বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬, ১২:২১ পূর্বাহ্ন

দুদকের কমিশনারদের নাম প্রস্তাবের জন্য নতুন সার্চ কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) শীর্ষ পদের দীর্ঘদিনের শূন্যতা পূরণে অবশেষে বড় পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের লক্ষ্যে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের ৫ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশনের শূন্য পদগুলোর বিপরীতে যোগ্য প্রার্থীদের একটি তালিকা তৈরি করে রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে এই কমিটি, যার মধ্য থেকেই পরবর্তী সময়ে একজন চেয়ারম্যান এবং দুইজন কমিশনার নিয়োগ পাবেন। গত সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো নেতৃত্ব বা কমিশনার না থাকায় দেশের এই সর্বোচ্চ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।

সোমবার (২২ জুন) মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই নতুন সার্চ কমিটি গঠনের তথ্য জানানো হয়। ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হক। সার্চ কমিটির অন্য চার সদস্য হলেন—হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল, বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মো. নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (বিপিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোমেন এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই সার্চ কমিটিকে সাচিবিক সহায়তা প্রদান করবে।

আইনি বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, এই অনুসন্ধান কমিটি দুদকের তিনটি শূন্য কমিশনার পদের প্রতিটি পদের বিপরীতে দুইজন করে যোগ্য প্রার্থীর নাম বাছাই করবে। এরপর চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য চারজন বা ছয়জন প্রার্থীর একটি প্যানেল রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হবে। দেশের প্রচলিত আইন অনুসারে, পূর্ববর্তী মন্ত্রিপরিষদ সচিব বা তাঁর ঠিক আগের সচিব কোনো কারণে অপরাগতা প্রকাশ করলে বা তাঁদের পাওয়া না গেলে, বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে এই অনুসন্ধান কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেই ধারাবাহিকতাতেই বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে এই ৫ সদস্যের কমিটিতে যুক্ত করা হয়েছে।

গত বছরের পটপরিবর্তনের পর থেকে দুদকের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম চরম স্থবিরতার মধ্যে পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইন অনুযায়ী, যেকোনো বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত, মামলার অনুমোদন কিংবা চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট পেশ করার জন্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত কমিশনারদের সম্মিলিত অনুমোদন বা বোর্ড সভার সম্মতি বাধ্যতামূলক। কিন্তু দীর্ঘ ৩ মাসেরও বেশি সময় ধরে কোনো কমিশনার না থাকায় দুদকের দৈনন্দিন ও প্রশাসনিক কার্যক্রম প্রায় অচল হয়ে পড়েছিল।

ফলাফলস্বরূপ, গত জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে দুর্নীতি দমনের প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করেছিল। তবে গত ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যে আইনি অনুমোদন বা সংসদীয় অনুসমর্থন পেতে ব্যর্থ হওয়ায় সেই অধ্যাদেশটিসহ মোট ২০টি অধ্যাদেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের কার্যকারিতা হারায়। এই বিষয়টি নিয়ে গত ১৫ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা চলাকালে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিগত দিনে দেশের ব্যাংক খাত, মেগা প্রজেক্ট, সরকারি নিয়োগ-পদোন্নতি এবং গণক্রয় প্রক্রিয়ায় একের পর এক বিশাল দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছে। দেশের মানুষ আশা করেছিল এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে দুদক আরও শক্তিশালী একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ নেবে, কিন্তু সরকার এটি সংসদে পাস না করে বাতিল হতে দিল।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জাতীয় সংসদকে আশ্বস্ত করে জানান, অধ্যাদেশটি বাতিল হলেও শক্তিশালী দুদক গঠনের প্রক্রিয়া থমকে যায়নি। সার্চ কমিটির মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের যে প্রক্রিয়া বর্তমানে শুরু হয়েছে, তার মাধ্যমেই একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিশন প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি স্পষ্ট করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের বিশেষ অধ্যাদেশটি অনুমোদিত না হলেও দেশের পূর্ববর্তী মূল দুদক আইনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। আর সেই মূল আইনেই স্বচ্ছতার ভিত্তিতে একটি শক্তিশালী সার্চ কমিটি গঠনের স্পষ্ট বিধান রয়েছে, যা বর্তমানে অনুসরণ করা হচ্ছে।

দুদকের এই দীর্ঘস্থায়ী নেতৃত্ব সংকটের ইতিহাস বেশ নাটকীয়। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তীব্র চাপের মুখে তৎকালীন দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ এবং দুইজন কমিশনার ২৯ অক্টোবর একযোগে পদত্যাগ করেন। পরবর্তীতে ১০ ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব মুহাম্মদ আব্দুল মোমেনকে চেয়ারম্যান করে কমিশন পুনর্গঠন করেছিল। তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ১৬ দিনের মাথায়, গত ৩ মার্চ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন পুরো কমিশন পদত্যাগপত্র জমা দেয়। দুদকের মূল আইন অনুযায়ী কমিশন ভেঙে যাওয়ার বা পদত্যাগের এক মাসের মধ্যে নতুন কমিশন গঠন করার স্পষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও, নানা জটিলতায় দীর্ঘ সাড়ে তিন মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর অবশেষে এই সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নতুন করে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন।

 

তথ্যসূত্র: নিউ এজ


এ জাতীয় আরো খবর...