বিশ্বকাপের মঞ্চে সেলেসাওদের সাময়িক ছন্দপতন যে কেবলই ঝড়ের আগের শান্ত পরিস্থিতি ছিল, তা বুক ঠুকে প্রমাণ করল পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। মরক্কোর বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের অনাকাঙ্ক্ষিত ড্রয়ের ধাক্কা এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিয়ে চিরচেনা সামর্থ্য ও আগ্রাসী ফুটবলের রাজকীয় প্রদর্শনী দেখাল সাম্বার দেশ। বাংলাদেশ সময় শনিবার শেষ রাতে গ্রুপ ‘সি’র ম্যাচে হাইতিকে ৩-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিল শুধু পূর্ণ তিন পয়েন্টই তুলে নেয়নি, বরং প্রতিপক্ষদের জন্য এক মহানির্দয় সতর্কবার্তা জারি করেছে। এই জয় হেক্সা মিশনের হাহাকার ভুলে কোটি কোটি ব্রাজিল ভক্তের বুকে নতুন করে এক বুক আশার আলো ও শিরোপা জয়ের তীব্র বিশ্বাস জাগিয়ে তুলেছে।
নেইমার-পরবর্তী এই যুগে ব্রাজিল দলটির আত্মবিশ্বাস ও আধিপত্য восстановления বা পুনরুদ্ধারের জন্য এমন একটি জাদুকরী ম্যাচের বড্ড প্রয়োজন ছিল। আর সেই স্বপ্নের মঞ্চে সেলেসাওদের ত্রাতা হয়ে জ্বলে উঠলেন বর্তমান ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা ও ভয়ংকর ফরোয়ার্ড ভিনিসিয়াস জুনিয়র এবং সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকার ম্যাথিউস কুনহা। প্রথম ম্যাচের একাদশে সুযোগ পেয়েই কুনহা আদায় করে নিয়েছেন চোখধাঁধানো জোড়া গোল, আর আগের ম্যাচের একমাত্র গোলদাতা ভিনিসিয়াস হাইতির ডিফেন্স চূর্ণ-বিচূর্ণ করে উপহার দিয়েছেন আরও একটি দর্শনীয় গোল। এই দুই তরুণের এমন অতিমানবীয় পারফরম্যান্স কোটি ভক্তকে আশ্বস্ত করেছে যে, ব্রাজিলের আক্রমণভাগের ব্যাটন এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ ও যোগ্য হাতে রয়েছে, যা যেকোনো বিশ্বমানের ডিফেন্স লাইনকে এক নিমেষে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দিতে সক্ষম।
মরক্কো ম্যাচে মাঝমাঠের যে সৃজনশীলতার অভাব আর আক্রমণভাগের যে বিচ্ছিন্ন রূপ নিয়ে সমালোচনা হয়েছিল, এই ম্যাচে তার লেশমাত্র ছিল না। ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই আনচেলত্তির শিষ্যরা মাঠে ক্ষিপ্র গতি, উইং দিয়ে নিখুঁত পাসিং এবং প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার জন্য হাই-প্রেসিং ফুটবলের এক অপূর্ব কোরিওগ্রাফি প্রদর্শন করে। ৪-৩-৩ ফর্মেশনের আধুনিক ছকে দুই ফুলব্যাক যেভাবে ওপরে উঠে মাঠের প্রস্থ বাড়িয়ে খেলছিলেন, তা অতীতের সোনালী দিনগুলোর আক্রমণাত্মক সাম্বা ফুটবলের কথাই মনে করিয়ে দেয়। বলের গতি ও খেলোয়াড়দের পজিশন বদলের নিখুঁত রসায়নে প্রথমার্ধের মাত্র ৪৫ মিনিটেই হাইতির ভাগ্য সম্পূর্ণ নির্ধারিত হয়ে যায়।
খেলার ২৩তম মিনিটে বাম প্রান্ত দিয়ে জাদুকরী গতিতে বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন ভিনিসিয়াস জুনিয়র। তাঁর নেওয়া জোড়া জোরালো নিচু শট হাইতির গোলরক্ষক প্রাথমিকভাবে রুখে দিলেও ফিরতি বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে চলে আসে ডি-বক্সের কেন্দ্রে থাকা কুনহার পায়ে। শিকারী চিতার মতো ক্ষিপ্রতায় কুনহা বল জালে জড়িয়ে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে এগিয়ে নেন। এই গোলের রেশ কাটতে না কাটতেই ৩৬তম মিনিটে মাঝমাঠের কাণ্ডারি লুকাস পাকেতার ডিফেন্স-ছেঁড়া এক পাস লুফে নেন ভিনিসিয়াস। ভিনিসিয়াসের পা থেকে থ্রু বল পেয়ে কুনহা ডান পায়ের এক মাপা জোরালো শটে বল গোলপোস্টের একদম উপরের কোণ (টপ কর্নার) দিয়ে জালে জড়ালে গ্যালারিতে সাম্বার উৎসব শুরু হয়। আর প্রথমার্ধের ঠিক যোগ করা সময়ে পাকেতার এক অনবদ্য লং পাস ধরে অফসাইডের ফাঁদ গলে বক্সে ঢুকে ঠান্ডা মাথায় গোলরক্ষককে পরাস্ত করে স্কোরলাইন ৩-০ করেন স্বয়ং ভিনিসিয়াস জুনিয়র।
ট্যাকটিক্যাল দিক থেকে এই ম্যাচটি ছিল ব্রাজিলের জন্য এক বিশাল টার্নিং পয়েন্ট। বল হারানোর সাথে সাথেই ব্রাজিলের তাৎক্ষণিক প্রেসিং এতটাই ভয়ংকর ছিল যে, হাইতি পুরো ম্যাচে নিজেদের গুছিয়ে কোনো আক্রমণই শানাতে পারেনি। ভিনিসিয়াসের গতি, নিখুঁত ড্রিবলিং আর ক্ষণে ক্ষণে বক্সে কাট-ইন করার ক্ষমতা আবারও প্রমাণ করেছে কেন তিনি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। অন্যদিকে কুনহার এই বিধ্বংসী ফর্ম ব্রাজিলের জন্য ৯ নম্বর জার্সির দীর্ঘদিনের খরা দূর করার এক নতুন আশার আলো। মাঝমাঠে কাসেমিরোর ইস্পাতকঠিন ডিফেন্সিভ কাভারেজ এবং গোলপোস্টের নিচে আলিসন বেকারের নির্ভরযোগ্য উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, সেলেসাওদের রক্ষণভাগও যেকোনো বড় পরীক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
দ্বিতীয়ার্ধে কোচ আনচেলত্তি দলের বেঞ্চের গভীরতা পরীক্ষা করতে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দুই বিস্ময় বালক এন্দ্রিক ও রায়ানের পাশাপাশি আর্সেনাল তারকা গ্যাব্রিয়েল মারতিনেল্লিকে মাঠে নামান। যদিও এই অর্ধে আর কোনো গোল আসেনি, তবে তরুণদের এই আগ্রাসী ছন্দ ইঙ্গিত দেয় যে ব্রাজিলের ব্যাক-আপ স্কোয়াডও কতটা শক্তিশালী। আগামী ২৪ জুন গ্রুপের শেষ ম্যাচে ঐতিহ্যবাহী স্কটল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ব্রাজিল। গোল ব্যবধানে বর্তমানে গ্রুপের শীর্ষে থাকা সেলেসাওরা যদি এই বর্তমান ফর্ম ও ক্ষিপ্রতা বজায় রাখতে পারে, তবে স্কটিশদের হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া কেবল সময়ের ব্যাপার মাত্র। আনচেলত্তির ড্রেসিংরুমের কৌশল এখন খেলোয়াড়দের মজ্জায় মজ্জায় মিশে গেছে। ভিনিসিয়াসের এই অতিমানবীয় ড্রিবলিং, কুনহার গোলক্ষুধা এবং তরুণ এন্দ্রিকদের চপলতা যদি নকআউট পর্বেও এভাবে অব্যাহত থাকে, তবে বিশ্বমঞ্চে ষষ্ঠ নক্ষত্র বা ‘হেক্সা’ জয় এবার আর কোনো দূর আকাশের স্বপ্ন নয়, বরং এক সোনালী বাস্তবতায় রূপ নিতে যাচ্ছে।