে বের হয়ে প্রজ্ঞার সাথে সব সমস্যা মোকাবেলা করে। এটি করতে গিয়ে গৃহযুদ্ধ লাগে- কিন্তু তাই বলে প্রেম কিন্তু কমে না। তখন রোমান্টিকতার ফ্যান্টাসি থেকে বের হয়ে দুজনে একটি ‘টিম’ হয়ে ফুটবল ম্যাচ খেলতে নামে। এই ম্যাচ খুব কঠিন- কিন্তু দুজনে বোঝাপড়ায় শেষ পর্যন্ত তারা জয় ছিনিয়ে আনে।
৭) ড্রামা- অ্যাকশন- কাট এবং শান্ত দীঘির জল
পঁচিশে হচ্ছে নাটক। দুজনের মধ্যে ভালোবাসিবার ড্রামা- অ্যাকশন-কাট। কিন্তু চল্লিশে নাটকীয়তা কম। তখন সংসার নামের উত্তাল সাগরে দুজনে সাঁতার কাটে। তাই নাটকের ভাষা বদলে গিয়ে খাঁটি জীবনযন্ত্রনার ভাষা ফুটে ওঠে। কিন্তু একেবারে গভীরে কিন্তু দুজনে দুজনার- শুধু প্রকাশটা কম।
Deep in my heart
I am still that soul
Who waits to see you
in the morning- evening.
‘বুকের গভীরে আমি সেই মানুষটি
যে তোমাকে দেখার জন্য
অপেক্ষা করে
সকাল- বিকেল।’
চল্লিশে এসে পঁচিশের প্রেম আশা করা ভুল। দুটো বয়সের ভাষা ভিন্ন, আচরণ ভিন্ন, এমন কি তাকানোর ভঙ্গিও ভিন্ন। এই পার্থক্য বুঝতে পারলে আর সমস্যা থাকে না।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, সম্ভবত চল্লিশের প্রেম নিয়েই আজম খান গেয়েছিলেন-
‘সারা রাত জেগে জেগে
কত কথা আমি ভাবি
পাপড়ি কেন বোঝে না
তাই ঘুম আসে না
সারা রাত জেগে জেগে
কত কথা আমি ভাবি
পাপড়ি কেন বোঝে না
তাই ঘুম আসে না।
পাপড়ি কিংবা আজম খান- দয়া করে চল্লিশের বাস্তবতা বুঝুন। দেখবেন, কী গভীর ভালোবাসা আপনি তার জন্য ধারণ করেন।
নিজেই চমকে উঠবেন।
এ জাতীয় আরো খবর...