বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১২:০৮ পূর্বাহ্ন

বেইজিংয়ে কি মিলবে তিস্তা প্রতীক্ষার সমাধান?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৩ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চারদিনের চীন সফরকে ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আলোড়ন। যদিও সফরটির আনুষ্ঠানিক সূচিতে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পটিকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়নি, তবুও বেইজিংয়ে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকগুলোয় প্রকল্পটি যে আলোচনার টেবিলে উঠে আসবে—তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে সন্দেহের অবকাশ নেই। দীর্ঘ কয়েক দশকের অমীমাংসিত তিস্তা সংকট এবং এ অঞ্চলকে ঘিরে ভারত ও চীনের কৌশলগত অবস্থানের কারণে এই সফরটি এখন কেবল একটি নিয়মিত সফর নয়, বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের এক টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে। সবার প্রশ্ন—বেইজিংয়েই কি মিলবে বহু বছরের সেই প্রতীক্ষিত তিস্তা সমস্যার সমাধান?

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের আগ্রহ বহু পুরনো। কিন্তু ভারত এই এলাকাটিকে অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেন নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডোরের অত্যন্ত কাছাকাছি মনে করে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সেখানে চীনের বিশাল কোনো বিনিয়োগ বা অবকাঠামো নির্মাণকে ভারত সবসময়ই নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। দিল্লির এই আপত্তির কারণেই এতদিন প্রকল্পটি ঝুলে ছিল। তবে বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত থেকে প্রবাহিত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা না পাওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের বিশাল এলাকা মরুভূমিতে পরিণত হয়, আবার বর্ষায় ভারত থেকে আসা অতিরিক্ত পানির তোড়ে নদীভাঙনে নিঃস্ব হয় লাখো মানুষ। এই দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা থেকেই বাংলাদেশ এখন বিকল্প পথ খুঁজছে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পানি ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়। এটি এখন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’-এর মতো বৈশ্বিক কৌশলের সাথেও যুক্ত। তিস্তার উজানের অংশ যেহেতু চীনের নিয়ন্ত্রণে, তাই সেখানে চীনের একটি প্রকল্প পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে বেইজিংয়ের সাথে বাংলাদেশের এই বিশেষ সম্পর্ক ভারতের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ। তবে বর্তমান সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ ডকট্রিনে অবিচল। সরকারের নীতিনির্ধারকদের স্পষ্ট বার্তা হলো—দেশের প্রয়োজনে, দেশের মানুষের উপকারে যে ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন, তা নিতে সরকার দ্বিধাবোধ করবে না।

প্রকল্পটির অর্থায়ন নিয়ে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান সতর্কবার্তায় বলেছেন, তিস্তা প্রকল্পের মতো একটি উচ্চাভিলাষী কাজ বিদেশি ঋণ নিয়ে করাটা ঝুঁকির হতে পারে। যদি প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদে সরাসরি কোনো অর্থনৈতিক আয়ের উৎস হতে না পারে, তবে এটি বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এছাড়া প্রকল্পটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও পরিবেশগত প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু, সেটিও বড় বিবেচ্য বিষয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নদীর প্রবাহ যেহেতু ভারত ও চীনসহ একাধিক দেশের সাথে যুক্ত, তাই বহুপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই এর স্থায়ী সমাধান খোঁজা উচিত।

ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ২০০৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া যখন চীনের সাথে এ ধরনের সামরিক ও অর্থনৈতিক চুক্তি সইয়ের লক্ষ্য নিয়ে সফরে গিয়েছিলেন, তখন সাভারের বোমা হামলার মতো দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার মধ্য দিয়ে সেই সফর বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে ড্রেজিং, পানি সংরক্ষণ এবং নদী ব্যবস্থাপনার জন্য ইতোমধ্যে নয় সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্পষ্ট করেছেন, জিয়াউর রহমানের স্বপ্নের এই মহাপরিকল্পনা এবার তারেক রহমানের নেতৃত্বেই বাস্তবায়নের পথে। সরকার নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি করার কথা বললেও চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তার দুয়ারও পুরোপুরি বন্ধ করেনি।

চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ে অবস্থান করছেন—এটিই চীনের জন্য বড় সুযোগ। চীন অনেক আগে থেকেই তিস্তা প্রকল্পের নাব্য নিয়ে বিস্তারিত স্টাডি করে রেখেছে। বেইজিং এখন হয়তো বাংলাদেশকে সরাসরি প্রস্তাব দেবে যে, তারা এই প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। প্রকল্পটি ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ হলেও, বাংলাদেশ দীর্ঘদিনের এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে চায়। এটি অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে যেভাবে লাভবান করবে, তা আর কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে সম্ভব নয়।

তবে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিটি বেশ জোরালো। অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা প্রকল্প আমাদের জীবন-মরণ সমস্যা। ভারত বা চীন কারও দয়ার ওপর নির্ভর না করে আমাদের উচিত নিজস্ব সক্ষমতায় কাজ শুরু করা। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সফরের সময় চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও শেষ মুহূর্তে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে যে, প্রতিবেশী দেশের ওপর পানি নিয়ে খুব বেশি ভরসা করাটা বিলাসিতা।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফরে শুধু তিস্তাই নয়, বরং দ্বিতীয় মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, মুক্তবাণিজ্য চুক্তি এবং উচ্চমানের পণ্য রপ্তানির মতো অন্তত ডজনখানেক সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই প্রতিটি চুক্তিই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

পরিশেষে বলা যায়, বেইজিংয়ের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের তৃষ্ণার্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণের যে অঙ্গীকার নিয়ে কথা বলবেন, তা কেবল তিস্তার পানির প্রবাহই বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতাকে বিশ্বের দরবারে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ভারত বা চীনের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশের স্বার্থে যে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস বর্তমান সরকার দেখাচ্ছে, তা সফল হলে বেইজিংয়েই হয়তো মিলবে ইতিহাসের সেই কাঙ্ক্ষিত সমাধান। এখন দেখার বিষয়, চীন ও ভারতের মতো শক্তিধর দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে বাংলাদেশ কতটুকু সফলতার সাথে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করে আনতে পারে। আর এই সাফল্যই হবে তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বের অন্যতম পরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: যুগান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...